সে-রাতে খেদমতুল্লা ছেলেকে কনুই মারে নি; ঐ নির্মম শাস্তিটিও সে-রাতে তার কাছে হয়তো যথেষ্ট মনে হয় নি। প্রথমে ছেলেকে উঠানে টেনে নিয়ে গিয়ে একটি শক্ত বাঁশ দিয়ে তার দেহের পশ্চাদভাগে মত্ত ক্রোধপ্রসূত প্রচণ্ড শক্তির সাহায্যে অবিশ্রান্তভাবে প্রহার করে, তারপর কতক্ষণ উন্মত্ত মানুষের মতো অত্রযত্র লাথি মারে। মুহাম্মদ মুস্তফা একটি শব্দ করে নি। তার রহস্যময় অভিজ্ঞতা, তারপর তারাখচিত আকাশের তলে এই নির্দয় প্রহার-সবই তার কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়ে থাকবে। তার পক্ষে বেশি ভাবাও সম্ভব হয় নি, কারণ বাপের লাথিতে এক সময়ে সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। বাপও এ-সময়ে থামে, সংজ্ঞাহীন ছেলেকে উঠানে ফেলে সে ঘরে উঠে আসে। তবে ফিরে আসতে তার দেরি হয় নি, নূতন এক ক্রোধের ঢেউ এসে তাকে আচ্ছন্ন করলে সে আবার ক্ষিপ্ত মানুষের মতো বেরিয়ে আসে।
বাকিটা আমেনা খাতুন দেখে নি। খিড়কির দরজা দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে সে অন্ধের মতো হাঁটতে শুরু করে অন্ধকার রাত্রির মধ্যে দিয়ে, চোখ অশ্রুহীন, তবে সর্বাঙ্গে অদম্য কম্পন। কোথায় যাচ্ছে সে-বিষয়ে ধারণা নেই, সে চলতেই থাকে। এক সময়ে সহসা কোত্থেকে একটি পরী এসে উপস্থিত হয়। পরীটি সস্নেহে তার হাত চেপে ধরে, তারপর তাকে নিয়ে একটি গাছের তলে বসে সুমিষ্ট কণ্ঠে তার সঙ্গে কথালাপ করে। বস্তুত দু-জনে অন্তরঙ্গ সখীর মতো গল্পগুজব করে আনন্দেই সময় কাটায়। কেবল খেদমতুল্লা যখন লণ্ঠন নিয়ে গাছের নিচে হাজির হয় তখন সে পরীটিকে দেখতে পায় নি, স্বামীকেও চিনতে তার কষ্ট হয়েছিল।
শত চারিত্রিক অবনতি, নিষ্ঠুরতা এবং পরিবারের প্রতি গভীর উদাসীনতা সত্ত্বেও একটি ব্যাপারে খেদমতুল্লা কখনো সংকল্পবিচ্যুত হয় নি। সংকল্পটি এই যে মুহাম্মদ মুস্তফাকে উচ্চশিক্ষা দেবে। সে নিজে প্রায় অশিক্ষিত ছিল। কাজেই শিক্ষা বস্তুটি কী, বিদ্যার্জনের দীর্ঘ পথের জন্যে কী পাথেয় সামগ্রীর প্রয়োজন-সে-সব বিষয়ে তার স্পষ্ট ধারণা ছিল না। যা সে পরিষ্কারভাবে বুঝত বা দেখতে পেত, তা সার্থক শিক্ষার ফলাফল, বিদ্যার্জনের পুরস্কার। সে স্থির করেছিল, ছেলে বড় হয়ে উকিল হবে। জজ হকিম নয়, উকিল হবে-সেটাই ছিল তার স্বপ্ন। জজ-হাকিমের মান-সম্মান নয়, উকিলের আইন নিয়ে খেলা করার সুযোগই তাকে অধিকতর আকৃষ্ট করত। তার মনে হত, ওকালতিতে মানুষ যতটা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারে জজিয়তি-হাকিমিতে ততটা পারে না; জজ-হাকিম শুধু দিনকে দিন রাতকে রাত প্রমাণ করে, উকিল দিনকে রাত রাতকে দিন করার ক্ষমতা রাখে।
ছেলে উকিল হবে একবার স্থির করলে সে অধৈর্য হয়ে পড়ে; সে ভাবত তাড়াহুড়া করলেই দীর্ঘ পথ সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে, সময়কে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হবে। সে আরো ভাবত, প্রহার দ্বারাই স্মৃতিশক্তির অভাব মেটানো যায়, দৈহিক মানসিক শ্রান্তি দূর করা যায় অতি শ্রমের সাহায্যে। বস্তুত তার ভাবটি ছিল অনেকটা নির্বোধ গাড়োয়ানের মতো, যে-গাড়োয়ান শ্রান্তক্লান্ত মৃতপ্রায় জানোয়ারকে কেবল অঙ্কুশাঘাতেই গন্তব্যস্থলের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে।
তবারক ভুইঞা বলে : সেদিন প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গ হতেই উকিল কফিলউদ্দিন সাহেব কেমন উস্ফুল্ল বোধ করে, কারণ তার কেমন মনে হয় প্রতিবাদপত্রটি কার্যকর হয়েছে, সরকার প্রথমে স্টিমার-কোম্পানির পক্ষ নিলেও অবশেষে বুঝতে পেরেছে এমন দিনে দুপুরে ডাকাতি ঢাকা যায় না, সমর্থন করাও যায় না।
ততদিনে উকিল সাহেবও কিছু নমনীয়তা দেখিয়েছে দুনিয়াতে বাস করতে হলে সমঝোতা করতে হয়, নিতে হলে দিতে হয়। সে চড়ার কথা স্বীকার করে নিয়েছে। যা স্বীকার করে নি তা এই যে সে-চড়ার জন্যে স্টিমার-চলাচল বন্ধ করা প্রয়োজন। স্টিমারঘাট সম্বন্ধে যে-সব জনশ্রুতি তার কানে এসে পৌঁছায় তাতে তাই প্রথমে নারাজ হয়ে পারে নিঃ কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীরা কী দুর্বলতা দেখাতে শুরু করেছে। তারা দুর্বল হয়ে পড়লে একা কী করে লড়াই করবে, কাদের জন্যেই-বা লড়াই করবে? তবে সে আশ্বস্ত হয় এই দেখে যে সে-সব জনশ্রুতি যে-রকম রূপ ধারণ করুক না কেন কেউ আর বিশ্বাস করে না স্টিমারঘাট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। যারা এমন মত প্রকাশ করে তাদের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করতে দ্বিধা করে নি উকিল সাহেব। দুদিন ধরে ডাক্তার বোরহানউদ্দিনের সঙ্গে কথা বন্ধ; ডাক্তারের এখনো যেন বিশ্বাস, কোম্পানি লাচার হয়ে স্টিমার তুলে দিয়েছে। গত পরশুদিন বড় হাকিমের সঙ্গে বেশ উঁচুগলায় কথা বলেছেঃ বড় হাকিম কোম্পানির সাফাই গাইবার চেষ্টা করেছিল। তার মেজাজটা তখুনি গরম হয়ে ওঠে। সে বলে, চড়া পড়ে নি তেমন কথা সে কোনোদিন দাবি করে নি, শুধু বলেছে সে-চড়া পাশ কাটিয়ে স্টিমার বেশ দিব্যি নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়া করতে পারে এবং কিছু যদি স্টিমারের আসা-যাওয়া বন্ধ করে থাকে তা বালির চড়া নয়, অর্থলালসার চড়া: সে-চড়াই একটি শহরের সুখ-সুবিধা দুঃখ-কষ্ট সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে মস্ত প্রতিবন্ধকের সৃষ্টি করেছে।
নিত্যকার মতো সেদিন উকিল কফিলউদ্দিন যখন কয়েকজন মক্কেলের সাথে কাছারি-আদালত অভিমুখে রওনা হয় তখনো সে মনে-মনে উৎফুল্ল বোধ করে, কেবল তা মুখের থমথমে ভাবের তলে আত্মগোপন করে থাকে; বুকে শোকব্যথা বোধ না করলেও সে সর্বসমক্ষে কৃত্রিম সম্পাত করতে সদা প্রস্তুত, কিন্তু কোনো কারণে ভেতরে আনন্দের ধারা প্রবাহিত হলেও তা প্রকাশ করতে তার দ্বিধা হয়। যা বিরল তা অতি মূল্যবান : তা দেখাতে সঙ্কোচ হয়।
