না, স্টিমার যে শীঘ্র কুমুরডাঙ্গায় ফিরে আসবে তাদের সে-বিশ্বাসের কারণ যা-ই হোক তাতে ফাঁক-ছিদ্র ছিল না, থাকলে সেদিন যারা স্টিমার ধরতে গিয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছিল তার দু-একদিন অপেক্ষা করে যাওয়ার একটা উপায়ের সন্ধান করত ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা না হলেও অন্ততপক্ষে তারা, যাদের জন্যে যাওয়াটা একান্ত জরুরি। যাওয়ার যে অন্য উপায় রয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্যেই ততদিনে অনেক নৌকা ঘাটে এসে মোতায়েনও হয়েছিল। সে-সব নৌকা রাতারাতি চলে এসেছিল নদী পাড়ি দিয়ে, খাল-বিল অতিক্রম করে, পাল তুলে দাঁড় বেয়ে লগি ঠেলে। কত রকমের নৌকা : হোট-বড়, ঢঙের-বেঢঙের, এমন তুফান উপেক্ষা করে, আবার তেমন নৌকাও। যাতে খাল অতিক্রম করতে ভরসা হয় না; কোনো নৌকা হয়তো পানিতে কাৎ হয়ে ছিল, তাকে তুলে তার গা-এ গাব ঘষে কোনোপ্রকারে ভাসিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, আবার কোনো নৌকা বেশ শক্ত মজবুত, আয়তনেও বড় কিন্তু যা ব্যবসাজীবন্ত লঞ্চ স্টিমার-নৌকায় সমাকীর্ণ জনসঙ্কুল কোনো ঘাটে-গঞ্জে তীক্ষ্ম প্রতিযোগিতার দরুণ নিষ্ফল আশায়ই দিন কাটাত। সক্ষম-অক্ষম নৌকার মধ্যে আবার বেমানান নৌকাও কম ছিল না-যে-সব নৌকাদের লালসাই টেনে নিয়ে এসে থাকবে : ঘাস-নৌকা, কুমোর-নৌকা, জন্তুজানোয়ারের নৌকা। তাছাড়া দু-টি বজরাও এসে দলে যোগ দিয়েছিল যার একটিতে হয়তো অন্য কোনো যুগে শৌখিন লোকেরা বাঈজি-গাইয়ে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আমোদবিহারে বের হত। এখন তার রঙ নেই, খড়খড়ির অভাবে একটি জানালা খাঁ খাঁ করে, জোড়াতালি-দেয়া দেহটাও কেমন সৌষ্ঠবহীন। তবে অন্যটি ছোটখাটো ছিপছিপে, গায়ের রঙটাও তাজা। সেটি শ্রী-যৌবনের পরিমায় কিছুটা উদ্ধতভাবে অন্য বজরা থেকে দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীর জন্যে অপেক্ষা করে।
রাতারাতি সমাগত এ-সব নৌকা-বজরা কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের হয়তো শকুনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, যে-শকুন সদলবলে এসে মরণোন্মুখ জন্তুর চতুর্দিকে জমা হয়ে তার শেষনিঃশ্বাসের জন্যে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। তবে তারা বিচলিত হয় না। তাদের মনে হয়, শকুন যা জানে নৌকার মাঝিরা তা জানে না : নৌকার মাঝিরা জানে কুমুরডাঙ্গা ঘাটে স্টিমার ফিরে আসবে।
কিছুদিন আগেও মুহাম্মদ মুস্তফার মা আমেনা খাতুনকে তার স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তার স্বামীর নাম ছিল খেদমতুল্লা। কখনো সে খেদমতুল্লা শেখ, কখনোবা কোনো কারণে মুন্সী খেদমতুল্লা বলে নিজের নাম-পরিচয় দিত। তবে আমরা উত্তর ঘরের ছেলেরা তাকে খেদুচাচা বলে সম্বোধন করতাম।
চাচী আমেনা খাতুনকে খেদুচাচার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম এই আশায় যে তার সম্বন্ধে বিধবা স্ত্রীর কাছে এমন কিছু শুনতে পাব যা আগে কখনো শুনি নি।
আমেনা খাতুন মধ্যে-মধ্যে তার প্রথম স্বামী আফজল শেখের কথা বলে থাকে যদিও প্রথম স্বামীর স্মৃতিটা আজ তার মনে তেমন উজ্জ্বল নয়। বস্তুত তার নাম নিয়ে যে-সৌম্য চেহারার লম্বা-চওড়া মানুষের দৈহিক আকৃতি বা অশেষ চারিত্রিক গুণের বর্ণনা দেয় সে-মানুষ নিতান্ত কল্পনাপ্রসূত, যার সঙ্গে আসল মানুষটির সাদৃশ্য নেই বললে চলে। সেটা হয়তো অস্বাভাবিক নয়। আফজল শেখের যখন বিয়ে হয় তখন আমেনা খাতুন বালিকামাত্র। তাদের দাম্পত্যজীবনও স্থায়ী হয় নি, কারণ বিয়ের মাস। পাঁচেক পরে বসন্তরোগে আফজল শেখের মৃত্যু ঘটে। তবে যে-মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ পনেরো বছর বসবাস করেছে সে-মানুষের কথা আমেনা খাতুন কদাচিত্র বলে থাকে। হয়তো মানুষটি এখনো তাকে বিহ্বল করে, হয়তো তার সঙ্গে পনেরো বছরের বসবাসের স্মৃতিটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে তার সাহস হয় না।
খেদমতুল্লার নাম শুনে আমেনা খাতুন কয়েকমুহূর্ত স্তব্ধ হয়েছিল, চোখে ক্ষণকালের জন্যে অস্বাভাবিক চাঞ্চল্যও দেখা দিয়েছিল। আমেনা খাতুনের চোখ বড়, যাকে এক সময়ে লোকেরা ডাগর-চোখ বলত। তবে অনেকদিন হল তার চোখের মৃত্যু ঘটে গিয়েছে। আমেনা খাতুন চোখ বোজে চোখ খোলে, তার দৃষ্টি এধার-ওধার যায় নড়ে-চড়ে, কিন্তু অন্ধের মতো জ্যোতিহীন সে-চোখে প্রাণের ক্ষীণতম স্পর্শও নেই। আরো মনে হয়, সে-চোখে দশজনের মতো দেখতেও পায় না যদিও তাতে ছানি নেই দুর্বলতা নেই। তাই সে-চোখে সহসা চাঞ্চল্য লক্ষ্য করে আশান্বিত হয়েছিলাম। আমেনা খাতুনের পক্ষে মানুষের আচরণ-ব্যবহারের অর্থ বা তার জীবন-উদ্দেশ্য বোঝা সহজ নয়। কিন্তু সহসা সে কি তার দ্বিতীয় স্বামী খেদমতুল্লার আচরণ-ব্যবহারের অর্থ বা তার জীবন-উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছে?
আমেনা খাতুনের চোখ শীঘ্র আবার নিথর নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল, সে কিছু বলেও নি।
প্রথম স্বামী আফজল শেখের মৃত্যুর পর আমেনা খাতুন শ্বশুরালয়ে কিছুদিন অনাদরে কাটিয়ে সামান্য মনোমালিন্য ঝগড়া-ফ্যাসাদের পর সে-বাড়ির সঙ্গে চিরদিনের জন্যে যোগাযোগ ছিন্ন করে বাপের ভিটেয় ফিরে এলে দিন-কয়েকের মধ্যেই গ্রামের ব্যস্তবাগীশ চিরউৎফুল্ল যুবক খেদমতুল্লার দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। অস্থির প্রকৃতির হলেও প্রাণবন্ত সজীবতা এবং অফুরন্ত রসিকতার জন্যে খেদমতুল্লা তখন সকলের প্রিয়পাত্র। অল্প বয়স থেকে নানাদিকে তার মন, এটা ওটা হবার সখের অন্ত নেই, হবার হয়তো ক্ষমতাও ছিল। গাইয়েদের সঙ্গে ধুয়া ধরা, কবিওয়ালাদের সঙ্গে ছন্দ মেলানো, ফকির দরবেশের গন্ধে দেশান্তর হওয়া, আবার ঝোঁক উঠলে চরে গিয়ে লাঠিবাজি করা-কিছুই তার অতীত ছিল না। তারপর সহসা ব্যবসার দিকে তার মন ছোটে। মুখে দাড়িগোঁফ ভালো করে গজাবার আগেই সে সুপারি চালান হতে শুরু করে নৌকা-খাটানো পর্যন্ত নানাপ্রকার ব্যবসায় হাত মক্স করে নিয়েছিল। তবে কোনো ব্যবসায়েই এ-সময়ে কপাল লাগে নি। সে যখন অপ্রত্যাশিতভাবে আমেনা খাতুনের মুরুব্বির কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় তখন পানের ব্যবসায়ে অকৃতকার্য হয়ে শূন্যহাতে, হয়তো সাময়িকভাবে উজ্জ্বল কোনো পরিকল্পনার অভাবে, ঘরে বসে। তবু সে-প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি কেউ দেখতে পায় নি; বরঞ্চ আত্মীয়স্বজন, মুরুব্বিরা এবং গ্রামের নেতৃস্থানীয় লোকেরা সবাই সেটি এককণ্ঠে সমর্থন করে। আমেনা খাতুনের অল্পবয়সে বৈধব্যদশা, ওদিকে ব্যবসায়ে বদনছিবের বদনাম ছাড়া খেদমতুল্লার নামে নিষ্কলঙ্ক। বিয়ের বছরখানেক পরে মুহাম্মদ মুস্তফার জন্ম হয়। তখনো খেদমতুল্লা কোনো ব্যবসায়ে সার্থক হয় নি। সংসারে অনটন, বস্তুত খাদ্যবস্তু উভয়েরই কষ্ট। তবু সে-সব কষ্ট নিত্য-হাসিমুখ স্নেহশীল স্বামীর সাহচর্যে আমেনা খাতুন অম্লানবদনেই সহ্য করেছে।
