শফি অবাক হয়ে বলল, কাল্লু পুলিশের চাকরি করছে?
জি হাঁ বাবুসাব! কাল্লু তো ছোটাদেওয়ানসাবকা পাশ নোকরি করত। ছোটদেওয়ানসাব দোবর আগে নোকরি ছোড় কর চলা গেয়া। কান্নুকো উনহি পুলিশকা নোকরি মিলা দিয়া! তো আপনি কোথা থেকে আসতেছেন বাবুসাব?
শফি জবাব না দিয়ে ফিরে চলল। শীতের সন্ধ্যা নিঝুম হয়ে এসেছে। বাজার এলাকায় নৈঃশব্দ। মিটিমিটি আলো, জড়োসড়ো মানুষজন, একটা একা গাড়ি তার প্রায় গা ঘেঁষে চলে গেল এবং কোচোয়ান নিশ্চয় তাকে গাল দিয়ে গেল। রোশনিমহল্লায় পৌঁছে পান্না পেশোয়ারির ঘবটা সে চিনতে পারল। ঘরের সামনে। উঁচু চবুতরা ফাঁকা। কিন্তু ঘরের ভেতর কারা লম্ফ জ্বেলে তাস খেলছে। চত্বরটার সামনে কয়েক মুহঁত দাঁড়িয়ে শফি একটি পুরনো বাস্তবতাকে নিবিড়ভাবে বুঝতে চেষ্টা করল। এইখানে একজন হত্যাকারীর জন্ম হয়েছিল! বাস্তবতাটি রক্তাক্ত এবং শক্তিশালী। শফি চমক উঠল। লক্ষ হাতে অন্য পাশের ঘরের দরজা থেকে কেউ তাকে প্রশ্ন করছে, কৌন হ্ৰয়া খাড়া হ্যায় জি?
এ এক বুড়ি। লোলচর্ম! শফি বলল, এখানে কাল্লু সিপাহির বাড়িটা কোথায়?
বুড়ি গলিতে নেমে বলল, উদেখিয়ে। উও পেড়–দেহড়ি, হাঁ– ওহি কাল্লু সিপাহিকা ঘর।
বাড়িটার সামনে গিয়ে শফি বুঝল, কাল্লুর অবস্থার উন্নতি হয়েছে। দেউড়িওয়ালা একটা বাড়িতে সে আছে। উঠোনে একটা কিসের গাছ। দরজা খোলা, কিন্তু চটের পরদা ঝুলছে। মিয়াঁসাহেব হয়ে গেছে নবারি হাতির সাতমার কাল্লু খাঁ পাঠান। শফি চাপাস্বরে ডাকল, কাল্লু! কাল্লু!
আবছা আঁধারে পায়ের শব্দ হল। তারপর চটের পরদার ফাঁকে একটি ছোট্ট মুখ বেরুল। সেই সময় ভেতর থেকে কেউ বলল, কৌন রি? বোল্ দে, সিপাহিসাব ডিবটিমে হ্যায়। থানেমে যানে বোল্ দে।
‘সিপাহিসাব।’ ওই কণ্ঠস্বর কার? শফি গলা একটু চড়িয়ে বলল, আমি শফিউজ্জামান। সে সিতারার নাম উচ্চারণ করতে পারল না। তার কণ্ঠস্বরে কাঁপন ছিল।
এবার লম্ফের আলো চটের পরদার ওধারে উঁচু থেকে নিচু হয়ে এগিয়ে আসতে-আসতে– কৌন?
শফি। শফিউজ্জামান।
পরদা সরে গেল। লক্ষের আলোয় একটি মুখ, উজ্জ্বল গ্রীবা, বুকে একটি শিশু– প্রশান্ত, কিন্তু নির্লিপ্ত স্ত্রীমুখ। তারপর নীরবতা। তুম– আপ, তারপর আপনি বলেই থেমে যাওয়া।
শফি বলল, চিনতে পারছ না, সিতারা? আমি শফি।
এবার সিপাহিবধূ একটু হাসল। তাজ্জব। তুমি এ কেমন হয়ে গেছ শফিসাব? একদম বাঙালিবাবু। ধুতি-উতি, শার্ট-উট পিন্ধকার– কী হয়েছে তোমার? হা খোদা! কার সাদ্য আছে তোমাকে চিহিবে? আও, আও! অন্দর আও।
শফি চটের পরদা তুলে ঢুকে লম্ফের আলো অনুসবণ করল। সেই সময় দ্রুতদৃষ্টিপাতে বাঁদিকে একটি চালাঘরে গোরু আর ছাগল, ডানদিকে মুরগির দরমা, একপাশে পাতকুয়ো, গোসলখানা আর পায়খানাঘর, লাউগাছের বলিষ্ঠ লতা, পুঁইমাচা, তাবপর সামনে চারটি ধাপের ওপর বারান্দায় দুখানি কুরসি দেখতে পেল। কুরসি জীর্ণ, কিন্তু অভিজাত। কারণ একদা তা মখমলে মোড়া ছিল। মখমলের লালিত্য ক্ষয়ে গেছে। টুটাফাটা অংশ সেলাইকরা। সিতারা, বয়ঠো– বোসো আরামসে বলে একটি কুরসির দিকে ইশারা করল। চোখের সেই দীপ্তি কই? সুরমার টান আছে। কিন্তু দৃষ্টিব্যাপী ধূসরতা। কণ্ঠার হাড় ঠেলে উঠেছে। শফি কুরসিতে বসল। মুহূর্তে অনুমান করল, কাল্লু এগুলি কেল্লাবাড়ি থেকে আত্মসাৎ করেছে। দুখানি ঘর। একখানি ভোলা। ভেতরে তাকিয়ে শফি আবার অবাক হল। নিচু কড়িকাঠ থেকে একটি কাঁচের ঝালরদেওয়া সুন্দর ঝাড়বাতি জ্বলছে। এও কেল্লাবাড়ি থেকে আত্মসাৎ! একটি প্রকাও পালঙ্ক, পুরু গদির ওপর নকশাদার চাদর আর তাকিয়া, ঝুলন্ত কয়েকটি রঙিন সিকের কাঁসা-পেতলের বিবিধ তৈজস। শফি দেখল, বছর তিনেক বয়সের সালোয়ার-কামিজপরা মেয়েটির মুখের আদলে সিতারার অতীত ঐশ্বর্য প্রতিফলিত, সে ঘরের মেঝেয় দু-পা ছড়িয়ে বসল এবং সিতারা তার ছোট্ট উরুর ওপর বুকের ঘুমন্ত শিশুটিকে স্থাপন করল। তারপর লস্ফটির সাহায্যে একটি চৌকোনো সুদৃশ্য ‘লানটিন’ জ্বালল। এও, শফির মনে হল, কেল্লাবাড়ি থেকে আত্মসাৎ। লম্ফটি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে লানটিনটি বারান্দায় এনে সিতারা স্থির ও শান্ত দাঁড়াল। তাকে দেখতে থাকল শফি। পরনে ফিকে নীল কামিজ, শাদা সালোয়ার। শাদা উডনিতে মাথা এবং বুক ঢাকা। তার দুহাতে অনেকগুলি রেশমি চুড়ি, কিন্তু কবজি থেকে দূরে আঁটোভাবে আটকান। তার নাকে প্রকাণ্ড নাকছাবি ঝিলমিল করছে। কানে রুপোর মোটা দুটি ঝুমকো। সেই সিতারা! কিন্তু সেই সিতারা নয়। শান্ত, উদাসীন, নির্লিপ্ত। হঠাৎ শ্বাস ছেড়ে বলল, চায় পিও। তারপোরে কোথা হচ্ছে।
একদিন এমনি সন্ধ্যারাতে সিতারা তাকে চা খাইয়েছিল। কিন্তু সেই সিতারা নয়। শফি বলল, চা খাব না। তুমি বসো।
সিতারা একটু হাসল। …তুমি মেহমান। চায় পিও। নাশতা-উশতা করো। তারপোরে কোথা।
না।
সিতারা তাকাল। আস্তে বলল, কেনো? আমাকে তুমি এখনো নাপসন্দ কর বুঝলাম। তো ঠিক হ্যায়!
শফি হাসবার চেষ্টা করে বলল, সিতারা! তোমার জন্য পান্না পেশোয়ারিকে
জানি। মালুম করেছিলাম। তুমি আমার ইজ্জতরাখনেওয়ালা! আমি কুছু ভুলি নাই। নেভি ভুলোঙ্গি।
শফি চুপ করে রইল। সিতারাও চুপ করে রইল। একটু পরে শফি মুখ তুলে একটু হাসল।… তুমি বলেছিলে, ‘পুরা জওয়ান’ হয়ে তোমার কাছে আসতে। মনে পড়ে? কেন বলেছিল সিতারা?
