আলি বখশ এসে বলল, হজরত! আমি খানা তৈরি করলাম। এদিকে এক কান্ড দেখুন। মাঝলা (মেজো) বউবিবি হুজুরের জন্য নাশতা পাঠিয়েছেন। বললাম, তুমি খেয়ে নাও। আলি বখশ তবু দাঁড়িয়ে রইল। রাগ করে বললাম, যা বলছি, তাই করো আলি বখ। সে গলার ভেতর বলল, মাঝলা মিয়াঁসায়েব দাঁড়িয়ে আছেন। হজরত! ঘুরে দেখি লাঠিতে ভর দিয়ে মনিরুজ্জামান এবাদতখানার দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার কাছে একটা নেংটির মতো গামছাপরা আদুড়-গা ছেলে। সেই রাখাল ছেলেটা! সে আমাকে দেখে হি-হি করে হাসতে-হাসতে পালিয়ে গেল। ওই ছেলেটা সাইদার গাইগোরুটি চরাতে নিয়ে যায় দেখেছি। আমাকে দূর থেকে দেখেই বেআদবি করে –হাসে। একদিন আলি বখশ তাড়া করেছিল ওকে। মনিরুজ্জামান তাকাল। তাকে ধমক দিয়ে বললাম, কেন এসব এনেছ? বাড়ি নিয়ে যাও, বলছি। মনিরুজ্জামান গোমড়ামুখে নড়বড় করতে-করতে চলে গেল। তার উদ্দেশে ফের বললাম, বলেছি–তোমরা কেউ আমার এবাদতখানায় খানা পাঠাবে না। তবু কেন এসব কর? এবাদতখানার সীমানায় আমার হুকুম আগে না নিয়ে কারুর আসা বারণ। আলি বখশকে খুব বকাবকি করলাম। সে কাঁচুমাচু মুখে তিনদিকঘেরা পাকশালার দিকে চলে গেল। আমার খানা রেশমি কাপড়ে ঢেকে রেখেছে এবাদতখানার বারান্দায়। খেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু কেনই বা খাব না? আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের জন্য রোজ রজি মেপে দেন। এ আমার প্রাপ্য। খেতে-খেতে দেখলাম, আলি বখশ এদিকে পিঠ রেখে বসে খাচ্ছে। সাইদা কিংবা সত্যিই মেজবউবিবি কী নাশতা পাঠিয়েছে, জানতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু আলি বখশের খাওয়ার ভঙ্গিতে যেন লুকিয়ে খাওয়া চোরাগোপ্তা জানোয়ারের আদল, একটি বেড়াল অথবা একটি কুকুর চুপিচুপি ঝোঁপের আড়ালে কিছু নিয়ে গিয়ে যেভাবে খায়। নাউজুবিল্লাহ! এসব আমি কী ভাবছি? খাওয়া শেষ করেও কতক্ষণ আলি বখশের খাওয়ার ভঙ্গিটি বিরক্তিকর স্মৃতির মতো আমাকে মাঝে-মাঝে খোঁচা দিচ্ছিল। ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ ধ্যানে বসলাম। কিন্তু মন বিক্ষিপ্ত। হরিণমারার ছোটোগাজির দেওয়া দিওয়ান-ই-হাফিজের পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে এলাম তাক থেকে। খুলতেই চোখ গেল ।
‘জে পাদ্শাহ ব জুদা ফারিগম ব হম্দ্ ইল্লাহ্
জুদা এ খাকে দরে দোস্ত পাদশাহে মন্ অস্ত…’
‘উপাস্যকে প্রশংসা! বাদশাহ থেকে আমাকে ফারাক করেছেন / দোস্তের দরজার ধুলোই এখন আমার বাদশাহ। মারহাবা! শাবাশ! কিন্তু কোথায় আমার দোস্ত আর দরজা? উপাস্য আল্লাহ কি এ বান্দার দোস্ত হতে পারেন, তাঁর দোস্ত শুধু প্রেরিত পুরুষ। আমি বেঅকুফ ফরিদুজ্জামানের মতো সুফি নই, আমার সহোদর ভাই ছিল ফরিদুজ্জামান। সে নিজেকে বলত ‘মাশুক’ (প্রমিক)। তার মাথায় মেয়েদের মতো লম্বা চুল ছিল। সে গান গাইত। নাউজুবিল্লাহ। তার চুল কেটে জুতো মেরে ভাগিয়ে দিয়েছিলাম তার জঙ্গলের আস্তানা থেকে। আমার বুকে হাতুড়ির ঘা পড়ল। আমার সহোদর ছোটো ভাই! কোথায় আছে সে এখন? বেঁচে আছে না মরে গেছে? তাকে সামনে পেলে জেনে নিতাম আল্লাহের মাশুক হওয়ার যোগ্যতা কি প্রেরিত পুরুষ ছাড়া অন্য মানুষের সত্যিই আছে? বারান্দায় কাশির শব্দ। তারপর আলি বখশ মৃদুস্বরে বলল, আনিসুর রহমান এসেছেন হুজুরের কাছে। বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলাম। এবাদতখানা ঘরের ভেতর কাউকে ঢুকতে দিই না। আনিসুর নিচে প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে প্রথমে ‘আস্-সালামু আলায়কুম’ সম্ভাষণ করল। সম্ভাষণের জবাব দিলে সে বলল, হজরত। কুঠো আবদুলের বিবিকে নিয়ে ঝামেলা বেধেছে। আবদুল মরার পর সে ডাহিন (ডাইনি) হয়েছে। নদীতে পিরের সাঁকোর কাছে রাতে নাঙ্গা (উলঙ্গ) হয়ে চেরাগ জ্বেলে হিন্দুদের মতো পুজো করে। অনেক লোক দেখেছে। এবারে একটা ব্যবস্থা না করলে আমাদের মান থাকে না। হানাফি-গাঁয়ের লোকে তামাশা করে। বলে, তোমাদের পিরসাহেবের কুদরতি (লীলমাহাত্ম্য) এবার দেখাও! হুজুর হজরতে আলা! আপনিই মৌলাহাট ফরাজি-জমাবে সর্দার করেছেন আমাকে। তাই আপনার হুকুম ছাড়া কিছু করব না। আনিসুরের কথা শুনতে-শুনতে পুকুরের ওপর দিয়ে নজর পাঠিয়ে দিলাম উত্তর-পশ্চিম দিকে দূরে নদীর পুরনো সাঁকোটির দিকে। একটা ঘূর্ণি বয়ে যাচ্ছে সেদিকে। ধুলো, খড়কুটো, ছেঁড়া শুকনো পাতার ঝক– জিনেরা পাগড়ির মতো। কোনো কালাজিনই হবে.! আনিসুর বলল কী? ওর প্রশ্নবোধক সম্ভাষণে আস্তে আস্তে বললাম, আউরতটির নাম কী যেন? আনিসুর বলল, ইকরা –ইকরাতন।, ‘ইকরাতন’ মানে আবৃত্তিকারিণী। দূরের ভাঙা পোড়ো সাঁকোর কাছে ‘আবৃত্তিকারিণী’কে আবার সেদিন দেখেছিলাম। বললাম, আপনাদের কিছু করতে হবে না আনিসুর রহমান! আমি দেখছি। বলেই ঘরে ঢুকে গেলাম। বাইরে আনিসুর আর আলি বখশ চাপাস্বরে কীসব বলাবলি করতে থাকল। আমি উত্তরের জানালার ধারে গিয়ে আবার কালো সাঁকোর থামগুলো দেখছিলাম। তারপর চমক খেলে গেল। ঝড়বৃষ্টির রাতে সাইদার কাছে গেলে সে আমাকে বলেছিল, ইকরাতনের দিকে আমার নজর পড়েছে। দ্রুত আবৃত্তি করলাম :
‘হাসানুল্লাহ নি’মাল আকিলু!
আলাল্লাহি তাওয়াকাল্না—’
বালা-মুসিবতে (অস্বাস্থ্যে ও বিপদে) এই পবিত্র বাক্যটি পাঠ করার নিয়ম! সেই ঘূর্ণি হাওয়াটি এখন কালো পুরনো থামগুলিকে ঘিরে ফেলেছে। আমার নজর খুলে যাচ্ছে। একটি কালো থামের গায়ে দগদগে লাল সিঁদুরের ছোপ এতদূর থেকে দেখতে পাচ্ছি– নাকি দেখতে চাইছি বলেই দেখছি? আল্লাহ জানেন আমার চোখের কী ক্ষমতা তিনি দিয়েছেন। কালো থামের মধ্যে চেহারা নিচ্ছে একটি স্ত্রীলোক, নাঙ্গা আউরত সিঁথিতে সিঁদুর, আর ওই নদী, চিতার মতো দাউদাউ রোদ, আব্বার পবিত্র হাত আমার চোখ ঢেকে দিক। আমার বুদ্ধিসুদ্ধি বিগড়ে গেল কি? অথবা প্রকৃতই একটি মোজেজা দর্শন করলাম। বিবি ইকরাতন কি হিন্দু স্ত্রীলোক? তাকে কি আবদুল কুঠো ভাগিয়ে এনেছিল তার স্বামীর চিতা থেকে? আবদুল শুনেছি দুর্ধর্ষ ডাকু ছিল। আমি বেরিয়ে গিয়ে দেখি, আনিসুর তখনও দাঁড়িয়ে। বললাম, ইকরাবিবি কি হিন্দু আউরত ছিল, জানেন? আনিসুরের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। গাঢ় স্বরে বলল, হজরতে আলা! আপনার অজানা কিছু নেই। আপনি যা বলছেন, তা এবার সত্যি হল। কেননা, আমরা শুনেছি, আবদুল তাকে কোত্থেকে ভাগিয়ে এনেছিল। এও শুনেছি, সে নাকি হিন্দু আউরত। বাম্ভন (ব্রাহ্মণ) ঘরের বেটি। শুনে শুধু বললাম, দেখছি।….
