বছর কয়েক পরে হঠাৎ খেদমতুল্লার কপাল খোলে। তখন কাপড়ের কল সস্তা কিন্তু শৌখিন ঢঙের নূতন শাড়ি বাজারে ছেড়েছে। হাটে-বাজারে দুচারটা শাড়ি বিক্রি করতে শুরু করে দেখতে-না-দেখতে সারা অঞ্চলে কলের কাপড়ের বড় রকমের ব্যবসা ফেঁদে বসে, তারপর হাতে বেশ পয়সা হলে তিন ক্রোশ দূরে চাঁদবরণঘাটে বাড়ি করে সেখানে সপরিবারে বাসস্থান স্থানান্তরিত করে; সহসা খেদমতুল্লার জীবনে সুদিন দেখা দেয়। কেবল সে-সুদিন স্থায়ী হয় নি।
তখন সে-অঞ্চলে মাড়োয়ারিদের বড় প্রভাব-প্রতিপত্তি। তাদেরই একজনের দৃষ্টি পড়ে খেদমতুল্লা এবং তার হঠাৎ প্রস্ফুটিত লাভজনক ব্যবসার ওপর এবং বেড়াল যেমন তার নাকের খেদমতুল্লা এবং তার ব্যবসাটির ওপর নজর পড়লে সে-মাড়োয়ারিও বিস্মিত-আমোদিত বোধ করে তেমনি খেদমতুল্লা এবং তার ব্যবসাটির ওপর নজর পড়লে সে-মাড়োয়ারিও বিস্মিত-আমোদিত বোধ করে থাকে। তারপর আকস্মিকভাবে থাবা নেবে আসে। অতর্কিতভাবে ব্যবসাটি হারিয়ে খেদমতুল্লা হয়তো জীবনে প্রথম একটি গভীর আঘাত বোধ করে, ন্যায়বিচারহীন নিষ্ঠুরতার বিষয়েও সজ্ঞান হয়। কিছুদিন পরে সহসা একটি পরিবর্তন দেখা দেয় তার মধ্যে। প্রথমে কেমন সংসার পরিবার বিষয়ে উদাসীন হয়ে ওঠে, তারপর ক্রমশ গোপনকারী হয়ে পড়ে। মাস কয়েকের মধ্যে সে রহস্যময় ব্যবসাটিও ধরে। আস্তে-আস্তে সাক্ষী হিসেবে আদালতে তার হাজিরা শুরু হয়ে শীঘ্র সেটি একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। প্রথমে মহকুমার কাছারি-আদালতে, তারপর জেলা-সদরে, পরে আরো দূরে প্রদেশের রাজধানীতেও তার যাতায়াত হতে থাকে। ন্যায়-সুবিচারের মতো উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই এ মামলায় সে-মামলায় সাক্ষী দিতে শুরু করে নি-সে-কথা একদিন কারো অগোচর থাকে না, বিশেষ করে যখন নানা নির্দোষ পরিবারের ধ্বংসের, পরম দুঃখের এবং অপমান লাঞ্ছনার কথা প্রচারিত হতে শুরু হয়। তবে তাতে সে দমে নি; একবার শঠতাকে পেশা বলে গ্রহণ করার পর শঠতার অপবাদকে ভয় করলে চলে না। নূতন ব্যবসাটি বিপদজনক হলেও অতিশয় লাভজনক : শঠতা ফলবতী হচ্ছে এ-জ্ঞানে সে গভীর তৃপ্তি লাভ করে। কেবল তৃপ্তিটা কেমন বিচিত্র যেন, কেমন বিষময়ও, কারণ সমগ্র মন-প্রাণ দিয়ে উপভোগ করা সে-তৃপ্তিই তার অন্তরকে বিষমভাবে বিকৃত করে তোলে। ক্রমশ তার চরিত্র থেকে সর্বপ্রকার মনুষ্যত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সে-সবের স্থান নেয় হিংস্রতা, কুটিলতা, হাসি-আনন্দশূন্য উকট ধরনের একরোখা ভাব, মানুষের প্রতি ঘোর অবিশ্বাস এবং অকথ্য কৃপণতা।
অকস্মাৎ কোনো কারণে ভীত হয়ে শেষবারের মতো এক ধনী মানুষের মামলায় দাও মেরে বিপদজনক অসৎ ব্যবসাটি ছেড়ে এবার সে পাটের ব্যবসা ধরে। তবে তার চরিত্রের আর পরিবর্তন হয় না : সে-চরিত্র যেন চিরকালের জন্যে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, স্নেহমমতার কাছ থেকেও চিরবিদায় নিয়েছিল। এ-সময়ে বাদি রাখার সখও চাপে তার এবং দ্বিতীয় বার বিয়ে না করে নূতন নূতন যুবতী বাদির আমদানি করতে শুরু করে এ গ্রাম সে-গ্রাম থেকে। বাদির বসবাসের জন্যে উঠানের পেছনে একটি আলাদা ঘর তুলে নেয়।
পরিবারের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখা দেয় তার মধ্যে চারিত্রিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই। আর্থিক সচ্ছলতা সত্ত্বেও অকথ্য কৃপণতার জন্যে স্ত্রী-পুত্রকে কিছু দিতে হাত উঠত না, কী-একটা দুর্বোধ্য হিংস্রতার তাড়নায় কারণে-অকারণে তাদের মারত ধরতও। খেদমতুল্লার বিশেষ শাস্তিবিধান ছিল কনই মারা। সে-শাস্তির উপকারিতায় তার অখণ্ড বিশ্বাস জন্মেছিল বলে কনুই মারার কৌশলটি সযত্নে করায়ত্ত করেছিল, হাতবাহু একত্র করে কনুইটা বিদ্যুৎবেগে পিঠে বসিয়ে দিলে তার ক্রোধের পাত্র নিমিষেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলত। মুছল্লি মানুষের কপালে যেমন গাট্টা পড়ে তেমনি তার কনুইতে গাট্টা পড়েছিল।
সচরাচর মুহাম্মদ মুস্তফার পিঠেই সে-ভীষণ শাস্তিটা নেবে আসত। মুহাম্মদ মুস্তফা নীরবে সহ্য করত সে-শাস্তি এবং বাপের অন্তরে কোথাও পিতৃসুলভ স্নেহমমতা না থেকে পারে না, যা করছে তা অতিশয় নিষ্ঠুর হলেও ছেলের ভালোর জন্যেই করছে-এ সব যুক্তির ওপর সমস্ত বিশ্বাস ন্যস্ত করে তার মা আমেনা খাতুনও চোখ-কান বুজে সহ্য করত। তবে একদিন হয়তো ব্যাপারটি তার সহ্যাতীত হয়ে পড়ে।
অনেক রাত করে জেলাশহর থেকে ফিরে খেদমতুল্লা দেখতে পায় মুহম্মদ মুস্তফা পেছনের বারান্দায় অন্ধকারের মধ্যে বজ্রাহত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে। তখন মুহাম্মদ মুস্তফার বয়স তেরো হবে। বাপকে দেখেও সে না নড়ে পূর্ববৎ দাঁড়িয়ে থাকলে খেদমতুল্লা এবার রুষ্ট কণ্ঠে তার আচরণের কারণ জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু কোনো উত্তর পায় না। বিস্মিত হয়ে ছেলের নিকটে গিয়ে তার মুখের দিকে তাকায়, ছেলেও তাকায় তার দিকে ভীত হয়ে। তবে সেদিন শীঘ্র তার ভয় কাটে, কারণ তার মনে হয় সে যেন তার বাপের চোখে ক্রোধ নয়, কেমন স্নেহসূচক উৎকণ্ঠাই দেখতে পেয়েছ। কল্পিত বা সত্য সে-স্নেহের আভাস বালককে পরাভূত করে।
লুঙ্গি ভিজে গিয়েছে, এবার মুহাম্মদ মুস্তফা উত্তর দেয়।
কথাটি বুঝতে খেদমতুল্লার কিছু সময় লাগে। কিন্তু তারপর বিদ্যুৎঝলকের মতো তার অর্থ তার কাছে পরিষ্কার হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে, বালক মুহাম্মদ মুস্তফা আর বালক নয়, সে তার জীবনের একটি নূতন অধ্যায় শুরু করেছে। তবে খেমতুল্লা কেবল সে-কথাই বুঝতে সক্ষম হয়, অজ্ঞানতার জন্যে এবং ঘটনাটির আকস্মিকতার জন্যে বালক মুহাম্মদ মুস্তফা যে ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়ে থাকবে, এ-সময়ে সে যে সমবেদনার প্রয়োজন বোধ করতে পারে বা জীবনবিষয়ে অভিজ্ঞ আপনজনদের কাছে তার রহস্যসময় আবিষ্কারের গূঢ় অর্থ জানবার জন্যে গভীর ব্যাকুলতা অনুভব করতে পারে এ-সব কথা অতর্কিতে জাগ্রত নিদারুণ ক্রোধের জন্যে বুঝতে পারে নি, বুঝবার ক্ষমতাও হয়তো তার ছিল না। নিমিষে একটি সর্বনাশী ক্রোধ খেদমতুল্লাকে গ্রাস করে, কারণ ঘটনাটিতে একটি ভয়ানক পাপ ও অকথ্য কলুষতাই সে দেখতে পায়; বালক ছেলে তার ক্রোধান্ধ দৃষ্টিতে একটি দুশ্চরিত্র লম্পটের রূপ গ্রহণ করে।
