ওয়া আলাইকুম আস্সালাম।
বারান্দার চুনকামকরা থামের কাছে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন বদিউজ্জামান। ঘোড়ার আওয়াজ শুনেই তিনি চমকে উঠেছিলেন। আগন্তুক করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালে তিনি দুহাতে হাতখানি গ্রহণ কবলেন। তাঁর মনে ঝড় শুরু হয়েছিল। অতিকষ্টে দমন কবে আস্তে বললেন, ভেতরে আসুন দেওয়ানসাহেব।
দেওয়ান আব্দুল বারি চৌধুরি নাগবাজুতো খুলে বাবান্দা উঠলেন। তাঁব বা হাতে বন্দুক ছিল। বন্দুকটি নিয়ে খোদাব ঘরের ভেতরে ঢোকা উচিত হবে কি না ভেবে একটু দ্বিধায় পড়েছিলেন। সেটা লক্ষ্য কবে বদিউজ্জামান একটু হেসে বললেন, নিয়ে আসুন। ইসলাম কালাম (ঐশী বিদ্যা) আব হাতিয়াব দুই-কেই সমান ইজ্জত দেয়। আমার বসুলে কবিম (সাঃ) নিজে হাতিয়াব ধরে লড়াই করেছিলেন। আসুন।
কিন্তু তাঁর মনে ঝড় উঠেছিল। হঠাৎ এই অজ পাড়াগাঁয়ে দেওয়ানসাহেব এভাবে এসে পড়েছেন, নিশ্চয় তার কোনো মজবুত কাবণ Tছে। বদিউজ্জামান গালিচাব একাংশ দেখিয়ে বললেন, বসুন। বারি চৌধুবী গালিচায় বসলেন না। নগ্ন চুনকংক্রিটেব মেঝেয় বসে পড়লেন। তাঁকে ভীষণ গম্ভীব দেখাচ্ছিল।
বদিউজ্জামান গালিচায় বসে তাঁকে দেখতে-দেখতে বললেন, কোনো জরুরি খবর আছে দেওয়ানসাহেব?
বারি মিঁয়া আস্তে বললেন, ভেবেছিলাম আমাকে চিনতে পারবেন না।
বদিউজ্জামান মুখে সরল হাসির ছটা তুলে বললেন, আল্লাহের দুনিয়ায় কিছু কিছু চেহারা মনে খোদাই করে রাখার মতো।
আমি গোনাহগার মানুষ পিরসাহেব। আমাব তারিফ কববেন না। বারি মিঁয়া হাসবার চেষ্টা করে বললেন। হরিণমারার ছোটোগাজির মুখে আমার কুফবি (বিধর্মীসুলভ) চালচলনের কথা শুনে থাকবেন। যাই হোক, আপনার খোঁজে আজ প্রায় সারাটা দিন কেটে গেছে। আমার বরাত। আপনার দেখা পেলাম অবশেষে।
বদিউজ্জামান গম্ভীব হয়ে বললেন, খবব বলুন দেওয়ানসাহেব।
আপনি শফির খবর রাখেন?
বদিউজ্জামান চমকে উঠলেন। নিষ্পলক দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, শফিব খবর। সে তো আপনার রাখার কথা। কেন দেওয়ানসাহেব?
শফির সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি? আপনার কাছে আসেনি সে?
না। কেন –কী হয়েছে তার?
বারি মিঁয়া গলার ভেতর বললেন, প্রায় সাতদিন হতে চলল, তার পাত্তা নেই।
বদিউজ্জামান ঝুঁকে এলেন তাঁর দিকে। তাঁকে কুদ্ধ দেখাচ্ছিল। শ্বাস প্রশ্বাসজড়ানো গলায় বললেন, কেন পাত্তা নেই? তাকে আমি আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আপনি তার জিম্মাদার। আর আজ আপনি আমার কাছে তার খবব নিতে এসেছেন। আজ্জব।
বারি মিঁয়া মৃদুস্বরে বললেন, ওকে লালবাগে নিয়ে গিয়েছিলাম। হবিণমারা স্কুলে থাকলে ওর পড়াশোনা হবে না ভেবে কাছে বেখেছিলাম। নবাব বাহাদুব ইন্সটিটিউশনে বাইরের ছেলেদের ভরতি করে না। ওটা নবাব ফ্যামিলির প্রাইভেট স্কুল। তো–
বদিউজ্জামান প্রায় গর্জন করে উঠলেন, কুফরি বাত ছাড়ুন। সাফ-সাফ বলুন, কেন শফি চলে এল?
মাথা নেড়ে দুঃখিত স্বরে বারি মিয়াঁ বললেন, সেটাই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ অমন করে চলে আসার পর আমি মৌলাহাটে গেলাম। গিয়ে শুনি, রোজি-রুকুর মা সুইসাইড করেছে। শফি সেখানে যায়নি। আবার ছুটে গেলাম হরিণমারায় বড়োগাজির কাছে। খোনকারসাহেবের কাছেও গেলাম। শফি যায়নি। তারপর ভাবলাম আপনার কাছে এসেছে নাকি।
বদিউজ্জামান চুপ করে থাকলেন। মুখটা নিচু। পিদিমের সামান্য আলোয় তাঁর চোখদুটি চিক চিক করছিল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ভাঙা গলায় বললেন, আপনি শফির জিম্মাদার! তার ভালোমন্দের সব দায় আপনার।
জি হ্যাঁ।
শফিকে আমি আংরেজি কালাম শিখতে দিয়েছিলাম! বদিউজ্জামান আবেগপ্রবণ মানুষ। এই কথাটি বলেই অবোধ বালকের মতো ফুঁপিয়ে উঠলেন। শয়তান আমাকে জাদু করেছিল। হা আল্লাহ! সেই গোনাহগারির এই খেসারত!
প্রার্থনায়, ভাষণে, মজলিশে উদাত্ত কণ্ঠস্বরে পবিত্র বাক্য আবৃত্তি করতে করতে হুজুর পিরসাহেবকে তাঁর সব শিষ্যই এভাবে কাঁদতে দেখেছে। মহুলার শিষ্যরা ততক্ষণে ভিড় করে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়েছে। তারা ভেতরে ঢুকতে ভরসা পাচ্ছে না। বাইরে গ্রামের পথে গাবগাছটার তলায় ঘোড়াটা তেমনি স্থির দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণে নদীর ওপারের আকাশে প্রকান্ড জালার মতো মেটেরঙের চাঁদটা উঠছিল। সেই পাংশু ছটায় কালো ঘোড়াটিকে অলীক দেখাচ্ছি– যেন এক পক্ষিরাজ। মেয়েরা একটু দূরে পিদিম হাতে দাঁড়িয়ে ওই অলৌকিককে প্রাণ ভরে উপভোগ করছিল। তাদের কেউ-কেউ হাসাহাসি করে বলছিল, নুহ বেঁচে থাকলে বড়ো মজা হত। মজাটা কী হত, বলা কঠিন। তবে নহ নিশ্চই ওই আশ্চর্য প্রাণীটির সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারত।
বাইরে চটুল এবং চাপা হাস্যপরিহাস, ভেতরে ক্রন্দন। বিব্রতমুখে বারি মিয়াঁ বললেন, হুজুর পিরসাহেব! আপনি বুজুর্গ আলেম। এই সামান্য ব্যাপারে আপনার অস্থির হওয়া শোভা পায় না। আমি শুধু দেখতে এসেছিলাম, শফি আপনার কাছে এসেছে কি-না।
সবুজ পাগড়ির প্রান্ত নাকে চোখে ঘষে বদিউজ্জামান সংযত হলেন এবার। ভাঙা গলায় বললেন, আপনি শফির আম্মার সঙ্গে দেখা করেছেন?
জি হ্যাঁ।
তিনি কী বলছেন?
পদ্মার ধারে ভগবানগোলার ওদিকে ওঁর ভাইয়ের বাড়ি। সেখানে গিয়ে থাকতে পারে!
যাবে না। বদিউজ্জামান গলার ভেতর বললেন। যায়নি।
কেন?
শফির মামুজি এক শয়তান। নেশাভাং করে। খুদ জাহান্নামি শয়তান সে।
