ফ্লাওয়ার ভাস দেখেছিলাম বাইরে। ওটাও দিস।আলো এবং গন্ধ চাই আমি।
আকমল হোসেন ওকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিলে ও চিৎকার করে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে যায়। পেছনে যায় মেরিনা। ফুলের সৌরভ আর আলোর শিখা নিয়ে। গুনগুন ধ্বনি ওঠে আয়শা খাতুনের কণ্ঠে। ধ্বনি ছড়াতে থাকে ঘরে–
এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে–
কী উৎসবের লগনে…।
মায়ের কণ্ঠের ধ্বনি শুনে নিজের ঘরে দাঁড়ায় মারুফ। বুঝতে পারে, ধ্বনি ওকে বেদনার অতলে নিয়ে যাচ্ছে–
সব আলোটি তেমন করে ফেললা আমার মুখের পরে…
তুমি আপনি থাকো আলোর পেছনে…।
মারুফ দুহাতে মুখ মোছে। ভাবে, ওর মতো কত শতজন বুঝতে পারছে যে যুদ্ধ মানে প্রেম এবং মৃত্যু। যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে জীবনের নতুন পথ তৈরি হয়। প্রেম ও মৃত্যু পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটে। বোঝার সময় থাকে না কীভাবে মৃত্যু প্রেমকে ঢেকে দেয়। প্রেম কীভাবে মৃত্যুকে ভালোবাসাময় করে দেয়। ওহ্, জেবুন্নেসা। ভেসে আসে গুনগুন ধ্বনি–
প্রেমটি যেদিন জ্বালি হৃদয় গগনে–
কী উৎসবের লগনে–
সব আলো তার কেমন করে–
পড়ে তোমার মুখের পরে–
আমি আপনি পড়ি আলোর পিছনে—
মায়ের গুনগুন ধ্বনি তো ও কত দিন শুনেছে, সেই বুঝে ওঠার বয়স থেকে; কিন্তু মায়ের কণ্ঠস্বর ওর কাছে আজকের মতো এমন তোলপাড় করা মনে হয়নি, এমন শান্তির স্নিগ্ধতায় ভরপুর মনে হয়নি। জীবনকে বিলিয়ে দেওয়ার মগ্নতায় এমন ঐশ্বরিক মনে হয়নি।
বুকভাঙা কান্নায় মারুফ নিজেকে উজাড় করে দিতে থাকে। কখনো পুরো ঘরে হাঁটতে হাঁটতে, কখনো বালিশে মুখ গুঁজে। কখনো দুহাতে চুলের মুঠি ধরে। কখনো জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে, আকাশের কোন তারাটি তুমি হয়েছ, জেবুন্নেসা? কথা ছিল, তুমি-আমি একসঙ্গে যুদ্ধে যাব, কথা ছিল যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে বলব, ফুল ফুটুক না-ফুটুক আজ বসন্ত…
একসময় স্তব্ধ হয়ে যায় মারুফ।
ঘরময় শুধু মৌমাছির গুঞ্জনের মতো মুখরিত হয় গানের ধ্বনি–
এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে।
কী উৎসবের লগনে।।
এখন স্বাধীনতার সময়। জেবুন্নেসা, তোমাকে বলি, তুমি জীবন দিয়ে আমার সামনে মৃত্যুর উৎসব সাজিয়েছ। আমরা মৃত্যুর উৎসব পালন করব। তোমাকে বলি জেবুন্নেসা–
প্রেমটি যেদিন জ্বালি হৃদয় গগনে
কী উৎসবের লগনে
সব আলো তার কেমন করে
পড়ে তোমার মুখের পরে
আমি আপনি পড়ি আলোর পিছনে।।
মোমবাতিটি হাতে তুলে মারুফ ঘরে ঘুরতে ঘুরতে বলে, তুমি আমার আলোর শিখা, জেবুন্নেসা। শহীদের চেতনায় জ্বলে থাকবে আমৃত্যু।
১১. পুলিশ লাইনের ড্রেনের ধারে
রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ড্রেনের ধারে বসে রাবেয়া পরদেশীকে বলে, পাকিস্তানিদের আজাদি দিবসে আকাশে বাংলাদেশের পতাকা দেখেছি। মহল্লার ছেলেমেয়েরা ওই বেলুনটা ধরার জন্য ছোটোছুটি করছিল। বুড়োরা ওদের থামিয়েছে। বলেছে, গুলি খেতে চাস? ওই পতাকার জন্য ছুটতে দেখলে মহল্লার সবাইকে মেরে সাফা করে দেবে। চুপ করে বসে থাক তোরা।
ছেলেমেয়েরা মুখ চুপসে থেমে গিয়েছিল।
বেলুন তো আর কলোনিতে নামেনি। উড়তে উড়তে কোথায় গিয়েছে, কে জানে।
চুপ কর, রাবেয়া।
পরদেশী ওকে মৃদু ধমক দেয়।
কেন চুপ করব, কেন?
দেয়ালেরও কান আছে, জানিস না!
থাকুক। ইচ্ছা করে চিল্লাই। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পুলিশ লাইনের ব্যারাকে যে আজাব চলছে মেয়েগুলোর ওপর, তা কি সহ্য করা যায়! বলল, সহ্য করি কীভাবে! আমি আমার এক জীবনে শত মরণ দেখতে পাচ্ছি। মরণের এত চেহারা দেখে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে।
থাম, রাবেয়া। থাম বলছি। তুই আমাদেরও মরণ ডেকে আনবি। মেয়েদেরকে মিলিটারির কাছে রেখে আমি মরতে চাই না। আমি ওদের দেখব।
ড্রেনের ভেতরে যে ছুরিটা রাখা হয়েছে, তুই তা বের কর।
কাকে দিবি?
নীলুকে। দুই দিন ধরে আমাকে ছুরির জন্য পাগল করে ফেলছে। বলছে, ছুরি না দিলে ও দোতলা থেকে লাফ দেবে।
ব্যাপার কোথায় দাঁড়াবে, বুঝিস তো?
বুঝি, বুঝি। তুই আমাকে এত শেখাতে আসিস না তো, পরদেশী। তোর শাসনে আমি অতিষ্ঠ। এদেরকে রেখে তুই মরবি না। বলিস পাহারা দিবি। কী ছাতুর পাহারা দিচ্ছিস? এটা কোনো পাহারা হলো?
তুই তো বুঝতে পারছিস যে একজনের জন্য সব মেয়েকে ওরা মারবে।
ওরা তো মরেই আছে। ওদের আবার বাঁচা কী? শহরে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ জোরদার হয়েছে। মোনায়েম খানকে মেরে ফেলেছে জেনে আমি খুব খুশি হয়েছি। পেট্রল পাম্প পুড়িয়েছে। রাজাকার মরেছে কতগুলো।
চুপ কর, রাবেয়া। তোর আজকে কী হয়েছে? তুই এত কথা কেন বলছিস? অন্যদিন তো তুই এত কথা বলিস না।
পরদেশী, তোর কি মনে হয় না মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে? বিজয় কত দূর, ভেবে আমি অস্থির হয়ে যাচ্ছি। দেশ যেদিন স্বাধীন হবে, সেদিন আমি এই মেয়েদের নিজের হাতে স্নান করিয়ে একটি করে বকুল ফুল দেব। বলব, দেখো, ফুলের গন্ধে চারদিক ম-ম করছে। তোমরা জোরে জোরে শ্বাস টানো। পরদেশী, আমরা বিজয়ের পথে যাচ্ছি তো?
যাচ্ছি, যাচ্ছি। আর বেশি দিন সময় লাগবে না। আকাশে পতাকা উড়লে অপেক্ষার সময় বেশি থাকে না।
পরদেশী ড্রেনে নেমে ছোট ছুরিটা তুলে এনে লুঙ্গিতে মুছে কচু পাতায় মুড়িয়ে রাবেয়াকে দেয়। রাবেয়া কচু পাতাসহ ছুরিটা ব্লাউজের ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। হাতে কী নিয়ে যাচ্ছে, এটা যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তাহলে কী বলবে ও? ঘাবড়ে গেলে ধরা পড়ে যাবে। সময়টা এখন প্রবলভাবে অবিশ্বাসেরও। নানাভাবে বিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে। তাই ছুরিটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে ব্যারাকে ঢুকতে হবে। কোনোভাবেই ধরা পড়ে সব মাটি করা চলবে না। রাবেয়া ড্রেনের ধার থেকে উঠে পড়ে। নিজের কাপড় ঝেড়েঝুড়ে ঘাসের কুচি ছাড়িয়ে নেয়। ব্যারাকের দিকে পা বাড়ানোর আগে মাটিতে হাত ছুঁইয়ে কপালে ঠেকায়।