অনেকক্ষণ হাঁটার পর উকিল কফিলউদ্দিনের আরেকটি খেয়াল হয় যাতে তার মনের উফুল্লভাবটা আরো বেড়ে যায় যেন। খেয়ালটা এই যে, প্রতিবাদপত্রটি কার্যকর হয়েছে শুধু তাই নয়, দু-চারদিনের মধ্যেই স্টিমার কুমুরডাঙ্গায় ফিরে আসবে। এমন খেয়ালের যুক্তি-যথার্থতা কী, কীই-বা ভিত্তি? তা বলতে পারবে না, তবে সে জানে এমনভাবে যে-সব খেয়াল মাথায় আসে তা কদাচিই ভুল হয়। জীবনে এমনটা অনেকবার হয়েছে : কিছু ঘটবার আগেই কী করে জানতে পেয়েছে তা ঘটবে। তার যেন কী-একটা অদ্ভুত ক্ষমতা, ভবিষ্যতের কথা কী করে জানতে পায় সে। মাসখানেক আগে একদিন হঠাৎ তার খেয়াল হয়, কে যেন আসবে। কারো আসার কথা ছিল না, খেয়ালটি তাই অহেতুক মনে হয়, কিন্তু পরদিন মুটের মাথায় বিছানাপত্র চাপিয়ে তার স্ত্রীর ছোট ভাই আশেক মিঞা অপ্রত্যাশিতভাবে দোরগোড়ায় দেখা দেয়। অপ্রত্যাশিতভাবে অন্যের জন্যে, তার জন্যে নয়। সেদিন স্টিমার ধরতে গিয়েছিল মেয়ে হোসনার সম্বন্ধে মনে কেমন একটা খেয়াল জেগেছিল বলেই। যেতে না পারলে জামাইর কাছে তার পাঠিয়েছিল : কোনো খবর নেই বলে সে চিন্তিত। পরদিন উত্তর পায়, হোসনার সামান্য সর্দি-কাশ হয়েছে, তাছাড়া সব ভালো, চিন্তার কোনো কারণ নেই। মনে-মনে সে বড় তৃপ্ত হয়েছিল এই বুঝে যে তার এমনই ক্ষমতা যে মেয়ের একটু সর্দি-কাশি হলেও কী করে সে খবর পেয়ে যায়।
হঠাৎ পেছনের দিকে অর্ধেক মুখ ফিরিয়ে সে প্রশ্ন করে, আজ বিষ্যুৎবার নাকি?
হ্যাঁ, আজ বিষ্যুৎবার । দুটি লোক সমস্বরে বলে ওঠে।
প্রশ্নটি কেন জিজ্ঞাসা করে তার আভাস না দিয়ে সে নীরবে হাঁটতে থাকে। তবে ততক্ষণে সে দিনটা ঠিক করে নিয়েছে : স্টিমার আসবে শনিবার। মন যেন তাই বলছে। তাই যদি হয় তবে রবিবারই সে সদর অভিমুখে রওনা হয়ে পড়বে। মেয়ে হোসনা সম্বন্ধে মনে আবার কোনো দুশ্চিন্তা দেখা দেয় তা নয়, তবে হঠাৎ তাকে দেখবার জন্যে কেমন অধীরতা বোধ করতে শুরু করে, এবং সঙ্গে-সঙ্গে মেয়েটির চেহারাও সুস্পষ্টভাবে জেগে ওঠে তার মনশ্চক্ষে। হোসনা চোখের সামনে না থাকলে তার যে-চেহারাটি সে দেখতে পায় তা তার বালিকাবয়সের চেহারা, যেন বাপের চোখে মেয়েটি বড় হয়ে যুবতীতে পরিণত হবার অবকাশ পায় নি, তার বিয়ে হয় নি, একটি ছেলের মাও হয় নি সে। কখনো-কখনো মেয়েটি চোখের সামনে থাকলেও উকিল। সাহেব তার বেশ কয়েক বছর আগের চেহারাটিই দেখতে পায় : কোঁকড়ানো চুলের মধ্যে মিষ্টি একটি মুখ, বড় বড় চোখে দাম্ভিকতার ভাব। তখন তার বয়স সাত-আট। সে-বয়সেই মেজাজটা বেশ উধরনের হয়ে উঠেছিল, কিছু চেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে না পেলে বা কোনো শখ আবদার তৎক্ষণাৎ না মেটালে চোখ কালো হয়ে উঠত ঠোঁট ফুলে . উঠত। গোপনে-গোপনে স্ত্রীকে বলত, মেয়েটির মেজাজ শাহজাদির মতো। স্ত্রী উত্তর দিত, বাদশাহ কোথায় যে শাহজাদি হবে? মনে মনে সে উত্তর দিত : কুমুরডাঙ্গার বাদশাহ সে, সে বাদশাহের মেয়ে হল হোসনা।
আজ বিষ্যুৎবার? আবার উকিল সাহেব প্রশ্ন করে, যেন সেবার উত্তরটি শুনতে পায় নি।
এবার পশ্চাৎ থেকে চারটি লোক বেশ জোরগলায় বলে, হ্যাঁ, আজ বিষ্যুৎবারই উকিল সাহেব।
তবে মধ্যে একটি মাত্র দিন, তারপর স্টিমার আসবে। এবং দুটি দিন-আজকার এবং সদর অভিমুখে রওনা হওয়ার মধ্যে। একবার তার ইচ্ছা হয় কেন প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করেছিল তা মক্কেলদের বলে, কিন্তু শেষপর্যন্ত নীরব থাকাই সমীচীন মনে করে; ইতিমধ্যে মেয়েকে দেখবার জন্যে রবিবারে সদর অভিমুখে রওনা হয়ে পড়ার পরিকল্পনাটি যদি করে না ফেলত তবে হয়তো বলতে বাধা বোধ করত না।
ততক্ষণে উকিল কফিলউদ্দিন কুমুরডাঙ্গার একমাত্র বাঁধানো সড়কের নিকটে এসে পড়েছে। সড়কটি কাছারি-আদালতের সামনে মাঠের এক পাশ দিয়ে শুরু হয়ে নদীর ধার দিয়ে পোয়া-মাইলখানিক গিয়ে হঠাৎ থেমে যায়। পোয়া-মাইল দীর্ঘ সড়কটির অবস্থা বড়ই শোচনীয়, কারণ অনেকদিন মেরামত হয় নি বলে এখানে-সেখানে নানা আয়তন-গভীরতার গর্ত, আবার যেখানে গর্ত নেই সেখানে ধারালো ইট-কঙ্করের নির্লজ্জ দন্তবিকাশ। বস্তুত, সে-বাঁধানো সড়কে জুতা নিয়েও পা-দেয়া দুষ্কর, এবং বাঁধানে: অংশটি এড়িয়ে তার এক পাশে দিয়ে মানুষেরা বাধ্য হয়ে যে পায়ে-হাঁটার পথ করে নিয়েছে সে-পথ ধরেই সবাই হাঁটে। একদা ইংরেজের আমলে কেউ তার নাম দিয়েছিল ই.বি. ক্র্যাংশ রোড-যে-নাম রাস্তার এক প্রান্তে একটি ছায়াশীতল বড় গাছের গুঁড়িতে পোতা কাষ্ঠলকে এখনো বিরাজমান, যদিও ঝুলে-পড়া লতাপাতার জন্যে তা নজরে পড়ে না, পড়লেও দীর্ঘদিনের রোদবৃষ্টিতে আপাঠ্য-হয়ে-উঠা অক্ষরগুলির অর্থোদ্ধার করা সম্ভব হয় না।
ব্যবহারের অযোগ্য সে-সড়কের পাশে পায়ে-হাঁটার পথে উঠেছে এমন সময় কফিলউদ্দিন সাহেব একটি আওয়াজ শুনে চমকিত হয়ে থেমে পড়ে। আওয়াজটি যেন স্টিমারের বাঁশির আওয়াজ। তবে কি স্টিমার ফিরে এসেছে? শনিবারে নয়, আজই। এসে পড়েছে? দিনক্ষণের বিষয়ে কিছু ভুল হলেও মনে যে-কথাটি এসে দেখা দিয়েছিল তা তবে সত্য?
কিসের আওয়াজ শুনলাম যেন। উকিল কফিলউদ্দিন বলে।
পশ্চাতের মক্কেলরাও দাঁড়িয়ে পড়ে নদীর দিকে তাকিয়ে শুনবার চেষ্টা করছিল। সেখান থেকে স্টিমারঘাট নজরে পড়ে না। শীঘ্র একজন মক্কেল উত্তেজিত ভাবে বলে,
