তার নির্দেশ পালন করলাম। কিন্তু ভেবেছিলাম, সে বৈঠাটাই বাড়িয়ে দেবে –তা দিল না। বাঁহাতে বৈঠাটা পাঁকে লাঠির মতো দেবে ডানহাতটা বাড়াল। তার হাতে আয়মনির হাতের মতোই একগোছা নানারঙের কাঁচের চুড়ি ধ্বনি-প্রতিধ্বনিময়। আয়মনির হাতের ছোঁওয়া একটু-আধটু পেয়েছিলাম। কিন্তু কখনও সে-ছোঁওয়া এমন প্রত্যক্ষ আর জোরালো ছিল না। মনে হল সৌন্দর্য বা চেহারার লালিত্যের তুলনায় আমার হাতখানি ঈষৎ রুক্ষ আর শক্ত। শ্রমজীবী নারীর হাত। আয়মনির বাপের তোজ মিজিরেত আছে প্রচুর। কিন্তু আসমার মধ্যবয়সী স্বামীটি খুবই গরিব মানুষ। সামান্য একখানি ধানখত আর নদীর কাঁধে একটুখানি জমির মালিক সে। ওই ধানখেতের কোনো ভরসা নেই। কারণ হঠাৎ বৃষ্টিতে নদীর এপার ছাপিয়ে বন্যায় সব ভেসে যেতে পারে। এপারে কোন বাঁধ নেই। বাঁধ অন্যপারে কাছারিবাড়ির পেছনে সমান্তরাল।
এখন ঘন গাছপালা। বৃক্ষলতার এমন ঠাসবুনোট কারুকার্য প্রথম যেদিন দেখি, সেদিনকার অনুভূতি আর আজকের দিনশেষের এই অনুভূতি এক নয়। শেষবেলায় নদীর বাঁকের ওপারে বিধ্বস্ত কুঠিবাড়ির জঙ্গলের নিচে সূর্য নেমে গেলে নদী আর এই বনভূমি কী এক রহস্যময় ধূসরতায় ছমছম করছিল। জনহীন এই নিসর্গে প্রকৃতির ফিশফিশ ষড়যন্ত্রের মতো হালকা আর শিরশিরে হাওয়া বইছিল। জামবাটিটা। তুলে নেওয়ার আগে আসমা বৈঠাটা নরম ঘাসেঢাকা মাটিতে বিধিয়ে দুটি মুক্ত হাত উঁচু করে খোঁপা বাঁধতে লাগল। আবার উন্মোচিত হল তার স্তন, পুরোপুরি নয় –অর্ধোন্মোচিত। আর অবিশ্বাস্য হঠকারিতায় প্রাকৃতিক স্বাধীনতা হাহাকার করতে করতে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।….
.
দেখো শাস্ত্রী! এই দেখো, আমার হাতের নোম খাড়া হয়ে গেছে। শিরশির করছে রোমাঞ্চের তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা সারা শরীরে। তবে সেই প্রথম স্বাধীনতার অঙ্কুরোদগম আমার দেহ-মনে। সেই প্রথম প্রকৃতির করতলগত হওয়া! সেই প্রথম কালো ঘোড়াটির অন্ধ হয়ে যাওয়া। তার হ্রেষা আর খুরধ্বনি সেই প্রথম।
অসমা অর্ধস্ফুট স্বরে বলে উঠেছিল, আ ছি ছি! এ কী, এ কী! তুমি না পিরসায়েবের ছেলে?
ভিজে চবচবে ঘাসের ওপর বাঘের হরিণ ধরার মতো একটা ধস্তাধস্তি চলছিল। আসমার শরীরে আমার শরীর মাথা কোটার ভঙ্গিতে আছড়ে পড়েছিল। হায় শরীর! মানুষের হারামজাদা শরীর! শুয়োরের বাচ্চা শরীর!
কুছ তকলিফ, সাব?
তাকালাম।
ডিপটি জেলরবাবুকো খবর ভেজুঙ্গা ডাগদারকে লিয়ে?
না।
আপ শো যাইয়ে সাব! বারাহ বাজ গয়া!
আপনা কাম করো ভাই, আপনা কাম করো!
লম্বানেকো শাস্ত্রীটির পাশে বেঁটে শাস্ত্রটি এসে দাঁড়াল। বলল, ক্যা জী?
কুছ নেহি ভেইয়া, কুছ নেহি!
বেঁটে ভারী সঙ্গীন বাগিয়ে কাঁধে রেখে আস্তে আস্তে বলল, শোচিয়ে মাত সাব। খুদা কিসিনে জিন্দা রাখনে চাহে তো উসকো মার ডালে কোন? আপিল পেশ কিয়া–শুনা। শোচিয়ে মাত। শো যাইয়ে আরামসে!
সে আরও সমবেদনায় বলে উঠল, কেত্তা আদমি বিমারসে মর যাতা! মউতকো তো সাথ-সাথ লে কর আদমি দুনিয়ামে আতা হ্যায় সাব! আপ লিখা-পঢ়াহ। আদমি। সবহি জানতে হেঁ আপ!
তাদের বুটের শব্দ বুকের ভেতরটা মাড়িয়ে দিয়ে গেল। আমি সরে গিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকালাম। দেখলাম সামনে মেহরু দাঁড়িয়ে অথবা বসে আছে, কিংবা সে কোনো একভাবে আছে। তার কণ্ঠস্বরের আশ্চর্য প্রতিধ্বনি এতকাল পরে ভেসে উঠল। মউতকো তো সাথ সাথ লেকর আদমি আতা হ্যায় দুনিয়ামে! আর মেহরু বলেছিল, জেবন-মরণ দুই ভাই– একই সঙ্গেতে জন্ম লয় মায়ের জঠরে। একই সঙ্গেতে বাড়ে। দু-ভাইয়ে কত ছলচাতুরি, কত লুকোচুরি খেলা। তবে কথা কি কালসাপ নিয়ে মানুষের বসবাস। তমু মানুষের ই কথাটো খ্যাল হয় না গো! তমু মানুষ কী করে সব ভুলে থাকে!
মেহরু বলত, তাদের বংশের পদবি খামরু। সে মেহেরু– মেহেরুদ্দিন খামরু। কারণ তার পূর্বপুরুষের ঢের জোতজমা ছিল। খামার ছিল! খামারবাড়িটা নাকি এত বড়ো ছিল যে লোকেরা তাদের খামরু বলে সম্ভাষণ করত। কিন্তু এই রাক্ষসী নদী আর নবাববাহাদুর আর হরিণমারার বড়োগাজির মামাতো ভাই ইন্দ্রাণীর খুদে জমিদার রফিকুলের পূর্বপুরুষ খামরুবংশকে ভিখিরি করে দিয়েছিল। এখন সে প্রফুল্ল সিঙ্গিকে সেলামি দিয়ে ওই ডুবো জমিটুকু সালগুজারি বন্দোবস্ত নিয়েছে। দু-আনা পাঁচ-গণ্ডা খাজনা আর ম্যানেজারবাবুকে শীতের সময় দশ আড়ি ধান ভেট। আড়ি বেতে তৈরি একটা পরিমাপপত্র। কিন্তু মেহেরুর সন্দেহ, আড়িটার প্রান্তিক বেড়ে দুটো বাড়তি বেতের চক্কর আছে।
এখন এবং আরও পরে মেহরুর কথা মনে এলেই বিব্রত বোধ করতাম। একজন দার্শনিককে আমি ঠকিয়েছি! এদেশের এক মেঠো সোক্রাতেসকে আমি দূর কৈশোরে শুধু মিস করিনি, তাকে অপমানও করেছি! আর কী জঘন্য কথা, লালবাগ শহরের নবারি হাতির সাতমার কাল্লু পাঠান তাকে একদিন ঠাট্টা করে বলেছিল, মেহরু! তুমি কেমন মোরোদ আছ– কী তুমার বিবি এই ভেগে গেল? তো আমাকে দেখো, আমি পাঠানবাচ্চা আছে। হামার উমরভি তুমার সমান আছে। হামারভি ছোটি এক বিবি আছে। তো–
মেহরু, দার্শনিক মেহরু অশালীন খিস্তি করে নিজের শিশ্নটির শক্তি বোঝাতে হাতির পায়ের শেকল বাঁধা লোহার গোঁজের উপমা দিয়েছিল! কাল্লু পাঠান হা হা করে হেসে অস্থির। আমিও খুব হেসেছিলাম। মনে হয়েছিল, সে যা বলছিল, তা কদাচ সত্য নয়।
