একটু পরে সে নির্বোধের মতো আবার বলে ওঠে, চড়ার কথাটি কেন সত্য হবে?
তখনো উকিল সাহেবের বক্তৃতা শেষ হয় নি। বক্তৃতায় বাধা পড়লে হঠাৎ সে স্তব্ধ হয়ে পড়ে, একটু পরে ঝলক দিয়ে মুখে যেন রক্ত চড়ে, তারপর কয়েক মুহূর্ত স্থিরনেত্রে ডাক্তারের দিকে চেয়ে তার মুখাবয়বের সবকিছু যেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লক্ষ্য করে দেখে। ডাক্তারের আধা-পাকা চুলে কদাচিৎ হাজ্জামের হাতের বা চিরুনির স্পর্শ পড়ে বলে সারাদিন এলোমেলো হয়ে থাকে। কানের ওপর, তারপর পশ্চাতে ঘাড় ঢেকে সদাময়লা কুঞ্চিত কলারের ওপর সে-চুল ঝুলে থাকে। তার গোঁফও দীর্ঘ। সে-গোঁফ ওপরের ঠোঁট অতিক্রম করে নিচের স্কুল, চিড়খাওয়া ঠোঁট পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়, যার সূচাগ্র প্রান্ত এড়াবার জন্যই যেন সে সামনের মস্ত দাঁতের পাটি উন্মুক্ত করে মুখটা খুলে রাখে। কখনো-কখনো অন্যমনস্কভাবে দাঁত দিয়ে গোঁফের প্রান্ত কাটে, কখনো সহসা জিহ্বা বের করে তা ভিজিয়ে নমনীয় করে তোলে, কিন্তু কখনো ঘটে না। মধ্যে-মধ্যে তাতে খাদ্যকণা দেখতে পাওয়া যায় এবং সর্দি লাগলে এখানে-সেখানে জটও বেঁধে যায়। একবার বহুদিন ধরে গোঁফের প্রান্ত অর্ধচন্দ্রের মতো বাঁকা হয়েছিল, দেখে মনে হত যেন লম্বা-লম্বা ঘাসে আবৃত চরের মাথায় চাঁদ উঠেছে।
উকিল কফিলউদ্দিন অবশেষে ঘরের অস্পষ্ট আলোতেও দেখতে পায় ডাক্তার বোরহানউদ্দিনের গোঁফের প্রান্তে ডালের মতো কিছু একটা লেগে রয়েছে। কয়েক মুহূর্ত ডাক্তারের দিকে চেয়ে থেকে তারই সন্ধান করেছিল যেন। এবার তা দেখতে পেলে ঘৃণার মধ্যে দিয়ে ডাক্তারের নির্বুদ্ধিতার জন্যে তার প্রতি একটি পরম অবজ্ঞার ভাব দেখা দেয় উকিল কফিলউদ্দিনের মনে।
ঈষৎ তিক্ত-কঠিন স্বরে সে বলে, চড়ার কথাটি যে নিছক ধোকা তা যেন কোনো কারণে ডাক্তার বিশ্বাস করতে পারছেন না।
কোনো বিষয়ে অনেক চিন্তা করে একবার নিশ্চিত হবার পর কেউ সে-বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলে উকিল কফিলউদ্দিনের সহ্য হয় না, তাই তিক্ত উক্তিটি করেও সে মনে শান্তি পায় না। বক্তৃতা শুরু করতে গিয়ে চুপ করে যায়, যেন কথার খেই হারিয়ে ফেলেছে। তারপর সহসা তার চোখে কী যেন দপ্ করে জ্বলে ওঠে।
এমনভাবে তার চোখ জ্বলে ওঠাও কাছারি-আদালতে সুপরিচিত, তার অর্থও সবাই জানে। এমনটা ঘটলে সবাই বুঝতে পারে উকিল কফিলউদ্দিন সহসা একটি মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করেছে। কায়ক্লেশে আইনের বইপত্র ঘেঁটে সযত্নে-সাজানো যুক্তিতর্কের সাহায্যে নয়, বিদ্যুৎঝলকের ক্ষিপ্রতায় উপলব্ধ তথ্যের সাহায্যেই সে মামলা-মকদ্দমা জিতে থাকে, পাপিষ্ঠ আসামিরও খালাসের ব্যবস্থা করে থাকে। এখন সে বুঝতে পারে ডাক্তার বোরহানউদ্দিনের নির্বুদ্ধিতার কারণ। ডাক্তার কি সত্যই এমন নির্বোধ হাবাগোবা মানুষ? প্রথমবার সে যখন প্রশ্ন করেছিল তখনই মনে একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। তবে তখন মনে হয়েছিল স্টিমার-চলাচল বন্ধ হবার মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত ক্ষতি দেখতে পাচ্ছে না বলেই চড়ার কথাটা বিশ্বাস করতে ডাক্তারের আপত্তি নেই, সে ভাবছে, যারা চিকিৎসার জন্যে নৌকায় করে কুমুরডাঙ্গায় আসে তারা পূর্ববৎ তেমনিই আসবে। এখন উকিল কফিলউদ্দিন বুঝতে পারে ব্যাপারটি আরো গভীর, এলোমলো চুল বেশভূষার বিষয়ে উদাসীন ডাক্তারটি অতিশয় গভীর পানির মানুষ-স্টিমার-চলাচল বন্ধ হবার মধ্যে সে আর্থিক লাভের সম্ভাবনাই সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে। যারা স্টিমারে চড়ে চিকিৎসার জন্যে অন্য কোথাও যেত তাদের অনেকেই কি এবার তার শরণাপন্ন হবে না?
ডাক্তার বোরহানউদ্দিনের বিচিত্র আচরণের রহস্য ভেদ করতে পেরে নিজের চতুরতার নিদর্শন দেখে উকিল সাহেব মনে-মনে তৃপ্তি বোধ করে। উকিল কফিলউদ্দিনের বিশ্বাস, তার কাছে মনের কথা গোপন করতে পারে-এমন মানুষের এখনো জন্ম হয় নি। সে জানে, মানুষের দুই মুখ-একটি বাইরের, অন্যটি ভেতরের। বাইরেরটি সমাজ-ধর্মের নির্দেশ মাফিক সাজানো-বানানো, ভেতরটি নির্ভেজাল স্বার্থে তৈরি, সর্ব মহৎ উদ্দেশ্যবিবর্জিত। প্রথমটি নকল, দ্বিতীয়টি খাঁটি একটি সুন্দর, অন্যটি কদাকার। অনেকের যেমন তাসবাজি বা মেয়েমানুষ নিয়ে মারাত্মক নেশা, তেমনি কফিলউদ্দিনের ঘোর নেশা মানুষের সে-খাঁটি কদাকার ভেতরের দিকটা উদঘাটন করা। তার এখন সন্দেহ থাকে না, সযত্নে লুকানো ডাক্তারের মনের কথাটি উদঘাটন করতে সে সক্ষম হয়েছে।
ডাক্তার রোগীর খওয়াব দেখছেন, সে বলে, আস্তে, এত আস্তে যে, উক্তিটি নয়, ঘূর্ণবিদ্বেষই কেবল শোনা যায়।
বোরহানউদ্দিন এই কথাটিও ঠিক বুঝতে পারে না, কিন্তু তার যে রোগীর প্রয়োজন নেই-সে-কথা সরলচিত্তে বলতে গিয়েও থেমে যায়। সে-কথা কি সবাই জানে না? স্বাধীনতার পর হিন্দু ডাক্তাররা একে-একে দেশছাড়া হয়ে যায়। তখন থেকে সে এত রোগী দেখছে যে রোগীতে তার আর সাধ নেই। সে অনেক বছর হল। সে-অবধি সুস্থ মানুষের চেহারা আর দেখে নি যেন। অবশেষে সে কিছুই বলে না, সে যে রোগী কামনা করে না, রোগীতে সব সাধ মিটেছে-এ-সব সত্য কথাও বলে না। তাছাড়া সে জানে, ঝানু উকিলের সঙ্গে তর্ক করার ক্ষমতা তার নেই; রোগী-হাসপাতাল ওষুধপত্র-চিকিৎসা ইত্যাদির বাইরে যে-জীবন সে-জীবনে আটঘাট বেঁধে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রহাতিয়ার তার সত্যিই নেই। সেজন্যেও সে ভালো মানুষ; সে নিরস্ত্র।
