কোথায় তার উৎপত্তি কে-বা চালু করে-তা সঠিকভাবে কখনো জানা সম্ভব না হলেও একবার একটি জনশ্রুতি শোনা গেলে বিদ্যুৎগতিতে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রত্যেকবার শহরবাসীদের মনে গভীর আশার সঞ্চার করে। কখনো তাদের মনে হয় একটি খবর বিশ্বস্ত সূত্রেই জানতে পেরেছে, পরে অনুসন্ধান করে দেখলে বোঝা যায় সে-সূত্রের পশ্চাতে আরেকটি সূত্র যেন, সে-ও আবার কোথায় যেন শুনেছে খবরটি। কখনো একটি খবরের পশ্চাতে কোনো মুখ দেখতে পায় না, দেখতে পায় কেবল একটি স্থান। যেমন স্টিমার দুটি মেরামতের জন্যে গিয়েছে সে-কথা কে বলেছিল সে-বিষয়ে কেউ নিশ্চিত হতে না পারলেও কোথায় শোনা গিয়েছিল তা নিয়ে তর্কের অবকাশ হয় না: খবরটি শোনা গিয়েছিল কাছারি আদালতের সামনে ধুলাচ্ছন্ন নেড়া মাঠের পর অশ্বখগাছের তলে নিত্য যে-ভিড় বসে সে-ভিড়ের মধ্যে। শুধু সেই ভিড়-কোনো মুখ নজরে পড়ে না, কোনো কণ্ঠও শোনা যায় না। কিন্তু জনশ্রুতিগুলির উৎসসন্ধানে কেউ কালক্ষেপ করে না, যা শোনে তা অবান্তর মনে না হলেই নির্বিবাদে গ্রহণ করে। তাই স্টিমার দুটি মেরামতে গিয়েছে সে-খবর শোনামাত্র অবিলম্বে তা তারা বিশ্বাস করে নেয়। কথাটি নেহাৎ যুক্তিযুক্ত : স্টিমার কলের জিনিস হলেও মানুষের দেহের মতোই তা বিগড়ে যেতে পারে। কতদিন ধরে স্টিমার দুটি এ-পথে আসা যাওয়া করেছে, একদিনের জন্যে না থেমে একটু বিশ্রাম না করে। তবে যারা এই নিশ্চিত বিশ্বাসে অপেক্ষা করতে শুরু করে যে মেরামত শেষ হলেই বংশীধ্বনি করে পূর্বের মতো স্টিমার দুটি ঘাটে এসে উপস্থিত হবে, তাদের বিশ্বাসটি তাদেরই অজান্তে কখন অন্য একটি বিশ্বাসে স্থানান্তরিত হয়; যে-জনশ্রুতির কোথাও কোনো ভিত্তি নেই সে-জনশ্রুতি হাওয়া-তাড়িত মেঘের মতো সদাচঞ্চল, এ-মুহূর্তে এখানে আছে অন্য মুহূর্তে নেই, যা ঘনঘটার রূপ ধারণ করে তা আবার দেখতে-না-দেখতে শূন্য নীলাকাশে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এবার যে-জনশ্রুতি তাদের বিশ্বাসে শিকড় গাড়ে, তা সর্বপ্রথম চড়ার সম্ভাবনাকে স্বীকার করে। তবে চড়ার অস্তিত্ব গ্রহণ করলেও সেটি তাদের মনে দুরতিক্ৰমণীয় প্রতিবন্ধকের রূপ গ্রহণ করে না। তারা বলে, চড়া পড়েছে কথাটা সত্য এবং সে জন্যেই ঘাটটি বর্তমান স্থান থেকে সরিয়ে শহরের উত্তরদিকে একটি নূতন স্থানে বসানো হবে, কেবল যতদিন পর্যন্ত ঘাটটি সেখানে সরানোনা হয় ততদিন পর্যন্ত স্টিমার চলাচল বন্ধ থাকবে। এ-জনশ্রুতির উদ্ভাবক চড়াটি বর্তমান ঘাটের সামনেই দেখতে পায়। তাই-বা কী করে অবিশ্বাস করা যায়? শহরের বৃদ্ধদের এখনো স্মরণ আছে, কুমুরডাঙ্গায় ঘাট স্থাপিত হবার কয়েক বছরের মধ্যে সে-ঘাট তিনটে বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। প্রথমে কাছারি-আদালতের ঘাটটি বসানো হয়েছিল। তারপর সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় উকিল কফিলউদ্দিনের বর্তমান বাড়ির কিছু দক্ষিণে। সেখানেও ঘাটটি বেশিদিন টিকে থাকে নি, বছর দুই-তিনেক পরে আবার স্থানচ্যুত হয় সেখান থেকে। তবে তারপর থেকে ঘাটটি আর নড়ে নি, সে-সময়ে ঘাটে ফ্ল্যাটটিরও প্রবর্তন হয়।
৪. নূতন হাওয়া এসে
নূতন হাওয়া এসে জনশ্রুতিও যথাসময়ে উড়িয়ে নিয়ে যায়, পশ্চাতে কোনো আক্ষেপ-আফসোস না রেখে। এবার যে-জনশ্রুতি ওঠে সেটি পূর্ববর্তী জনশ্রুতির একটি পরিবর্তিত সংস্করণ বলে মনে হয়, এবং এটাও চড়ার অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করে না। এবার তারা বলে, হ্যাঁ, চড়াটা বেশ বড় রকমেই পড়েছে যে-জন্যে এ-পথে স্টিমারের চলাচল আর সম্ভব নয়, তবে এবার স্টিমারের পরিবর্তে লঞ্চের প্রচলন করা হবে। এ-জনশ্রুতিটাও কেউ অবিশ্বাস করে না।
এ-সব জনশ্রুতি যেমন কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের কল্পনাশক্তি বা উদ্ভাবনক্ষমতার পরিচয় দেয় তেমনি তাদের চারিত্রিক সরলতাও প্রকাশ করে, কারণ সরলচিত্ত মানুষের পক্ষেই সে-ধরনের জনশ্রুতি এমন সোৎসাহে এবং গভীর বিশ্বাসে গ্রহণ করা সম্ভব। তবে মনের অতলে সত্য কথাটি থেকে-থেকে উঁকি দিতে চেষ্টা না করলে তাদের কল্পনাশক্তি বা উদ্ভাবনক্ষমতা কি এমন তীক্ষ্মভাবে প্রকাশ পেত বা সরলচিত্ত বিশ্বাস এমন গভীর রূপ ধারণ করত? হয়তো নিরাশা-ঢাকা তাদের কাছে নিতান্ত দুরূহ মনে হয়েছিল বলেই তাদের আশা এমন উৎকটভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
এবং সে-জন্যেই হয়তো নানারকমের জনশ্রুতির উদ্ভাবন বা সে-সব জনশ্রুতির বিতরণের মধ্যে কোনো চপলতাও দেখা যায় নি, সে-সব অটুট গাম্ভীর্যের সঙ্গেই তারা গ্রহণ করে। অতএব কোনো জনশ্রুতির ওপর সমস্ত বিশ্বাস স্থাপন করে একটি লোক যদি হাস্যকর কাণ্ড করে বসে তাতে কেউ উপহাসের কিছু দেখতে পায় নি। একদিন বারো বছরের মৃতপ্রায় ছেলেকে কোলে নিয়ে মোক্তার হাবু মিঞা ঊর্ধ্বশাসে স্টিমারঘাট অভিমুখে রওনা হলে এবং শীঘ্র তাকে অনুসরণ করে অনেক লোক পথে বেরুলে কেউ অমোদিত বোধ করে নি বা হাসে নি-তখনো নয় যখন সমস্ত ব্যাপারটি কীভাবে শুরু হয়েছিল তা জানতে পায়। সকালে হাবু মিঞা নদীতীর থেকে মাছ কিনে বাড়ি ফিরছিল। পথে রতনলাল মুহুরির ছেলে তাকে বলে, খবর এসেছে স্টিমার আজই আসবে। হাবু মিঞা কথাটি বিশ্বাস করে নি। স্টিমার নিশ্চয়ই আসবে, তবে আসতে আরো দিন কয়েক সময় নেবে। স্টিমারের কথা ভুলে গিয়ে দুপুরের দিকে দলিলপত্র নিয়ে মগ্ন হয়ে আছে এমন সময় সহসা সে সুপরিচিত বংশীধ্বনিটি শুনতে পায়। চমকিত হয়ে সে কান খাড়া করে। না, কানের ভুল নয়, স্টিমারেরই বংশীধ্বনি। এখনো দূরে, তবে স্টিমারটি যেন স্রোতে ভেসে আসছে, বংশীধ্বনিটিও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারপর কীভাবে সে দৌড়ে বাড়ি গিয়ে ছেলেকে বুকে তুলে নিয়ে ঘাটে পৌঁছেছিল তা নিজেও বলতে পারবে না।
