বিয়ের পর থেকে আজ তিন বছর যাবৎ তার মেয়ে হোসনা স্বামীর সঙ্গে সদর শহরে বাস করে এবং এ-উছিলা সে-উছিলায় প্রায়ই উকিল কফিলউদ্দিন সেখানে হাজির হয় মেয়েটিকে দেখতে। ক-দিন ধরে কেমন খেয়াল, মেয়েটির বুঝি শরীরটা ভালো নয়। তেমন খেয়ালের কারণ নেই, তবু যে-কথা আপনা থেকেই মনে জাগে সে কথা সচরাচর সে হেলা করে না।
কী বলেন উকিল সাহেব? একজন অল্পবয়স্ক সহযোগী জিজ্ঞাসা করে।
ভাবছি। গলা কেশে, রহস্যময়ভাবে সে উত্তর দেয়!
দু-দিন পরে সন্ধ্যার পর উকিল কফিলউদ্দিন তার বাড়ির বৈঠকখানায় বসে ছিল, সামনে দু-চারজন মক্কেল।
উকিল কফিলউদ্দিনের নদীমুখো দোতলা বাড়িটি শহরের অন্যান্য বাড়ির তুলনায় মস্ত বড় মনে হয়, বাড়িটি নিয়ে উকিলের গর্বও কম নয়। বাড়িটি হালের নয়। সেটি যখন তৈরি হয় তখন দোতলা বাড়ি তো দূরের কথা, গুটি কয়েক সরকারি দালান-কোঠা ছাড়া সারা শহরে আর কোনো বে-সরকারি পাকা বাড়ি ছিল না। একদা শহরের একজন নামকরা হিন্দু উকিল বাড়িটি তৈরি করেছিল, বহুদিন তাতে বসবাসও করেছিল। বৃদ্ধ বয়সে সে-উকিলের মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী কলকাতায় চলে গেলে একটি দরিদ্র আত্মীয় পরিবার অনেকটা পাহারাদার হিসেবেই বাড়িটিতে বসবাস করে। তখন সে-বাড়িতে রাতের বেলায় আলো দেখা যেত না, দিনে বা রাতে সেখান থেকে কোনো সাড়াও আসত না। এ-সময়ে অনাদরে প্রেতপুরীসম বাড়িটির বাইরের আস্তর খসে পড়তে শুরু করে; যারা রাতে প্রদীপ জ্বালায় না তারা দেয়ালে কলি ফেরাবে কেন? তবে এ-সময়েই কফিলউদ্দিনের দৃষ্টি পড়ে বাড়িটির ওপর। তখন সে নবীন উকিল, মুখে দাড়ি নেই কিন্তু মস্ত বড় ঝুলে-পড়া কাস্তের মতো বাঁকা, গোঁফ, পরে কয়েক বছরের জন্যে যার বিপরীতটাই ঘটে; তার গোঁফ অদৃশ্য হয়ে যায় কিন্তু মস্ত একটি দাড়ি দেখা দেয় বুক জুড়ে। বর্তমানে তার মুখ দাড়িগোঁফ শূন্য। যুবক উকিলের চোখে বাড়িটি প্রাসাদের মতো ঠেকে। তাছাড়া তার মনে হয় বাড়িটির ক্ষুদ্র জানালাগুলি কী গভীর রহস্যের ইঙ্গিত দেয়, স্বল্পপরিসর বারান্দাটির সামনে গোলাকার স্কুল, উতুঙ্গ খামগুলিতে যেন আভিজাত্যের পরিচয়, আস্তর খসে পড়লেও দেয়ালের অনাবৃত অংশে অবিনশ্বরতার প্রমাণ। সে-পথে আসতে-যেতে প্রথমে সে কেবল বাড়িটি তাকিয়ে দেখ, ইতিমধ্যে মনের কোথাও অস্কুট কোনো আকাক্ষা দেখা দিয়ে থাকলে তা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে সাহস পেত না। তারপর একদিন দুস্থ বা কৃপণ পরিবারটির অভিভাবক স্থানীয় একমাত্র পুরুষটির মৃত্যুর পর অপেক্ষাকৃত সচ্ছল অন্য একটি পরিবার সে-বাড়িতে স্থান পায়। এ-সময়ে সন্ধ্যার পর আলো দেখা যেতে শুরু করে, কখনো-কখনো তার অভ্যন্তর থেকে বীণা-জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের ঝঙ্কারও শোনা যেতে থাকে। ততদিনে উকিল কফিলউদ্দিনের মনের অস্ফুট আকাভক্ষাটি স্পষ্টরূপ ধারণ করেছে, পসারও বেশ হতে শুরু করেছে। শীঘ্র তার মনে হয়, বাড়িটির অভ্যন্তর থেকে সন্ধ্যার পর যে-বাদ্যযন্ত্রের ঝঙ্কার ভেসে আসে তা যেন তাকে উপহাস করে : সুস্পষ্ট আকাক্ষাই কি স্বপ্ন চরিতার্থ করার জন্যে যথেষ্ট? সে-উপহাস বেশিদিন সে সহ্য করে নি, একদিন হেমন্তের অপরাহ্নে বাড়িটির স্বতাধিকার ক্রয় করে যে-ছায়াচ্ছন্ন রহস্য বহুদিন ধরে তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে সে-রহস্য ভেদ করে, বাদ্যযন্ত্রটিকেও নীরব করে। বাড়ির সঙ্গে আসবাবপত্রও কিনেছিল-সেকেলে আমলের দুর্জয় গোছের মজবুত কিন্তু অতিশয় ভারি আসবাবপত্র; সে যেন জিদ ধরেছিল সে-বাড়ি থেকে কিছুই হস্তান্তর : হতে দেবে না। সব কিছু মিলে বেশ দাম পড়েছিল, কিন্তু সে দ্বিরুক্তি করে নি। হয়তো তার মনে হয়েছিল, বাড়িটি কিনে, তারপর যে-সব আসবাবপত্র সুনামধারী উকিল একদিন ব্যবহার করেছিল সে-আসবাবপত্রের মালিক হয়ে সে-উকিলের যশ-ভাগ্যেরই অংশীদার হচ্ছে। লোকেরা বলে, উকিল কফিলউদ্দিন যখন জটিল কোনো মামলা নিয়ে কিছু মুশকিলে পড়ে, জয়ের পথ খুঁজে পায় না, তখন বাড়িটির প্রাক্তন মালিক যে বহুদিন হল ইহজগৎ ত্যাগ করে গেছে, সে তার স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাকে মন্ত্রণা দেয়, ধারা-উপধারা নজিরি আইন বাতলে দেয়। বাড়ি-আসবাবপত্রের জন্যে সে বেহুদা বেশি দাম দেয় নি।
সে-বাড়ির বৈঠকখানায় নথিপত্রে-ঢাকা টেবিলের ওপর স্থাপিত লণ্ঠনের পশ্চাতে বষে উকিল কফিলউদ্দিন কোনো মামলার জট খোলার চেষ্টায় রত ছিল, মুখে আত্মমগ্ন ভাব, মন স্টিমারঘাট নদনদী থেকে বহুদূরে। ভেতর থেকে হুঁকা আসে-মক্কেলদের জন্যে সাধারণ হুঁকা, তার জন্যে নলওয়ালা সুদৃশ্য গুড়গুড়ি। কিছুক্ষণের জন্যে ঘরটি হুঁকা-গুড়গুড়ির শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে, ক্রমশ ধূমায়িতও হয়ে পড়ে, তার পশ্চাতে মানুষের মুখগুলি অস্পষ্ট দেখায়। পরে পান আসে; বড় পেতলের থালায় করে সাধারণ পান, রূপার পিরিচে সেজে সাচি পান। তারপর কখন উকিল কফিলউদ্দিন কথা বলতে শুরু করে। তবে জ্বর কণ্ঠে যেন ঘুমের আমেজ; সে-কণ্ঠ অবিরাম গুঞ্জনের মতো শোনায়। তারপর এক সময়ে সহসা সে এমনভাবে কেশে ওঠে যেন কাশিটি পূর্বাভাস না দিয়ে অকস্মাৎ তাকে অতিভূত করে ফেলেছে, এবং মুখে যা উঠে আসে তা নিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে হঠাৎ পাশে ঝুঁকে টেবিলের পশ্চাতে অদৃশ্য একটি পিদানিতে সশব্দে থুথু ফেলে। নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য সে-পিানি থেকে এবার সচকিত একটি মাছি উঠে এসে অন্ধের মতো নিঃশব্দে ঘুরপাক দিয়ে পশ্চাতের দেয়ালে টাঙ্গানো ফ্রেমে বাঁধা সোনালি অক্ষরে লিখিত আল্লাহর নামের এক প্রান্তে আশ্রয় গ্রহণ করে; হয়তো . রূঢ়ভাবে ঘুমে ব্যাঘাত-পাওয়া ক্ষুদ্র জীবটির কাছে সমগ্র বৈঠকখানার মধ্যে সে-স্থানটিই। সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়। এবার ঘরে যে-আকস্মিক নীরবতা নাবে সে-নীরবতার মধ্যে সই দেখতে পায়, উকিল চোখ নিমীলিত করেছে।
