রত্নময়ী সুস্পষ্ট উচ্চারণে বলল, আস্সালামু আলাইকুম।
আমি স্তম্ভিত। হরিবাবু হাসতে হাসতে বললেন, রত্ন পূর্বজন্মে মুসলমান ছিল। যাই হোক, তোমরা বাক্যালাপ করো। সভা উপলক্ষে বিস্তর ‘টিকটিকির’ উপদ্রব হওয়ার সম্ভাবনা। আমি সভার ভিড়ে গা-ঢাকা দিতে গেলাম। রত্ন, তুমি গোবিন্দদাকে বলবে, যেন কেশবপল্লীতে আমার ঘরে গোপনে তোমাকে নিয়ে যান! কিছু কথা আছে।
হরিবাবু দুত চলে গেলেন। রত্নময়ী নেমে এসে জবাফুলের ঝোঁপের পাশে দাঁড়াল। তার গায়ে একখানি সবুজ কাশ্মীরি নকশাদার আলোয়ান জড়ানো। খোঁপা খসে গিয়েছিল। আলতো হাতে বেঁধে আমার দিকে তাকাল। কোটরগত উজ্জ্বল দুটি চোখ। ঈষৎ তীক্ষ্ণ নাক। হরিবাবুর চেহারার সঙ্গে কোনো মিল নেই। বলল, তাহলে আপনি সত্যিই হিন্দু হয়েছেন?
একটু হেসে বললাম, আমি ধর্ম মানি না। নাস্তিক।
সে আমাকে কেমন দুষ্টে দেখছিল। মনে হল, আমার গায়ে আঁচ লাগছে। যেন অপ্রকৃতিস্থ চাহনি। একটু পরে তেমনি অপ্রকৃতিস্থ ভঙ্গিতে বলল, আপনার আব্বা আমার জিনটিকে তাড়াতে পারেনি। মাঝে-মাঝে সে আমাকে বিব্রত করে। আমিও ছাড়ি না।
এবার বললাম, আপনার আরবি উচ্চারণ শুনে মনে হল আপনি আরবি জানেন। কোথায় শিখলেন?
রত্নময়ী হাসল। আমার প্রিয় জিনটির কাছে। তাকে যদি দেখতে চান, কৃষ্ণপুরে যাবেন। আপনার দাওয়াত নেমন্তন্ন) রইল। আপনি ইচ্ছা করলে আমাদের সঙ্গেও যেতে পারেন। আমার পিতাঠাকুর আপনার আব্বার খুব ভক্ত।
সে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলার পর একমুহূর্ত থেমে খাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, বাট হি হিজ এ টির্যাট। দা স্যাটান হিমসেলফ। আই হেট হিম।
ফের স্তম্ভিত হয়ে বললাম, কেন?
হি হ্যাজ কিলড্ মাই মাদার। হি লিভস উইথ এ কনকুইন– ইউ নো, এ বাইজি!
তার হাবভাবে অপ্রকৃতিস্থতা বাড়ছে লক্ষ করে বললাম, আপনি ইংরেজিও চমৎকার বলেন!
আই ওয়াজ টট ইংলিশ বাই অ্যান ইউরেশিয়ান গভরনেস! হার নেম ওয়াজ কেটি –কেটি উডবার্ন। রত্নময়ী প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। ডু ইউ নো হোয়াই শি হ্যাড লেফট দা জব? দা ব্রুট জমিনডার ওয়াস্ অ্যাটেমটেড টু রেপ দা লেডি। আই হেট হিম, হেট হিম! সশব্দে থুথু ফেলল রত্নময়ী।
প্লিজ–
রত্নময়ী তাকাল। পরমুহূর্তে হেসে উঠল।..আমি আরবি ভাষায় বাবাকে গাল দিতাম। এইসব কথাই বলতাম। আপনার আব্বাও এসব শুনেছিলেন। আরবি ভাষায় উপদেশ দিয়েছিলেন, জন্মদাতার কোনো খাতাহ (ত্রুটি) নজর করতে নেই। তাঁর সঙ্গে আমার বাহাস (তর্ক) হয়েছিল। বলেছিলাম, যিনি গর্ভে আমায় ধরেছেন তাঁর বুঝি কোনো মূল্য নেই? জানেন? সে কী বাহাস!
আমিও হাসতে-হাসতে বললাম, আর লোকেরা ভাবল বুঝি আপনার জিনটা—
বাধা দিয়ে রত্নময়ী বলল, জিনটা আছে। তাকে আমি দেখতে পাই। তার সঙ্গে কথা বলি। এই যে দেখছেন, আমি কেমন টিপ পরে সেজেগুজে আছি, কেন? তার সঙ্গে দেখা যে-কৈানো সময় হতে পারে বলে! সে চায়, আমি সুন্দরীটি সেজে থাকি। আমি সেই মেয়ে –দিনকা মোহিনী রাতকা বাঘিনী/ পলক-পলক লোহ চোষে। কিছু বুঝলেন?
হুঁ।
ফাহিম আইয়ু সা’ইন?
সরি। আমি আরবি জানি না।
রত্নময়ী রুষ্টস্বরে ভেংচি কেটে বলল, বলছি–কী বুঝলেন? মুসলমানের ছেলে, পিরের বাচ্চা! বলে –আরবি জানি না!
মুখ গম্ভীর রেখে বললাম, বুঝলাম যে আপনি রাত্তিরে বাঘিনী হয়ে জিনটার রক্ত চুষে খান। কিন্তু বেচারা জিন যে রক্তশূন্য হয়ে মারা পড়বেন!
ডোন্টা জোক উইথ মি।
বিব্রত হয়ে বললাম, সরি ম্যাডাম! তারপর এদিক-ওদিক দ্রুত তাকিয়ে নিলাম। হরিবাবু আর স্বাধীন এক পাগলি জমিদারকন্যার পাল্লায় আমাকে ফেলে দিয়ে কেটে পড়ল। একে কীভাবে সামলাই? সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। গায়ে আলোয়ান নেই। ভীষণ শীত করছে। উত্তরের সভা থেকে উত্তরের হাওয়ায় এখন সমবেত সংগীতধ্বনি ভেসে আসছে।
স্বাধীনবালা এসে বাঁচাল। বলল, মা একেবারে ব্রহ্মস্বাদে আপ্লুত। চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু ঝরছে। আমি ভাবলাম, আলো কোথায় আছে –দিদি খুঁজে পাবেন নাকি ।
সে সোজা ঘরে ঢুকে শলাইকাঠি জ্বেলে লণ্ঠন ধরাল। ডাকল, দিদি। হিম লাগবে। ঘরে আসুন। শফিদা, চলে এসো।
বললাম, চলুন! বড় হিম লাগছে।
কিন্তু রত্নময়ী দাঁড়িয়ে রইল। তখন স্বাধীন এসে তাকে টানতে-টানতে ঘরে নিয়ে গেল। আমি বললাম, চলি খুকু!
স্বাধীন বলল, এসো না বাবা! তোমার এত তাড়া কিসের?
চাদর নেই দেখছ না? শীত করছে।
স্বাধীন তার গা থেকে মোটা তাঁতের চাদরটা ছুঁড়ে দিয়ে বলল, নাও, গায়ে। জড়াও।
চাদরে নারীর ঘ্রাণ! আমার এ কী বোধশক্তি– পঞ্চেন্দ্রিয় কেন এত তীক্ষ্ণ! অস্বস্তি, অথচ মোহাবিষ্ট অবস্থা– আমি আক্রান্ত। এই আচ্ছাদন যেন বাঘিনীর মতো পলকে পলকে আমার রক্ত শুষে নিচ্ছে! ঘরে ঢুকলাম না। দোরগোড়ায়। মাটিতেই বসে পড়লাম, জুতো উঠোনে খুলে রেখে এসেছি। স্বাধীন বলল, ওখানে। কেন? এই মোড়ায় বসো।
বললাম, থাক। আমি প্রকৃতির মানুষ।
রত্নময়ী তাপোশে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আমাকে দেখছিল। স্বাধীন কী বলতে যাচ্ছিল আমাকে, রত্নময়ী বলে উঠল, ওঁকে আমি যা ভয় পাইয়ে দিয়েছি। সে খি খি করে হাসতে লাগল।
স্বাধীন সকৌতুকে বলল, শফিদাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেন! ও কে আপনি জানেন? দুর্দান্ত বাঘ!
রত্নময়ী হঠাৎ মূৰ্ছিত হয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল।…
১৯. স্বাধীন মূর্ছিতা রত্নময়ীর চেতনা
We are the bird’s eggs, flowers, butterflies…
we are leaves of ivy and sprigs of wallflower.
…lilies and roses and peach, we are air.
We are flame… We are Woman and
Nature. And he says he cannot hear us speak.
But we speak.
Woman and Nature- Susan Griffn.
