ছোট চাচা বদর শেখ অতিশয় অলস প্রকৃতির লোক ছিল। সে আমাদের উত্তর ঘরের পাশে থাকত, দু-বাড়ির মধ্যে ছিল একটি বেড়া মাত্র। সংসারের কাজকর্মে মন ছিল না, বাপের মৃত্যুর পর ভাগাভাগি করে যে-সামান্য জমিজমা হাতে পেয়েছিল সে জমিজমা দেখাশুনা করলে পেটে খেয়ে তার নিশ্চিন্তে দিন কাটত, নুন-তেল তো বটেই কখনো-কখনো পোশাক-আশাকের পয়সাও উঠত। তবে জমিজমার চেয়ে তার আলস্যই ছিল বেশি। অন্যান্য লোকেরা যখন রত্তিপ্রমাণ সামান্য জমি থেকেও শুধু ধান নয়, শাকসবজি সর্ষে খেসারি কলাই তুলত, সে তার জমি থেকে যৎসামান্য ধান পেয়েই সন্তুষ্ট থাকত। অন্য বাড়ির ছাদে সোনালি রঙের মস্তমস্ত চালকুমড়া শোভা পেত তার ঘরের চাল অভাগিনী নারীর হাতের মতো শূন্যতায় ধু-ধু করত। ঈদের দিনে অন্যের ছেলেমেয়েরা রঙদার কাপড় পরে আনন্দে কলরব করত, তার ঘরের দুটি ছেলে ছেঁড়া কাপড় গায়ে কিছু ঈর্ষান্বিত কিছু অবুঝ চোখে সকলের দিকে চেয়ে থাকত, আনন্দের কারণ বুঝত না। তারপর একদিন সে যে অলস নয় সে-বিষয়ে সকলকে এবং নিঃসন্দেহে নিজেকে আশ্বস্ত করবার জন্যেই যেন সহসা দ্বিতীয় বার বিয়ে করে বসে। চাচা বদর শেখের বড়-বড় দাঁত ছিল। ক-দিন ধরে সে-দাঁতগুলি অহর্নিশি উন্মুক্ত হয়ে থাকে একটি নির্বোধ হাসিতে। তবে চাচা বদর শেখ একটি অতিশয় রুগ্ণা মেয়েকেই স্ত্রী হিসেবে ঘরে এনেছিল। প্রথম ক-দিন টানা-ঘোমটা এবং লজ্জাশরম-রঙমেহেদির জন্যে তা নজরে পড়ে নি, কিন্তু শীঘ্র তার বীভৎসপ্রায় রুগ্ণতার কথা সকলে জানতে পায়, ঘোমটার নিচে সবই দেখতে পায় একটি মিষ্টি কিন্তু রক্তহীন প্রাণহীন মুখ। দেহের হাড়সর্বস্ব শীর্ণতাও আবিষ্কার করতে দেরি হয় না : শুকিয়ে-যাওয়া নদীর মতোই সে দেহের রূপ। এবং চোখে জীবনের সাধ তখনো মেটে নি, তবে তাতে আজরাইলের ছায়া। নূতন বউ-এর স্বাস্থ্যের অবস্থা দেখে চাচা বদর শেখ বিশেষ চিন্তিত হয় নি, কারণ তার মনে হয় দু-দিন খেয়েদেয়ে গা-এ হাওয়া লাগিয়ে বেড়ালেই বানের পানির মতো তার দেহে স্বাস্থ্য ফিরে আসবে। তবে ধারণাটি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, কারণ দিনে-দিনে নূতন বউ-এর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। চাচা বদর শেখ তার চিরদিনের আলস্য বর্জন করে কেমন দিশেহারা মানুষের মতো মেয়েটির চিকিৎসা এবং ওষুধপথ্যের ব্যবস্থা করে, চাঁদবরণঘাট থেকে ভালো ডাক্তারও ডেকে আনে। সেবার ভালো ফসল হয় নি, বর্ষার আগেই ধান শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন ধান-চাল কিনে চলেছে, আর ধান-চাল কেনার পয়সা নেই। অতএব চাচা বদর শেখকে কাইন্দাপাড়ার দক্ষিণদিকে ডোবা জমিটাও বিক্রি করতে হয়েছিল।
তবে মেয়েটি বাঁচে নি, বিয়ের মাস তিনেক পরে একদিন ঝোড়ো সন্ধ্যায় অশ্রান্ত হাওয়ার গর্জনের মধ্যে সকলের অলক্ষিতে সে তার শেষনিঃশ্বাস ছাড়ে। কেউ তার জন্যে এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলে নি। চাচা বদর শেখ তার জন্যে এত কিছু করলেও তার মৃত্যুর পর কেবল অর্ধেক দিন কেমন স্তম্ভিত হয়ে থাকে, তার চোখেও ঈষৎ সজলতা দেখা যায় নি।
তারপর কেউ বলে, ঘরে বলা এসেছিল, সে-বলা দূর হয়েছে। সেদিন থেকেই যেন মাটির দলার মতো বিচিত্র জন্তুটির ছায়া দূর হয় মুহাম্মদ মুস্তফার মন থেকে।
তবারক ভুইঞা বলছিল : স্টিমার-চলাচল কেন বন্ধ হয়েছে-সে-বিষয়ে গণ্যমান্য উকিল কফিলউদ্দিনের ধারণাটি কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীরা আগ্রহভরেই গ্রহণ করে, এবং দেখতে-না-দেখতে যা প্রথমে সত্য বলে মনে হয়েছিল তা অবিশ্বাস্য একটি কথায় পরিণত হয়, যে-চড়া শুধু নদীতে নয়, শহরবাসীদের বুকেও ভার হয়ে জেগে উঠেছিল, সে-চড়া ভার উত্তোলন করে নিমিষে অদৃশ্য হয়ে যায়। একটি লোক নয় অনেক লোক, অনেক লোক নয় গোটা পাড়া, একটি পাড়া নয় সমস্ত শহর যখন একজোট হয়ে কোনো সত্য অস্বীকার করে এবং সে-সত্যের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য কঠিন ব্যুহ সৃষ্টি করে তখন অবরুদ্ধ দুর্গের বাইরে সত্যটি হাওয়ার মতোই নিষ্ফলভাবে গোঙিয়ে ফেরে, প্রবেশের পথ পায় না। কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীরা সহসা আশান্বিত হয়ে ওঠে : যে-প্রতিপাদপত্র ইতিমধ্যে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে তার ফলে দু-একদিনের মধ্যেই ঘাটে আবার স্টিমার দেখা দেবে।
কিন্তু শীঘ্র প্রথমে কানাঘুষায়, তারপর সুস্পষ্টভাবে স্টিমার না আসার অন্যান্য কারণও শোনা যেতে থাকে। তবে শহরবাসীরা কি উকিল কফিলউদ্দিনের ধারণাটি অন্তরে-অন্তরে গ্রহণ করে নি? অথবা, তা কি তাদের কাছে আইনজ্ঞের যুক্তিতর্কের মতোই ঠেকেছিল যে-যুক্তিতর্কের সাহায্যে বিচক্ষণ উকিল আদালতে বিপক্ষদলকে পরাভূত করে, কিন্তু যে-সব যুক্তিতর্কের সত্যাসত্য সম্বন্ধে জনসাধারণ কোনো স্পষ্ট ধারণা করতে সক্ষম হয় না? না, তা ঠিক নয়, কুমুরডাঙ্গার জনসাধারণ উকিল কফিলউদ্দিনের ধারণাটি সত্যিই গ্রহণ করেছিল, কেবল কুমুরডাঙ্গার ঘাট থেকে যে স্টিমার অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে সে-স্টিমার ফিরিয়ে আনবার জন্যে তারা যে-প্রবল অধীরতা বোধ করে সে-অধীরতার জন্য হয়তো তা যথেষ্ট মনে হয় নি; পড়ন্ত দেয়ালকে রক্ষা করার জন্যে একাধিক ঠেস-পোস্তের প্রয়োজন হয়। অতএব স্টিমার না-আসার যে-কারণ উকিল কফিলউদ্দিনের নিকট জানতে পায় তার ওপর অন্যান্য অনেক কারণও তারা আবিষ্কার করে এবং স্টিমার যে শীঘ্র আবার কুমুরডাঙ্গার ঘাটে দেখা দেবে-এমন একটি বিশ্বাস সুনিশ্চিতকণ্ঠে প্রকাশ করতে থাকে নানাপ্রকারের জতির মধ্যে দিয়ে। কেবল কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীরা স্টিমারকে ফিরিয়ে আনার অধীরতার জন্যে এ-কথা বুঝতে পারে নি যে জনশ্রুতির বহুলতা স্টিমারকে দূরেই রাখছিল, কাছে আনছিল না। হয়তো ততদিনে যা-সত্য তা তাদেরই অজ্ঞাতসারে তারা মেনে নিয়েছিল, কেবল আশা ছাড়তে পারে নি। মানুষের আশা এক স্তরে পৌঁছাবার পর যুক্তি বা যথার্থতার ধার ধারে না।
