কেতাবখানি পুকুরের পানিতে ছুঁড়ে ফেললাম। ইচ্ছে করল, এ মুহূর্তে ছোটোগাজি সামনে থাকলে ওই নাদানকে চল্লিশ পয়জার মারতাম। আলি বখশ সবসময় আমার দিকে নজর রাখে। সে দৌড়ে এসে পাংশু মুখে শুধু বলল, হজবত! বললাম, কিছু নয়। সে অবাক, ভীত চোখে পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। ছড়িটি তুলে বললাম, অ্যাই কমবখত! এখানে কিছু দেখার নেই। ভাগো! সে মুখ নীচু করে চলে গেল। একটু পরে ওকে বলব, কালা জিনের মুখে কেতাব ছুঁড়ে মেরেছি। তাহলে ও খুবই খুশি হবে। আসলে মানুষের এই স্বভাব, চারপাশের সবকিছুতে অলৌকিককে টুড়তে চায়। মোজেজা অন্বেষণ করে। ওরা ভাবে, এই মাটির দুনিয়াই কি সব? ঠিকই তো, মাটির দুনিয়া নিশ্চয় সব নয়। পানির তলার ওই প্রতিবিম্বের মতো অনেক কিছু আছে। তা জানার জন্য ইলম (পজ্ঞা) অর্জন করা চাই। কিছুক্ষণ পরে আলি বখশ ফের এসে বলল, আনিসুর সর্দার, আরও জনাকতক হুজুরে আলার সঙ্গে করতে এসেছেন। ভাবলাম, এই অস্থিরতা ঘোচানোর জন্য কিছু হালকা গল্পগুজব করা দরকার। ওদের কাজ যত জরুরি হোক, আমি পাত্তা দেব না। বললাম, ওঁদের এখানে নিয়ে এসো। মৌলাহাট জামাতের মুরুব্বি লোকগুলি সম্ভাষণ করতে করতে ঘাটে এলেন। ওঁদের বসতে বললাম। বিপরীত দিকের চত্বরে ওঁরা বসলেন। তারপর আনিসুর কিছু বলতে মুখ খুলেছেন, আচানক সড়কের দিক থেকে বাঁশির সুর ভেসে এল। সঙ্গে-সঙ্গে দুই কানে আঙুল গুঁজে বললাম, কে ওই শয়তান আমার চল্লিশ দিনের বন্দেগি (তপজপ) বরবাদ করল? ওকে জলদি পাকড়াও …
.
নুসাইবা নামে এক নারী
দিলরুখ বেগম কচি, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি রে?
কচি ॥ না, না, না! বলল না, শুনছি। রোজ বলি, অত হুঁ দিতে পারব না!
দি বেগম। শাশুড়িসাহেবার কাছে শুনেছি, পয়গম্বরের জমানায় আববে এক তেজী আউরত ছিলেন। তাঁর নাম ছিল নুসাইবা খাতুন। খোদা জিব্রাইল ফেরেশতার মারফত পাক কোরানের সুরা (অধ্যায়) পাঠিয়ে দিতেন। পয়গম্বর সেইগুলান মুখস্থ করতেন। পরে মজলিশে তা মোমিনদের শোনাতেন। তো একদিন নুসাইবা খাতুন রাগ করে পরগম্বর হুজুরকে বললেন, হজরত! খোদা কেন শুধু পুরুষ-মানুষদের। লক্ষ করে কথা বলেন? মেয়েরা কি মানুষ নয়? আদমের বাঁ পাজর থেকে আমাদের তিনি তৈয়ার করেছেন। তাহলে কেন খোদা আমাদের লক্ষ্য করে পয়গাম (বার্তা) পাঠাচ্ছেন না?
কচি। মার্ভেলাস! তারপর দাদিমা, তারপর?
দি বেগম ॥ শাশুডিসাহেবা বললেন, তারপর থেকে খোদার পয়গামে ‘মুসলিমান ওয়া মুসলিমাত’ কথা দুটো আসতে লাগল।
কচি ।। তার মানেটা কী বলবে?
দি বেগম ।। বুঝলি নে? পুরুষমানুষ আর মেয়েমানুষ দু’তরফকে লক্ষ করে খোদার পয়গাম এল। পাক কোরান পড়ে দেখিস। মর্দানা-আউরত খোদার কাছে সমান। কেউ ছোটো, কেউ বড়ো নয়।
কচি ।। হঠাৎ নুসাইবার কথা কেন, দাদিমা? রাখালছেলেটার কী হল?
দি বেগম ॥ ছেলেটার নাম ছিল ফজু। বাপ-মা কেউ ছিল না। আমাদের সংসারে কাজকাম দেখাশুনা করত দুখু। তারই ভাগ্নে। তখন বয়স বোধ করি নয়-দশ বছর হবে। আমাদের একটা বাঁজা গাইগরু ছিল। তার নাম মুন্নি। ভাসুরসাহেব কতবার এসে সাধাসাধি করতেন, কোরবানিতে মুন্নিকে হালাল করি। শাশুড়িসাহেবা চোখমুখ লাল করে ভাগিয়ে দিতেন। তো মুরিদরা (শিষ্যরা) একটা দুধেল গাই দিয়েছিল। তার নাম আমি কাজলি’ রেখেছিলাম। তার গায়ের রঙ ছিল কাজলা।
কচি ॥ আহা, রাখালছেলেটা–
দি বেগম ॥ বলছি তোআমাদের একটা ছাগলও ছিল। তার নাম ছিল কুলসুম। ফজু সেই মুন্নি, কাজলি আর কুলসুমকে চরাতে নিয়ে যেত। ছেলেটা ছিল ভারি রগুড়ে। শালিকপাখি পুষেছিল। তার জন্য বাঁশের খোলে করে নদীর ওপার থেকে ঘাসফড়িং ধরে নিয়ে আসত। আর ওই এক শখ বাঁশি বাজানো।
কচি ॥ এক মিনিট দাদিমা! রাখালছেলেরা বাঁশি বাজাবেই। কেন বলো তো?
দি বেগম ।। মাঠেঘাটে ঘোরে দিনমান। সময় কাটাতেই বোধ করি বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে বেড়ায়।
কচি ।। দারুণ বলেছ! তবে আমার মনে হচ্ছে কী জান? প্রকৃতির মধ্যে গেলে মানুষ একা ফিল করে– লোনলি ফিলিংস! অথবা– প্রকৃতিতে সারাক্ষণ সুর বেজে চলেছে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পদ্যে পড়েছি। সেই সুরকে মানুষ, মানে রাখালছেলেটা, মানে তোমাদের ফজু বাঁশিতে নিতে চাইত। প্রতিধ্বনির মতো! Whose heart-strings are a lute!
দি বেগম ।। নিজেই বকবক করবি, নাকি গল্পটা শুনবি?
কচি ।। সরি! বলো, তারপর কী হল? তোমার বিক্রমশালী শশুর রাখাল বেচারাকে কুলগাছে বেঁধে জুতো মারছিলেন। শ্রদ্ধাভক্তি আর রইল না বাবা! ভ্যাট!
দি বেগম ।। উনি ফরাজি আলেম ছিলেন। মৌলাহাটে সে-জমানাও ছিল আলাদা। তো ফজুকে উনি এবাদতখানার উঠোনে কুলগাছে বেঁধে রেখেছেন। বাঁশিটা ভেঙে পুকুরের পানিতে ফেলেছেন। সেই খবর এল যখন, তখন শাশুড়িসাহেবা মগরেবের জন্য বদনায় পানি নিয়ে অজু (প্রক্ষালন) করতে যাচ্ছেন। আমি তোর আব্বাকে তোর দাদাজির কোলে দিয়ে বদনা হাতে নিয়েছি। হেন সময়ে দুখু কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ঢুকল। শাশুড়িসাহেবার হাত থেকে বদনা পড়ে গেল। শুধু পলকের জন্য দেখলাম, বেপরদা হয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
কচি ।। তারপর দাদিমা, তারপর?
দি বেগম ॥ তখনও দিনের আলো আছে। বাদশাহি সড়ক ধরে ছুটতে-ছুটতে–
কচি ।। ছুটতে-ছুটতে?
দি বেগম ॥ যারা দেখেছিল, তারা বলেছিল। তবে মরদলোকেরা ওঁকে তো কেউ চিনত না। উনি এবাদতখানায় ঢুকে কুলগাছ থেকে ফজুর বাঁধন খুলে দিলেন। ছেলেটা তখন আধমরা। মুখে খুন ঝরছে। কোলে তুলে নিয়ে বললেন, ‘কত বড়ো বুজুর্গ হয়েছে, কত জিন পোষা আছে, দেখি। সাধ্যি থাকে তার জিনেরা আমার। কাছ থেকে কেড়ে নিক। এই বলে এবাদতখানা থেকে বেরিয়ে এলেন।
