গাছের তলায় বসে অপরিচিত লোকটি কয়েক দিন কাটায়। এ-বাড়ি থেকে লোকেরা খাদ্যবস্তু এনে তার ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা করে, পুকুরের সামনে তার উপস্থিতি মেয়েদের গোসলের ব্যাপারে ব্যাঘাত সৃষ্টি করলেও কেউ তাকে সরে যেতে বলে নি। বয়স্ক লোকেরা দূর থেকে দেখে তাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করত, তবে ছেলেরা বেশ সকালেই তার নিকটে হাজি হয়ে তার চতুষ্পার্শ্বে ঘিরে দাঁড়াত। এত ছেলের মধ্যে কোনো কারণে মুহাম্মদ মুস্তফাকে তার পছন্দ হয়েছিল, এবং মুহাম্মদ মুস্তফা দেখা দিলে বৃক্ষতলে আসনাধীন অপরিচিত লোকটির চোখ প্রথমে উজ্জ্বল হয়ে উঠত, তারপর সে উজ্জ্বলতা ঢেকে যেত স্নেহে, পাতলা পর্দার মতোই যে-স্নেহ নেবে আসত। লোকটি একদিন লক্ষ্য করে, মুহাম্মদ মুস্তফা বা অন্যান্য ছেলেরা সর্বদা যেন একটি অদৃশ্য সীমারেখার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো তা অতিক্রম করে না। একদিন সে মুহাম্মদ মুস্তফাকে বলে, যাও, যাও ওদিকে, কোনো ভয় নেই। প্রথমে মুহাম্মদ মুস্তফার শিশু-সরল চোখে গভীর ভীতি জাগে, মন-প্রাণ পাথরের মতো জমে শক্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু শীঘ্র সহসা কোত্থেকে একটা বিচিত্র সাহস দেখা দেয় তার মধ্যে, যে-সীমারেখা সে কখনো অতিক্রম করে নি সে-সীমারেখা অনায়াসে পেরিয়ে যায়।
সেজন্যেই কি মুহাম্মদ মুস্তফা গ্রামের গণ্ডিতে বন্দী হয়ে থাকে নি, চাঁদবরণ ঘাটের সামনে বৃহৎ নদীটিও তার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে নি।
আরেকটি দিনের কথা মনে পড়ে। ভরা বর্ষার দিন। কয়েকটি সমবয়সী ছেলে স্থির করে গ্রাম থেকে কিছু দূরে সুভন্দ্রা নদীটি সাঁতার কেটে পার হবে। নদী কোথায়, খাল বলাই ভালো; এ-পাড়ে পঁড়িয়ে ও-পাড়ের স্নানরতা বধূদের হাতের চুড়ি বা সূর্যালোকে ঝিকমিক করতে-থাকা নথ দেখা সম্ভব। সাঁতার কাটতে শুরু করে কিছুটা অগ্রসর হয়েছে এমন সময়ে সহসা মুহাম্মদ মুস্তফার মনে হয়, নদীটি অতল এবং সে-অতল পানিতে না জানি কত কিম্ভুতকিমাকার হিংস্র দৈত্যদানব। ভয়টি নিতান্ত অহেতুক তা বুঝতে পারলেও সে-ভয় দমন করতে সক্ষম হয় না এবং দেখতে-না-দেখতে তার হাত-পা অবশ হয়ে পড়বার উপক্রম হয়। অপর পাড়টিও হঠাৎ যেন বহু দূরে সরে যায়, সেখানে একটু আগে যে-সব বাড়িঘর বা ঘাটে বাঁধা নৌকা দেখতে পেয়েছিল সে-সব দূরত্বে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতখানি পথ কি সে অতিক্রম করতে পারবে? তার আগেই কি পানির মধ্যে থেকে একটি বিচিত্র জন্তু তার পা কামড়ে ধরে তাকে অতলে টেনে নিয়ে যাবে না? সে বুঝতে পারে, ফিরে গেলেই হয়তো সে প্রাণে বাঁচবে, উলটো পথ না ধরে উপায় নেই। কিন্তু শেষপর্যন্ত ফিরে যেতে পারে নি। এজন্যে নয় যে অন্যছেলেরা, যাদের কেউ-কেউ ততক্ষণে বেশ এগিয়ে গিয়েছে, তারা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে; অকৃতকার্যতার জন্যে বা তার ভীত মনের পরিচয় পেয়ে কেউ হাসি-ঠাট্টা করলে সে হাসি-ঠাট্টায় কখনো সে বিব্ৰত বোধ করত না। ফিরে যায় নি এই কারণে যে, যখন সে উলটো পথ ধরবে তখন তার মনে হয় পেছনের দিকে তাকালে দেখতে পাবে নদীর যে তীর সবেমাত্র ছেড়ে এসেছে সে-তীরও নিকটে নয়, সামনের তীরের মতো সে-তীরও বহু দূরে সরে গিয়েছে। কে জানে, হয়তো কল্পনার দৈত্যদানবের ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়লেও আসলে সে ফিরে যেতে চায় নি। হয়তো একবার চলতে শুরু করলে পেছনের দিকে কখনো তাকায় নি এ-জন্যে যে পেছনে ফিরে যাওয়াই সহজ। মানুষ পেছনের পথ চেনে; পেছনের পথ কখনো দূরের নয়, কঠিনও নয়। তবু বালক বয়সে মুহাম্মদ মুস্তফার ভয়ের সীমা ছিল না। মানুষ মাত্রই ভীতি বোধ করে-যার কখনো কারণ থাকে, কখনো থাকে না। মানুষ দোজখকে ভয় করে, ভয় করে ভূতপ্রেত দস্যু-ডাকাতকে, ভয় করে রোগব্যাধি শারীরিক যন্ত্রণাকে, মৃত্যুকে, দারিদ্রকে, অপ্রশমিত ক্ষুধাকে। আবার সে ভয় করে কেন ভয় করে সে-কথা না বুঝে, এবং যে-ভয়ের কারণ নেই বা যে ভয়ের কারণ সে বুঝতে পারে না, সে-ভয়ই তাকে সর্বাপেক্ষা ভীত করে। সূর্যালোকের আলোকিত উজ্জ্বল দিনে যখন অবাধে চতুর্দিকে মানুষের দৃষ্টি যায় সেদিনও তার মনে হয় এই স্বচ্ছ প্রখর উজ্জ্বলতার অন্তরালে কোথায় যেন অস্বচ্ছতা, কেমন একটা অন্ধকার। তখন এত আলোর মধ্যেও সে অসহায় বোধ করে কারণ কোথাও আশ্রয় দেখতে পায় না। কিন্তু যেখানে আলো নেই সেখানেও কি সে নিরাপদ বোধ করে?
কারণে-অকারণে মুহাম্মদ মুস্তফার মনে ভয় দেখা দিত। এবার গ্রামের হামজা মিঞা নামক মোল্লা-মৌলভি গোছের একটি লোকের কথায় ভীষণ ভয় দেখা দিয়েছিল তার মনে। লোকটি বলত ঈমানে মুফাচ্ছাল বাল্যবয়সেই পাকা হওয়া উচিত। একদিন মুহাম্মদ মুস্তফাকে হাতে পেয়ে নিজের শীর্ণ উরুতে বাঘা থাবা মেরে ব্যাঘ্রকণ্ঠে হুঙ্কার দিয়ে প্রশ্ন করেছিল : খোদা ভিন্ন কি মাবুদ আছে, তার সমতুল্য কেউ কি আছে, তার কি কোনো শরিক বা প্রতিদ্বন্দ্বী আছে, তার কি নিদ্রা-তন্দ্রা আছে, ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে, ক্লান্তি আছে, ক্ষয় আছে? সে-সব প্রশ্নে কী ছিল, বা সে-সব প্রশ্ন বালক-মনে কী চিত্র জাগিয়ে তুলেছিল কে জানে, কিন্তু হামজা মিঞার প্রশ্নের গোলাগুলি শেষ হবার আগেই মুহাম্মদ মুস্তফা অজানা ভয়ে সমগ্র অন্তরে হিমশীতল হয়ে পড়ে, তার মনে হয় আকাশ অন্ধকার করে কেয়ামতি ঝড়-তুফান আসতে দেরি নেই, শীঘ্র কোথাও সহস্রাধিক হিংস্র ক্রুদ্ধ সিংহও কান-বধির-করা আওয়াজে গর্জন শুরু করবে। চোখ বুজে সে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল। পরে একটি নির্বোধ মেয়েমানুষের কাছে শুনতে পায়, খোদা নাকি দেখতে কলিজার মতো, এবং কলিজার মতো প্রতি মুহূর্তে থরথর করে কাঁপে। কথাটি কী কারণে তাকে আশ্বস্ত করে, এবং যদিও তার মনে হয় আকাশে ভাসমান অদৃশ্য সে-কলিজার কাঁপুনিতে গোটা পৃথিবী থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে, তার দুর্বোধ্য ভয়টি কিছু প্রশমিত হয়। আরেকবার একদিন কয়েকজন দুষ্টু ছেলে ষড়যন্ত্র করে সমবয়সী আরেকটি রোগ-গোছের ছেলেকে শক্ত কাছি দিয়ে বেঁধে গাছ থেকে মাথা নিচু করে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। ছেলেটি তখন তারস্বরে সকলকে এই বল শাসিয়েছিল যে, তাদের ওপর খোদার গজব পড়বে, বালা দেখা দেবে তাদের জীবনে। দুই ছেলেদের সঙ্গে থাকলেও মুহাম্মদ মুস্তফা রোগা ছেলেটির নির্যাতনে কোনো অংশ নেয় নি, সে দর্শকই ছিল। তবু তার কথায় সে একটি অব্যক্ত ভয়ে হিমশিম খেয়ে যায়, এবং সে-রাতেই একটি বিচিত্র ধারণা দেখা দেয় তার মনে। ধারণাটি এই যে, কালো মাটির দলার মতো নাক-চোখ-মুখ-কান-শূন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন একটি জন্তু গোঁ-গোঁ আওয়াজ করে গ্রামের জনশূন্য পথেঘাটে ছুটোছুটি করছে কিসের সন্ধানে। সে-বিচিত্র ভয়াবহ নামহীন জন্তুটি বারবার তার মনে দেখা দিয়ে বেশ কিছুদিন তাকে নিপীড়িত করে। কেবল আমাদের ছোট চাচার দ্বিতীয়া বউটির মৃত্যুর পর হয়তো সে নিদারুণ ভীতির কবল থেকে মুক্তি পায়।
