ততক্ষণে উকিল কফিলউদ্দিন স্থির করেছে ডাক্তার বোরহানউদ্দিনকে উপেক্ষা করবে, তবে মনে একটু অস্বস্তি বোধ করে। তার কেমন মনে হয়, ডাক্তারের অযথার্থ উক্তি-প্রশ্নে উপস্থিত অন্যান্য লোকদের মনে তার বক্তব্যবিষয় সম্বন্ধে অবিশ্বাস না হলেও কিছু সন্দেহের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তার মনে যে-কথাটি এসেছে তার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহের কোনোই কারণ দেখতে পায় না। সে জানে, অনেক সময় এমন দুর্বোধ্য কোনো উপায়ে মানুষ সত্য কথা জানতে পারে। মানুষ একা হলেও একা নয়; তার অন্তরে ফেরেশতা-শয়তান দুই-এরই বাস। হয়তো তারাই জানায় সে-সব কথা। তবে দুনিয়ায় মানুষেরা আবার সাক্ষীপ্রমাণ চায়। যে-মানুষ ওকালতি করে সে মানুষ কথাটি ভালো করে জানে। কখনো-কখনো উকিল কফিলউদ্দিনের মনে হয়, সত্য নয়, সাক্ষীপ্রমাণের আবরণে মানুষ মিথ্যাই কামনা করে।
তবে শীঘ্র সে অস্বস্তি ভাবটি কাটিয়ে ওঠে। সাক্ষীপ্রমাণ সময়মত পাবে; সত্যের জয় নির্ধারিত।
সার-কথা এই, সে বলে, বাকাল নদীতে চড়া পড়ে নি, অন্ততপক্ষে এমন চড়া যার জন্যে স্টিমার চলাচল বন্ধ করা প্রয়োজন। হ্যাঁ, নদীর একধারে কিছু অগভীরতা আছে, কিন্তু কোন নদীতে নেই? পদ্মা বলেন, মেঘনা বলেন যমুনা বলেন, কোনো নদী আগাগোড়া সুগভীর নয়। সব নদীতে চড়া পড়ে চর জাগে কিন্তু আবার স্টিমার-চলারও উপায় থাকে। একটু থেমে উকিল সাহেব আবার বলে, চড়ার উছিলায়ই স্টিমার বন্ধ করা হয়েছে। এ-অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা যদি প্রতিবাদ না করি, তবে স্থায়ীভাবে স্টিমার বন্ধ হয়ে যাবে। কনিষ্ঠ উকিল আরবাব খানের প্রতি সে দৃষ্টি দেয়। তুমি একটা খসড়া তৈরি করো। জোর কলমে সরকারের কাছে পত্র লিখতে হবে। এ-অন্যায় কী করে আমরা সহ্য করতে পারি?
একটু পরে উকিল সাহেবের একটা কথা স্মরণ হয়। আপনারা জানেন, কুমুরডাঙ্গার লোকেরা কোম্পানির স্টিমারের কী দশা করেছিল। দেখে নেব কার বাপের সাধ্য এ-ঘাটে স্টিমার চলাচল বন্ধ করে, সে বলে।
মুহাম্মদ মুস্তফার বাল্যজীবনের বিষয়ে ভাবতে গিয়ে তেঁতুলগাছের সামনে সে ঘটনাটির কথা মনে পড়ে যায়।
বাড়ির পশ্চাতে শ্যাওলা-আবৃত বন্ধ ডোবার মতো পুকুরের ওধারে তেঁতুলগাছটি অতিক্রম করার সাহস কোনো ছেলেরই হত না, কারণ সেখান থেকে কালুগাজির রাজত্ব শুরু হত। কালুগাজিও নাকি সে-সীমানা অতিক্রম করে এদিকে কখনো আসত না। কেন আসত না, তারও একটি আজগুবি উত্তর ছিল। তবে মনে হয় যে-কালুগাজি হাওয়ার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে বিদ্যুৎগতিতে মুক্তভাবে চলাফেরার ক্ষমতা রাখত, সে আসলে মানুষ নয় দেহকায়াহীন একটি আত্মাই ছিল, সে-ও যে অনধিকার প্রবেশ করত না, অন্যের এলাকায় পা দিত না-এর মধ্যে সকলের জন্যে একটি অপ্রত্যক্ষ উপদেশ নিহিত থেকে থাকবে। আমাদের গ্রামে কেউ কারো জোতজমির সীমানা-সরহদ্দ মানত না। এ নিয়ে মামলা-মকদ্দমা না হলেও অহর্নিশি ঝগড়া-ফ্যাসাদ দাঙ্গা-হাঙ্গামা হত, কালেভদ্রে এক আধটা খুন-জখমও ঘটে যেত।
কালুগাজিকে কেউ কখনো দেখতে পেত না বলে তার চেহারাটি কী রকম সে বিষয়ে কেউ একমত ছিল না। কেউ বলত সে দশ হাত লম্বা, মুখে তার ঝুরিমূলের মতো দাড়ি, চোখে টাটকা খুন। কেউ আবার বলত, সে অনেকটা সাধারণ ফকির দরবেশের মতোই দেখতে, তবে এমন ফকির-দরবেশ যে কোনো কারণে সর্ব শান্তি থেকে বঞ্চিত। শান্তি পাওয়ার জন্যে সে কোনো বিচিত্র এবাদতে সর্বক্ষণ আত্মমগ্ন হয়ে থাকত, এবং মানুষের সামনে দেখা দিতে যেমন পছন্দ করত না তেমনি চাইত না মানুষ তার এবাদতে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। মানুষ নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় বা প্রবৃত্তি তার ছিল না।
কালুগাজির রাজস্ব কতদূর বিস্তৃত বা কত বড় এ-সব বিষয়ে কেউ কখনো নিশ্চিত ছিল না বটে, তবে কারো সন্দেহ ছিল না তা পুকুরের ওধারে যে-তেঁতুলগাছের পাশে সে-রাজত্ব শেষ হত সে-তেঁতুলগাছের তলাই সে বসতে ভালোবাসত। মেয়েরা বলত, জায়গাটির ওপর তার মায়া পড়ে গিয়েছে। অতএব একদিন শরঙ্কালের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল বেলায় তেঁতুলগাছের দিকে গ্রামের একটি লোকের দৃষ্টি পড়তেই তার অন্তরাত্মা থরথর কেঁপে ওঠে, কারণ সে দেখতে পায় কে যেন সে-গাছের তলে স্থির নিশ্চল হয়ে বসে। কালুগাজি কি কোনো কারণে সশরীরে দেখা দিয়েছে, অদৃশ্য জগৎ থেকে আর্বিভূত হয়েছে দৃশ্যমান জগতে? অপলক দৃষ্টিতে লোকটি গাছের তলে মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ধীরে-ধীরে একটি আকৃতি, একটি চেহারা। স্পষ্ট হয়ে ওঠে : ছোটখাটো মধ্যবয়সী মানুষ, মুখে কিছু দাড়ি, এত শীতেও দেহের উপরাংশ নগ্ন। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর লোকটি স্থির করে, অপরিচিত লোকটি কালুগাজি নয়। ফকির-দরবেশের মতো মনে হলেও সে নিতান্ত মাটির মানুষ, কেবল চোখে-মুখে ক্ষুধার্ত মানুষের শ্রান্ত তীক্ষ্মতা। কালুগাজি যখন খোশমেজাজে থাকে তখনো তার কপাল থেকে লাঙ্গল-দেয়া জমির মতো গভীর কুটির রেখাগুলি নাকি কখনো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না, তার চোখের আগুন কখনো স্তিমিত হয় না। কালুগাজি অতিশয় অস্থির প্রকৃতির লোকও গাছের তলায় এবাদতে বসে স্থির হয়ে থাকলেও তার মধ্যে আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরের উষ্ণ-তরলতা অস্থিরতা নাকি কখনো শান্ত হয় না। লোকটির মধ্যে কালুগাজির সে-সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কোনো চিহ্ন ছিল না।
