হুজুর!
গাড়োয়ান ঘুরে তাকে প্রশ্ন করছিল। বদিউজ্জামান বলেছিলেন, কিছু না।
গাড়োয়ান হলুদ দাঁতে হেসে বলেছিল, আর এসে পড়েছি বলে! ইনশাল্লা! ফজরের নামাজ মৌলাহাটের মসজিদেই পড়ব দেখবেন। আপনার মেহেরবানিতে, হুজুর, বলদ দুটো কেমন টগবগিয়ে পা ফেলছে দেখছেন?
এই বলে সে বলদ দুটোর লেজ খামচে বিকট চেঁচিয়ে উঠেছিল, ইর্র্র হেট্ হেট্! লে লে লে…হুদ্দে হুদ্দে হুদ্দে…
.
.
সাইদা খবর পেয়েছিলেন আগের দিন সন্ধ্যায়। ইন্দ্রাণীর হাটে গিয়েছিল কারা, তারা খবরটা পায়– হুজুর মদনপুর থেকে রওনা দিয়েছেন। রুকু হিসেব করে, বলেছিল, পৌঁছতে রাতদুপুর হরে। মনিরুজ্জামান কীভাবে ব্যাপারটা আঁচ করে আগের মতো মুখে হাত ভরে আপনমনে খ্যাখ্যা করে হেসে উঠেছিল। সাইদা বেগম নির্বিকার মুখে রান্না করছিলেন। মুরগির গোস্ত, খেজুরথড়ি চালের পোলাও, সেদ্ধ করে রাখা বাসি গোরুর গোস্তের কোপ্তা। সারা সন্ধ্যা রুকু শিলনোড়ায় গোস্তটা থেঁতলে নরম করেছিল। বাড়িতে কয়েকটা আলো এ রাতে। আয়মনি এসেছিল এশার নামাজের পর। পা ছড়িয়ে বারান্দায় বলে চাপাস্বরে রোজির সংসারের গল্প করছিল। শফির নিপাত্তা হওয়ার খবরে সে কান করেনি। বলেছিল, আছে কোনোখানে। বাপের স্বভাব। ঠিকই মা বসে ডেকে বাড়ি ঢুকবে। সাইদা কোনো মন্তব্য করেননি। দুদিন আগে দেওয়ানসাহেবকে Tড়াল থেকে বলে দিয়েছেন, শফি আমার মরা ছেলে। ওর কথা আমার মনে পড়ে না দেওয়ানসাহেব।
এদিন শফির আব্বা আসবেন শুনে শফির কথাই বেশি করে মনে পড়ছিল সাইদার। প্রস্তুত হচ্ছিলেন মনে-মনে, সামনে এসে দাঁড়ালেই জামা খামচে ধরে আকাশচেরা গলায় বলবেন, আমার শফিকে ফিরিয়ে এনে দাও! তোমার না জিনের পাল পোষা আছে, শুনি! বলো তাদের, এখনই এনে দিক আমার বুকের মানিককে। নইলে তোমার নিস্তার নেই।
রুকু দেখছিল, বিবিজি বারবার ঠোঁট কামড়ে ধরছেন। যেন কার সঙ্গে ঝগড়া করছেন। চোখ নিষ্পলক! নাসারন্ধ্র স্ফুরিত!
দুখু শেখ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সাড়া দিচ্ছিল, মাজান! বিবিজান গো!
সাইদা তাকে দেখা দেন না। আয়মনি কান করে শুনে ফিক করে হাসল। ওই গো, খবর হয়েছে!
না –এখনও খবর হয়নি। দুখু শেখ জানিয়ে গেল, বানারিপুরে হুজুর এশার নামাজ পড়েছেন। আসতে ভোর হয়ে যাবে। দুদণ্ড বেলাও হতে পারে।
সাইদা শ্বাস ছেড়ে বললেন, বউবিবি! শোও গে যাও! আয়মনি, বাড়ি যাবি না শুবি আমার কাছে?
আযমনি বললে, একটু দাঁড়ান বিবিজি! বাপজানকে বলে আসি।
আযমনি বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরে নুরুজ্জামান এল হন্তদন্ত। আম্মা! আম্মি! আব্বাসাব আসলেন?
না।
নুরুজ্জামান উঠানে দাঁড়িয়ে বলল, তাজ্জব।
উঠোনে চাঁদের আলো সবে পৌঁছেছে। কুয়োর কাছে রুকু কী একটা করছিল। নুরুজ্জামান দেখল, তার ভ্রাতৃবধূ হাতে বদনা নিয়ে টাট্টিঘরের দিকে চলেছে। সে মাঝখানের ঘরটার দিকে তাকাল। মনিরুজ্জামান তাপোশের বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে খুব দুলছে। নুরুজ্জামান চোখ সরিয়ে নিল।
সাইদা বললেন, বসবি না নুরু?
নাঃ। যাই আম্মি! মসজিদ থেকে সোজা আসছি। শোচ করলাম কী, আব্বাসাব আসলেন নাকি দেখে যাই!
নুরুজ্জামান চলে গেলে সাইদা ক্ষুব্ধভাবে আপন মনে বললেন, ঢং! আব্বাসাব এলে মসজিদে খবর হবে না কি বাড়িতে খবর হবে! দুশমন– সব্বাই দুশমন!
রুকু বেরিয়ে বলল, কিছু বলছেন বিবিজি?
সাইদা গম্ভীর মুখে বললেন, না। শুয়ে পড়ো। রাত হয়েছে।
আয়মনিখালা আসুক।
সাইদা ধমক দিলেন, শোও তো তোমরা।
মনিরুজ্জামান গোঙানো গলায় যেন গান গাইবার চেষ্টা করছিল। ভুতুড়ে শব্দটা ভারি বিরক্তিকর। কিন্তু কেন মনি আজ এত খুশি, বুঝতে পারছিলেন না সাইদা। ওর আব্বা তো জন্ম দিয়েই খালাস। কোনোদিন ভুলেও কি তার দিকে একবার। তাকিয়েছে? তাকালে কবে ও পুরোপুরি মানুষ হয়ে যেত।
সেই মুহূর্তে সাইদা বেগম আরও শক্ত হয়ে গেলেন।…
সে রাতে সাইদা চেয়েছিলেন মজবুত এক উদাসীনতা। প্রবলভাবে ঘুমোতে চেয়েছিলেন, এমন ঘুম যেন কেউ এসে ডাকাডাকি করে ফিরে যাক। কিন্তু উদাসীনতা, ঘুম বা শক্ত ভাবটা শেষ পর্যন্ত তিনি ধরে রাখতে পারেননি। আয়মনি গাঢ় ঘুমে কাঠ। সাইদার ঘুম নেই। বাদশাহি সড়কে সারারাত গাড়ি চলার গড়গড় কোঁচ কোঁচ অদ্ভুত সব শব্দ হয়। মাঝে-মাঝে ভেসে আসে ঘুমঘুম গলায় গাড়োয়ানের গানের সুর। সে রাতে প্রতিটি শব্দের স্বাদ যাচাই করেছিলেন সাইদা। দুরের গাড়ির চাকার শব্দ শুনতে শুনতে প্রতীক্ষা করছিলেন কখন শব্দটা এসে তাঁর খুব কাছে, হয়তো বা বুকের পাঁজরের কাছে এসে থেমে যাবে।
কিন্তু কোনো চাকার শব্দই থামল না। তাঁর বুক মাড়িয়ে মাথার খুলির ভেতর একটি গুরুভার গাড়ির দুটি চাকা গড়িয়ে যেতে থাকল অনন্তকাল, আজীবন।
বদিউজ্জামানের খবর এল সকালে। দুখু শেখ খবর এনেছিল। হুজুর পিরসাহেব ফজরের নামাজ পড়েছেন হরিণমারায়। ছোটোগাজি ছাড়েননি। এবেলা হরিণমারায়। থাকবেন। বিকেলে রওনা দেবেন। দুখু শেখ হুজুরের আসন্ন প্রত্যাবর্তনের ‘নমুদ (সাক্ষ্য) হিসেবে একটি গোরুর গাড়িকে রাস্তা দেখিয়ে এনেছিল। গাড়িটিতে শস্যের বস্তা, জালাভরতি গুড়, কয়েকটা কুমড়ো। দুখু সদর দরজার বাইরে থেকে চেঁচিয়ে ঘোষণা করছিল এইসব খবর। সাইদা তাকে দেখা দেন না। রুকু ঘোমটা টেনে দলিজঘরের দরজা খুলে দিল। তারপর সাইদা দেখলেন, মনিরুজ্জামান নড়বড় করে হেঁটে দলিজঘরের দিকে চলেছে। বুঝলেন, আব্বা কী নমুদ পাঠিয়েছেন, তা দেখার জন্যই যাচ্ছে সে। রুকু তার পাশ কাটিয়ে সরে এল। সাইদার ভুরু কুঁচকে গেল। তিনি জানেন, দরিয়াবানুর এই মেয়েটি তাঁর মেজো ছেলেকে ঘৃণা করে।
