উকিল কফিলউদ্দিনের চরিত্র অনেক দিন থেকে পরস্পরবিরোধী, যেন বার্ধক্যে উপনীত হয়েও তার আসল চরিত্রটি যে কী, বা কোন চরিত্র তার জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত এবং মানানসই-সে বিষয়ে এখনো মত স্থির করতে পারে নি। কখনো মনে হয় তার মধ্যে হীনতা-নীচতা কল্পনাতীত, এবং সে এমন মানুষ যাকে গভীরভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধা না করে উপায় নেই কারণ তার দেহের প্রতি অন্ধ্ররন্ধ্র দিয়ে দয়ামায়া ক্ষমাশীলতাই নিঃসৃত হয়। আবার আকস্মাৎ সে-মানুষের মধ্যেই কুটিলতা-হিংস্রতা উৎকটভাবে আত্মপ্রকাশ। করে। হয়তো তখন তার সহসা মনে পড়ে মক্কেলরা উকিলের নিকট দয়ামায়া ক্ষমাশীলতা আশা করে না। তবু মক্কেলদের আশানুযায়ী আচরণের প্রয়োজন বুঝলেও আবার অন্তরে কোও মানুষের ভক্তিশ্রদ্ধার জন্যে একটি তীব্র বাসনাও বোধ করে থাকবে। হয়তো তার চরিত্রের মধ্যে পরস্পরবিরোধী ভাবের কারণ ও-দুটির মধ্যে দ্বন্দ্ব। তবে তার চরিত্র যে-রূপই ধারণ করুক না কেন, তার অন্তরে রাতের হাওয়ার মতো গুপ্তভাবে যে-চিন্তা-ধারা প্রবাহিত হয় তার আভাস কদাচিৎ বাইরে ধরা পড়ে, যদি-বা তার গোঙ্গানি শোনা যায় তার চেহারা দেখা যায় না, তার গতিবিধিও বোঝা যায় না। রক্তাক্ত চোখে বিষম ক্রোধ প্রকাশ করলেও সেটি সত্যিকার ক্রোধ না-ও হতে পারে, আবার যখন সে অমায়িকতায় নরম কোমল হয়ে ওঠে সে-সময়ে তার অন্তরে ক্রোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলা সম্ভব। হয়তো সবটাই অভিনয়, পরের সুখ-দুঃখ আপনার করে নিয়ে সে-সুখ-দুঃখের কাহিনী আবার ব্যক্ত করে বলে প্রত্যেক উকিলই এক রকমের অভিনেতা।
তবে কফিলউদ্দিন যখন হঠাৎ নীরব হয়ে পড়ে চোখ নিমীলিত করে তখন তা অভিনয় বলে মনে হয় না, বরঞ্চ মনে হয় সহসা বাহ্যিক জগৎ সম্বন্ধে বিস্মৃত হয়ে সে তার অন্তরের গুপ্ত হাওয়ার আওয়াজ শুনছে। জনবাদ এই যে, সে যখন চোখ নিমীলিত করে এমনিভাবে স্তব্ধ-নীরব হয়ে পড়ে তখন বিপক্ষ দলের উকিল তো বটেই জজ হাকিমও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এই কারণে যে তার অন্তরের অদৃশ্য হাওয়া তাকে কী পরামর্শ দেবে সে-বিষয়ে আগেভাগে নিশ্চিত হওয়া শক্ত।
অনেকক্ষণ উকিল কফিলউদ্দিন নিমীলিত চোখে নির্বাক হয়ে থাকে। তারপর সে অবস্থাতেই কী একটি দুর্বোধ্য প্রয়োজনে বা তাড়নায় ধীরে-ধীরে পা দুটি চেয়ারের ওপর তুলে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে বসে। এমনিভাবে চেয়ারে পা তুলে বসা তার অভ্যাস; প্রথমে পা ঝুলিয়ে বসেও তারই অজান্তে এক সময়ে সে তার পা দুটি তুলে নেয় চেয়ারের ওপর।
এবার টেবিলের পশ্চাতে লম্বা-চওড়া মানুষটিকে বিশালকায় দেখায়, এবং পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে বসার দরুন.দেহটা সামনের দিকে কিছু ঝুঁকে থাকে বলে তার সমগ্র ভঙ্গিতে একটি নিবিড় একাগ্রতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে; নিমীলিত চোখে সে যেন গভীর মনযোগ-সহকারে কিছু পরীক্ষা করে দেখে।
তারপর সহসা সে চোখ উন্মীলিত করে। সে-উন্মীলিত চোখে আকস্মিক ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ।
কোথায় চড়া পড়েছে, কেই-বা বলেছে চড়া পড়েছে? সে জিজ্ঞাসা করে।
চৌধুরীদের ছেলেকে দিয়ে লেখানো চিঠিতে যে-কথা তারা জানিয়েছিল বড় চাচী সে-কথারই পুনরাবৃত্তি করলে মুহাম্মদ মুস্তফা প্রথমে বিস্মিত হয়, তারপর বুঝতে পারে। যতই অর্থহীন হোক না কেন তা কানে না তুলে উপায় নেই। তবে সে কিছু বলে নি। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে নি। সে জানে, বাড়ির লোকেরা মধ্যে-মধ্যে এমন সব কথা বলে থাকে যা বুদ্ধি-যুক্তির দ্বারা সমর্থন করা যায় না, তবু প্রতিবাদে কিছু বলাও যায় না; বস্তুত যতই উদ্ভট রূপ ধারণ করে তাদের বক্তব্য ততই কিছু বলা দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। এ-জন্যেই বলা যায় না যে তখন মনে হয় তারা যা বলে তার পশ্চাতে অন্য কী-একটা অর্থ আছে, অন্যকিছু বলা তাদের উদ্দেশ্য, হয়তো সত্য কথা বলার সাহস নেই বলে হেঁয়ালি বা রূপক বাক্যের শরণাপন্ন হয়েছে। কখনো-কখনো মনে হয়, প্রতিবাদ করে লাভ কী, অন্য কেউ কি যথার্থ উত্তর জানে? ভাগ্যবির্যয়ের কারণ তল্লাশের প্রয়াসে তারা যতই গভীর পানিতে তলিয়ে যায় ততই তাদের দৃষ্টি পথে অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে ওঠে, কিন্তু যারা ওপরে ভেসে থাকে তারাই-বা কি তাদের চেয়ে বেশি দেখতে পায়? কখনো তারা দুটি সম্বন্ধশূন্য ঘটনার মধ্যে সম্বন্ধ খুঁজে পায়, ভাবে প্রথম ঘটনাটি না-ঘটলে দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটত না, কিন্তু দুটির মধ্যে কোনো সম্বন্ধ নেই বললেই কি দ্বিতীয় ঘটনাটি কেন ঘটেছিল তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে?
৩. খোদেজার মৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল
খোদেজার মৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল কে জানে; হয়তো সে ঘাট থেকে বেকায়দায় পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল আর উঠতে পারে নি, হয়তো পানিতে নাবার পর কোনো রহস্যময় কারণে সহসা তার জীবন-প্রদ্বীপ নিভে গিয়েছিল। তবে মুহাম্মদ মুস্তফার চিঠি আসার কিছুক্ষণ পরেই তার মৃত্যু ঘটেছিল বলে তাদের মনে এই ধারণা জন্মেছে সে চিঠিই মেয়েটির মৃত্যুর কারণ। মুহাম্মদ মুস্তফা লিখেছিল, তসলিম নামক একজন অন্তরঙ্গ সুহৃদ বন্ধুর ঘটকালিতে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী আশরাফ হোসেন চৌধুরী সাহেবের তৃতীয়া কন্যার সঙ্গে তার বিবাহ ঠিক হয়েছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে আশরাফ হোসেন চৌধুরী সাহেব হজে রওনা হবেন। তার ঐকান্তিক বাসনা প্রস্থানপূর্বে জাগতিক-পারিবারিক সমস্ত দেনা-পাওনা, দায়-দায়িত্ব চুকিয়ে নেবেন। এই কারণে আগামী জুমাবারেই বিবাহের দিন নির্ধারিত হয়েছে। চিঠিটা এসে পৌঁছায় দুপুরের দিকে। অল্প সময়ের মধ্যে চৌধুরীদের ছেলেটিকে ধরে আনা হয়; সে-দিনও আমি বাড়ি ছিলাম না। তারপর উঠানে দাঁড়িয়ে ছেলেটি সকলের অনুরোধে একবার নয় দু-বার নয় তিন-তিন বার ইস্কুলের পাঠপড়ার ভঙ্গিতে উচ্চস্বরে চিঠিটা পড়ে শোনায়। যাতে সকলেই তার বিষয়বস্তু নির্ভুলভাবে শুনবার এবং উপলব্ধি করার সুযোগ পায়। চিঠির বিষয়বস্তু খোদেজাও শুনেছিল; উত্তর-ঘরের গা-ঘেঁষে-ওঠা বড়ই গাছের তলে সে দাঁড়িয়ে ছিল। চিঠি পড়া শেষ হলে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ির পশ্চাতে শ্যাওলা-আবৃত পুকুর অভিমুখে সে রওনা হয়। সে-পুকুর থেকে জীবিত অবস্থায় মেয়েটি ফিরে আসে নি। কিন্তু চিঠির সঙ্গে মেয়েটির মৃত্যুর কোনো সম্বন্ধ থাকবে কেন? নিঃসন্দেহে ধারণাটি নিতান্ত ভিত্তিহীন। তবে এমন একটা ধারণা যে নিতান্ত ভিত্তিহীন তা বললেও মেয়েটির আকস্মিক মৃত্যুর কারণটি পরিষ্কার হয়ে উঠবে না। বরঞ্চ সে চিঠিই মৃত্যুর কারণ-তেমন একটি কথা বিশ্বাস করতে পারলে বাড়ির লোকেরা হয়তো দুর্বোধ্য অন্ধকারাচ্ছন্ন দুনিয়ায় সামান্য আলো দেখতে পাবে, একটু সান্ত্বনা পাবে, ভয় বা অসহায়ভাব কিছু লাঘব হবে।
