পথ শেষ হয়ে এসেছে। আসফ তরফদারের কলাবাগানের পাশে অল্পক্ষণ হাঁটার পর হিজলগাছের দক্ষিণ দিকে সহসা বাড়িটা জেগে ওঠে।
মুরুব্বিদের সালাম কদমবুচি জানিয়ে সেদিন সে অন্যবারের মতো স্বাভাবিক শুষ্ক নিম্নকণ্ঠে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে নি, তবে অভ্যাসমত ঘর্মাক্ত শার্ট-গেঞ্জি এবং ধুলাচ্ছন্ন কর্দমাক্ত জুতো খুলে উঠানে হাত-পা ধুয়ে শীতল হয়। তারপর অন্যবারের মতো ডাবের পানি আসে। কেবল খোদেজা নয়, তার মা-ই আনে। সন্ধ্যা কাটলে অন্যবারের মতো তার আগমন উপলক্ষ্যে জ্বালানো বড় হ্যারিকেনের লণ্ঠনের আলোয় খেতে বসলে কেবল-দুই জোড়া চোখই তার খাওয়া পরিদর্শন করে-মা এবং চাচীর, পেছনে স্বল্প আলোকিত স্থানটি খোদেজার অভাবে শূন্য থাকে। খাওয়া শেষ হলে যে-উঠানের প্রান্তে তখন গাছগাছালি ঝোপঝাড়ের অন্ধকারে জোনাকিরা জ্যোতিষ্মন হয়ে বা অর্ধঘুমন্ত পাখিরা মধ্যে-মধ্যে অকস্মাৎ ডানা ঝাপটিয়ে প্রাণসঞ্চারের বৃথা চেষ্টা করেছিল সে উঠানে নেবে সজোরে গলা সাফ করে একাই হাতমুখ ধোয়, খোদেজা সে-রাতে বদনা থেকে পানি ঢেলে তাকে সাহায্য করে না। বাড়িতে ফেরা অবধি একবারও সে খোদেজার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করে নি, এবারও করে না; ঘরে বা আঙ্গিনায় কোথাও যে মেয়েটির দেহ আর ছায়া ফেলে না, সে যে আর নেই, বাড়ি পৌঁছার পর যে-মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া-দরুদ পড়ে তার রুহের জন্যে শান্তি কামনা করেছে সে মাটির তলে সে যে চিরনিদ্রায় শায়িতা-এসব কথা পত্রযোগে তার মৃত্যুর সংবাদটি যখন জানতে পায় তখনই মেনে নিয়েছিল। পরদিন সকালে বাড়ির পাতে শ্যাওলা-ঢাকা লতাপাতা-উদ্ভিদে সমাকীর্ণ ডোবার মতো পুকুরের পাড়ে যখন হাতমুখ দেবার জন্যে উপস্থিত হয় তখন সেখানে সে কিছু সন্ধান করে না; সেখানে যা ঘটে গিয়েছে তার কোনো চিহ্ন থাকার কথা নয় : একটি জীবন যেভাবেই শেষ হোক না কেন সে-জীবন, শেষ হয়ে গিয়েছে। তারপর পুকুরের পিছল ঘাটে হাতমুখ ধুয়ে ঘরে ফিরে নাস্তাপানি করে রীতিমাফিক উত্তর-ঘরে কথালাপের জন্যে উপস্থিত হয়। আমার মা, অর্থাৎ তার বড় চাচী পান সাজিয়ে তার সামনে ধরে, তারপর মুখে পান পুরে তা রসালো করে নেবার জন্যে তাকে একটু সময় দিয়ে সহসা কথাটি বলে-যে-কথা চৌধুরীদের ছেলে দু বার লিখে দুবার কেটে তৃতীয় বার বানানে গোলযোগ করে বড়-বড় সুস্পষ্ট অক্ষরে লিখেছিল। আমার মায়ের মুখটা সুচালো; তাই সে যখন কথা বলে তখন অনেক সময় মনে হয় সে বুঝি মস্করা করছে। তবে তার চোখের দিকে তাকালেই নিমিষে ভ্রম ভাঙে। সমস্ত জীবনের ব্যথা-বেদনা সে-চোখে যেন কেন্দ্রীভূত।
আমার মা বলে, মুহাম্মদ মুস্তফার জন্যে খোদেজা পুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করেছে।
তবারক ভুইঞা (সে কি সত্যিই তবারক ভুইঞা? আমার ভুল হয় নি তো?) বলছিল : সুসংবাদের চেয়ে দুঃসংবাদে, সুখের চেয়ে দুঃখেই কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের বেশি বিশ্বাস। বস্তুত সর্বপ্রকার মছিবতের জন্যে তারা সদা-তৈরি, এবং একবার কোনো মছিবত এলে তার অস্তিত্ব বা ন্যায্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে না। তারা এ-ও জানে যে বিভিন্ন উপায়ে কখনো ধ্বংসাত্মক ঝড়-তুফানের মতো সগর্জনে, কখনো ফসল পোড়ানো অনাবৃষ্টির মতো নিঃশব্দে, কখনো মহামারীর মতো অদৃশ্যভাবে, কখনো প্লাবনের মতো প্রকাশ্যভাবে, কখনো তৈলাক্তদেহ রাতচোরের বেশে, কখনো শস্ত্রসজ্জিত নিষ্ঠুর ডাকাতের মূর্তিতে। অতএব নদীতে চড়া পড়েছে এবং সে-জন্যে স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়েছে-এ-সব ঘটনার মধ্যে সুপরিচিত মছিবতের চেহারাই দেখতে পায় তারা, তাদের অসহায়তা সম্বন্ধেও তাদের মনে কোনো সন্দেহ থাকে না। অবশ্য ঘটনাটি বড়ই দুঃখের, যারা স্টিমারে কখনো চড়ে নি তারাও স্টিমারঘাটের আকস্মিক নীরবতায় দুঃখবোধ করে; স্টিমারে চড়ে কোনোদিন কোথাও যাবার সৌভাগ্য না হলেও তারা আজীবন প্রতিদিন তার বংশীধ্বনি শুনেছে, ঘাটে উপস্থিত না থাকলেও জানতে পেরেছে কখন স্টিমার এসেছে, কখন যাত্রী নাবিয়ে যাত্রী তুলে আবার আপন-পথে চলে গিয়েছে: দিনের পর দিন বছরের পর বছর, বস্তুত যতদূর স্মৃতি যায় ক্ষতি পৌঁছায় ততদিন এমনি চলেছে, কখনো অন্যথা হয় নি। এবং যাদের জন্যে স্টিমারটি অপরিহার্য বস্তু, ব্যবসা-বাণিজ্য মামলা-মকদ্দমা এবং শতপ্রকারের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রয়োজনে তা ব্যবহার করে থাকে, তাদের কাছে ঘটনাটি নিতান্ত শোচনীয় বলে মনে হয়। তবু নদীতে চড়া পড়লে কী আর করা যায়, কপাল মন্দ হলে কাকেই-বা দোষ দেওয়া যায়?
তবে সে-বার একটি বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটে, কারণ দু-দিন পরে সহসা কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীরা স্থির করে নদীতে চড়া পড়েছে তা সত্য নয়, অতএব স্টিমার না আসারও কোনো যুক্তি নেই। হয়তো শহরের নেতৃস্থানীয় প্রবীণ উকিল কফিলউদ্দিন সাহেব নিজেই এ-বিষয়ে নেতৃত্ব গ্রহণ না করলে এমনি ঘটত না; যা শহরের নেতৃস্থানীয় মুরুব্বি মানুষ বিশ্বাস করে না তা অন্যেরাই বা বিশ্বাস করবে কেন? এমন লোক রাতকে দিন বললে অনেকেই যে তমসাচ্ছন্ন রাতেও সূর্যালোক দেখতে পায়, তেমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়।
সেদিন স্টিমারঘাট থেকে উকিল কফিলউদ্দিন সোজা বার-লাইব্রেরি চলে গিয়েছিল। ততক্ষণে স্টিমার না-আসার খবর সেখানে পৌঁছে গেছে এবং সে-বিষয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে আলাপ-আলোচনা চলছে। তাতে অল্পসময়ের জন্যে অন্যমনস্কভাবে যোগ দিয়ে উকিল সাহেব নীরব হয়ে পড়ে; আকস্মিক কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে সে-বিষয়ে প্রথমে আপন মনে ভেবে দেখতে সে ভালোবাসে, কারণ পরের বুদ্ধিমত্তা বা মতামতের ওপর তার বিশ্বাসটি কম। নীরবতার আরেক কারণ ছিল। সে বুঝতে পারে কুমুরডাঙ্গা শহরের বা তার অধীবাসীদের ক্ষতি-অসুবিধার কথায় নয়, নিতান্ত একটি ব্যক্তিগত কারণে সে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। স্টিমার-চলাচল যদি সত্যিই বন্ধ হয় তবে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে দেখা-সাক্ষাতের ব্যাপারে কি একটি বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি হবে না? সকলের পক্ষে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলিত হয়ে একই স্থানে বসবাস করা সম্ভব নয়, ঘটনাচক্রে কার্যোপলক্ষে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবু কোনো আপদ-বিপদ ঘটলে তারা মিলিত হয় এবং রেল-স্টিমার থাকলে সহজে এবং অবিলম্বেই পরস্পরের নিকটবর্তী হতে পারে। কুমুরডাঙ্গা থেকে স্টিমার উঠে গেলে সেটি কী একটি সমস্যায় পরিণত হবে না? এবং তেমন চিন্তা যে অহেতুক নয়, তার জ্বলন্ত প্রমাণও সে কি ইতিমধ্যে পায় নি কোনো জরুরি মামলা-মকদ্দমার কাজে যাচ্ছে-এ-কথা সকলকে বলে থাকলেও আসলে সে তার সদর শহরবাসিনী অতি আদুরে মেয়ে হোসনাকে দেখবার জন্যেই স্টিমার ধরতে গিয়েছিল। আসল কথা লুকিয়েছিল দুই কারণে। প্রথমত, যে-উকিল–স্থানে সে-স্থানে ছুটাছুটি করে, মক্কেলের চোখে তার দাম বেশি। দ্বিতীয়ত, স্নেহকাতর উকিলের ওপর মক্কেলদের বিশ্বাস কম হয়: উকিলের মধ্যে হৃদয়হীন চরিত্রের সন্ধান করে তারা। তবে শুধু মক্কেলদের কাছ থেকে নয়, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও সে মেয়েটির প্রতি তার গভীর স্নেহ-ভালোবাসার কথা সযত্নে লুকিয়ে রাখে : যে-স্নেহ পুষ্পের মতো পবিত্র এবং সৌরভময়, সে-স্নেহকে সূর্যালোকে প্রকাশ করতে নেই বলে তার বিশ্বাস।
