তবে সে-রাতে মোক্তার মোছলেহউদ্দিনের মেয়ে সকিনা খাতুন বিচিত্র কান্নার আওয়াজটি শুনতে পায়।
একদিন তারা গভীর রাতে কামলাতলা বিল থেকে খেদমতুল্লার লাশটি উদ্ধার করে চাঁদবরণঘাটের বাড়িতে নিয়ে আসে। আমেনা খাতুন বা মুহাম্মদ মুস্তফা লাশটি প্রথমে শনাক্ত করতে পারে নি, কারণ দা-এর নির্মম আঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড মাথা-মুখের শনাক্তযোগ্য অবস্থা ছিল না। তারপর আমেনা খাতুনের চোখ পড়ে আঙটির ওপর এবং সে-আঙটি দেখেই রাতের নীরবতা বিদীর্ণ করে সে আর্তনাদ করে ওঠে; বেশ কয়েক বছর আগে ব্যবসায়ে সর্বপ্রথম কপাল খুললে সদর শহরে এক জহুরীর দোকান থেকে বড় শখ করে খেদমতুল্লা লালপাথর বসানো সোনার আঙটিটি কিনেছিল।
আমি তখন চাঁদবরণঘাটে বেড়াতে এসেছিলাম। আমেনা খাতুনের আকস্মিক আর্তনাদ নিঃসন্দেহে আমার নিদ্রা-অবশ কানে পৌঁছেছিল, কিন্তু সে-আর্তনাদ জেগে উঠেই থেমে গিয়েছিল বলে ঘুমটা ভাঙে নি, আর্তনাদটিও আমার স্বপ্নে রহস্যময় গুহাগহ্বরে বার-কয়েক প্রতিধ্বনিত হয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ে থাকবে। তারপর হয়তো গভীর নীরবতার জন্যে এক সময়ে বুঝতে পারি কোথাও অসাধারণ কোনো ঘটনা ঘটেছে; এ সব ঘটনা শুধু শব্দের মধ্যে দিয়ে নয়, নিঃশব্দতার মধ্যে দিয়েও আত্মপ্রকাশ করে থাকে।
আমি যখন ভেতরের বারান্দায় উপস্থিত হই ততোক্ষণে যারা খেদমতুল্লার মৃতদেহটি বহন করে নিয়ে এসেছিল তারা একটি সাদা চাদর দিয়ে মৃতদেহটি ঢেকে লণ্ঠন হাতে চাঁদহীন অন্ধকার রাতের মধ্যে দিয়ে ফিরতি-পথ ধরেছে। প্রথমে মাতা পুত্রকে দেখতে পাই। বারান্দার মধ্যখানে একটি লণ্ঠন জ্বলছিল। সে-আলোতে দেখতে পাই আমেনা খাতুন একটি পিঁড়ির ওপর নিশ্চল হয়ে বসে, মুখে স্তব্ধভাব কিন্তু বেদনা বা আঘাতের কোনো আভাস নেই, চোখে অশ্রু নেই। অদূরে হাঁটু তুলে পায়ের ওপর ভর দিয়ে চৌদ্দ বছরের ছেলে মুহাম্মদ মুস্তফাও বসে, দৃষ্টি মেঝের দিকে। তারপর বাঁদিটিকেও দেখতে পাই। রান্নাঘরের পাশে তার ঘর থেকে উঠে এসে বারান্দার প্রান্তে সে পা ঝুলিয়ে বসেছে। শুধু তারই দৃষ্টি মৃতদেহটির ওপর : চোখে বিহ্বলতা, যে বিহ্বলতা কেমন যেন জমে গিয়েছে কারণ বোধ-বুদ্ধির স্রোত কোথাও সহসা থেমে পড়েছে। এবার আমার নজর পড়ে দেয়াল-ঘেঁষে-রাখা সাদা চাদরে আবৃত লাশটির ওপর। তবু তখনো সবটা বুঝি নি। চাদরের নিচে নিথর দেহ-মুখের অস্ফুট রেখাগুলির অর্থোদ্ধার করবার চেষ্টা করছি এমন সময় দূরে কোথাও একটি হুতুম পাখির ডাক শুনতে পাই। হুতুম পাখি নিত্যই ডাকে, তবে আমার সহসা কেমন মনে হয় সে-ডাক কখনও শুনি নি। হয়তো মনে একটি প্রশ্ন দেখা দিয়ে থাকবে : হুতুম পাখি ডাকছে কেন? তারপর এক সময়ে কোনো পূর্বাভাস না দিয়ে বৃষ্টি নাবে, যে-বৃষ্টির আওয়াজও চিনতে কষ্ট হয়; বৃষ্টিটা যেন মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থেকে নয়, রাত্রির অন্ধকার থেকেই ঝরছিল, পানি নয়, উপছে-পড়া পরিপূর্ণ স্তব্ধতা। বাঁদি মেয়েটি না নড়ে বারান্দার প্রান্তে বসে থাকে, শীঘ্র তার মুখ, তার নগ্ন হাত-বাহু এবং শাড়ি ভিজে ওঠে। ক্রমশ সবই আমার কাছে বিস্ময়কর ঠেকে : মাতা-পুত্রের এবং বদিটির নিশ্চল হয়ে বসে থাকা, প্রায় অদৃশ্যভাবে ঝরতে-থাকা বৃষ্টি। রহস্যভেদ করবার জন্যেই যেন সাদা চাদরে আবৃত মৃতদেহটির দিকে আরেকবার দৃষ্টি দেই। এবার কী করে চাদরের মধ্যে দিয়ে জেগে-থাকা নিথর মুখের অস্ফুট রেখাগুলি একটা অর্থ গ্রহণ করে, যদিও কিছু দেখা সম্ভব হয় না তবু বুঝতে পারি খেদমতুল্লা আর হুঙ্কার দেবে না; যে-হুঙ্কার গত ক-বছরে পশুর আর্তনাদের মতো হয়ে উঠেছিল, মানুষের মনে অকথ্য সন্ত্রাস সৃষ্টি করত, সে হুঙ্কার আর কেউ শুনতে পাবে না।
তারপর ধীরে-ধীরে পূর্বাকাশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে, একটি নূতন দিন শুরু হয়।
সেদিনই মুহাম্মদ মুস্তফা উক্তিটি শুনতে পায়। কেউ বলে, বদলোকের নছিবে অপঘাতে মৃত্যুই বরাদ্দ থাকে।
কেবল সেদিন কথাটি সে বুঝতে পারে নি। পরে ধীরে-ধীরে, খণ্ড-খণ্ডভাবে সব জানতে পায়। সে জানতে পায়, তার বাপ অতিশয় দুর্বৃত্ত মানুষ ছিল। সে জানতে পায়, অনেক মানুষকে তার বাপ ধ্বংসের পথে বসিয়েছিল, হক-দাবি-প্রাপ্য থেকে তাদের বঞ্চিত করেছিল, নিরপরাধ শিশুদের জীবনের জন্যে দণ্ডিত করেছিল। কখনো ইঙ্গিতে বলা কোনো কথায়, কখনো নির্দয়ভাবে দেয়া বৃত্তান্তসমৃদ্ধ বিবরণে, কখনো তীব্র ঘৃণাভরা কণ্ঠে নিক্ষিপ্ত অভিযোগে, কখনো আবার স্পষ্টতই পরস্পরবিরোধী বিবৃতিতে-এ-সবে মিলে মুহাম্মদ মুস্তফার মনে ক্রমশ যে-মানুষের চিত্র স্পষ্টাকার রূপ ধারণ করে সে মানুষকে সে যে চিনতে পারে তা নয়, তবু তাকে প্রত্যাখান করতেও সাহস হয় না তার। কখনো-কখনো তার মনে হয় সে যেন এমন একটি মানুষের কথা শুনছে জীবনে। যার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। ঘোর পাপিষ্ঠ মানুষের জীবনে উদ্দেশ্য থাকে; লোভ হিংসা হীনতা নীচতা নিষ্ঠুরতার দ্বারা তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইলেও সে উদ্দেশ্যহীন নয়। উদ্দেশ্যহীন মানুষ আর মানুষ নয়, সে অমানুষ। তার বাপ খেদমতুল্লা কি অমানুষ ছিল? তবে এই প্রশ্নটিও স্পষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করতে তার সাহস হয় নি। সে শুনে যায়, এবং হয়তো প্রত্যেক কথাই গ্রহণ করে বিনা প্রশ্নে, তা যতই নিষ্ঠুর বা বেদনাদায়ক হোক না কেন। হয়তো তার জন্মদাতার বিষয়ে যা সে শোনে তার সত্যাসত্য বিচার করার প্রয়োজনও দেখে না : বাপ খেদমতুল্লা দুর্বৃত্ত তোক ছিল তা একবার গ্রহণ করে নেবার পর কোথায় কে একটু অতিরঞ্জন করেছে বা কোথায়- বা ঈষৎ বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে-এ-সবের বাছাই-ছাঁটাই অবান্তর মনে হয় তার কাছে। বাপের শাস্তিটা অপরাধের তুলনায় যে মাত্রাতিরিক্ত হয়েছে তেমন কথা মনে হয়ে থাকলে আবার হয়তো ভেবেছে, সে-বিষয়ে চুলচেরা বিচার অর্থহীন এই কারণে যে একটি বিশেষ স্তর পেরিয়ে যাবার পর মানুষের পাপ-দুষ্কর্ম আইনের দাঁড়িপাল্লায় হয়তো ওজন করা যায় কিন্তু অন্তরের দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা যায় না। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে উপদেশ দেয়, যে বা যারা কামলাতলা বিলে জঘন্য কাজটি করেছে তার বা তাদের যথাবিধি শাস্তি বিধান হওয়া উচিত, কারণ খেদমতুল্লা সৎলোক ছিল না বটে কিন্তু তার খুনের কথা নির্বিবাদে গ্রহণ করা যায় না। তবে এই উপদেশটি তাকে বিস্মিত করে, যেন খেদমতুল্লার দুর্বৃত্ত চরিত্রের কথা গ্রহণ করে নিলেও কেউ যে তাকে নির্মমভাবে খুন করে থাকবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি। হয়তো ছেলের পক্ষে তার বাপ সম্বন্ধে প্রথম কথার চেয়ে দ্বিতীয় কথাই গ্রহণ করা দুষ্কর। লোকেরা তাকে এ-কথাও বলে, যে বা যারা নিষ্ঠুর হত্যার জন্য দায়ী তার বা তাদের সন্ধান। পাওয়া তেমন কঠিন কাজ নয়; বস্তুত একটি নাম সকলেই কানাঘুষায় শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু সে-বিষয়েও সে কোনো ঔৎসুক্য প্রকাশ করে নি।
