শেখ মুজিব তো এবার পাওয়ারে আসবেন মনে হচ্ছে।
অটোনমি পাব তবে?
ওঁর প্রোগ্রাম তো তাই।
আল্লার কাছে দোয়া করি, ভাইসাব। আমি শেখ মুজিবের পক্ষে। তার মত একটা বাঘের বাচ্চা হয় না, আপনাকে এই বলে রাখলাম হক সাহেব। কী বলেন বাবার সাহেব? ঠিক কিনা কেন? অত বড় কলিজাটা কার?
বাবর শেষ চুমুক দিয়ে গেলাশটা খালি করল। সঙ্গে সঙ্গে ভরে দিলেন ফিরোজ মাজমাদার। ঢেলে দিতে দিতে বললেন, এই বলে রাখছি। হক সাহেব, শেখ মুজিব ছাড়া অন্য কারো বাকসে ভোট দেবেন তো আপনার সাথে আর কথা নাই।
নজমুল হক বিকারহীন কষ্ঠে মন্তব্য করলেন, ইলেকশন হয় কি-না দেখেন।
হবে না মানে? ঊরুতে চাপড় দিয়ে উঠলেন ফিরোজ মাজমাদার।
ভাসানীর কথাটা মনে রাখবেন। নজমুল হক তাসের দিকে চোখ রেখে বললেন।
রেখে দিন ভাসানী। অটোনমি চাই। অটোনমি না হলে রক্ষা নাই। আপনার মার্গেও বাঁশ, আমার মার্গেও বাঁশ। বুঝলেন? শেখ সাহেব আছে বলেই দেশটা এখন চোখে দেখেন। কী বলেন ভাইসাব?
বাবর হাসল। বলল, পলিটিকস আমি বুঝি না।
আঃ হা। ফিরোজ মাজমাদার বিরক্ত হয়ে উঠলেন। পলিটিকস না বোঝেন নিজের ভাত কাপড় তো বোঝেন?
চুপ করেন, চুপ করেন। নির্মীলিত চোখে মৃদুকণ্ঠে নজমুল হক বললেন। বলে একটা বিলাসী হাই তুললেন দীর্ঘক্ষণ ধরে। লোকটার অর্ধেক দাঁত নেই, লক্ষ করল বাবর।
নীরব হয়ে গেলেন ফিরোজ মাজমাদার। একটা বড় ঢোক হুইঙ্কি গিলে অনাবিল হাসি সৃষ্টি করে বাবরকে বললেন, রেখে দিন পলিটিকস। শালার ওসব মানুষে আলোচনা করে? সময় নষ্ট। হ্যাঁ ভাইসব, যাবেন শিয়ালবুক্কায়? অ্যাঁ?
বাবর বলল, আসলে কী জানেন, ওসব বাইরে টাইরে আমি কখনো যাই না।
তা যাবেন কেন? আপনার টেলিভিশনে অভাব কী?
ছি, ছি, তা নয়। আরে, ঢাকায় আমিও থাকি। সেদিন দেখলাম এক সুন্দরীর সাথে কাফে আরামে বসে আছেন। বয়সটা কমই দেখলাম। কে?
আমার ভগ্নি।
দুরো সাহেব! বন্ধু-বান্ধবের সাথে মিছে কথা কইতে নাই। প্ৰেম-ট্রেম করেন নাকি?
কী যে বলেন।
তাহলে আর আপত্তি কী? চলুন শিয়ালবুক্কায়।
আপনারাই যান।
বুঝেছি, বুঝেছি, প্ৰেম নাহলে চড়তে মজা লাগে না আপনার।
মনের মধ্যে কোথায় যেন হোঁচট খেল বাবর। ফিরোজ মাজমাদারের কথাটা কি সত্যি? না। যদি হবে তাহলে পাহাড়ি মেয়ের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে শুতে বাধা কী?
লতিফার সঙ্গে তার কীসের সম্পর্ক ছিল? বাবলির সঙ্গে কী সম্পর্ক সে তৈরি করতে চেয়েছিল? জাহেদাকে কেন নিয়ে যাচ্ছে উত্তর বাংলায়। তাদের কাছে তো ঐ একটা বস্তুই সে আশা করে যা শিয়ালবুক্কাতেও পাওয়া যায়। তবে বাধাটা কোথায়?
হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন ফিরোজ মাজমাদার।
কি, ঠিক বলিনি?
বাবর উঠে দাঁড়াল। বলল, আপনি খাওয়া-দাওয়া একটু বেশি করেছেন। আমার আবার কাজ শেষ হয়নি, এক্ষুণি আগ্রাবাদ যেতে হবে। চলি।
বলে সে নিজের ঘরে এসে হুইস্কির হুকুম করল। জামা জুতো খুলতে খুলতে একরোখার মত দুপেগ নীট উজার করে নিঃশ্বাস নিল একটা। তারপর সটান শুয়ে পড়ল বিছানায়। বলল, বেয়ারা, সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় আমাকে জাগিয়ে দিও। আর কেউ আমাকে খোঁজ করলে বলবে সাহেব কামরায় নেই।
১০. রাতের আকাশ
প্লেনে রাতের আকাশ দিয়ে ঢাকায় ফিরতে ফিরতে তার মনে পড়ল আজ দুপুরে পরপর সে কয়েকটা স্বপ্ন দেখেছে। কোনটা আগে কোনটা পরে এখন আর মনে নেই। খুঁটিনাটিও মনে পড়ছে না। কেবল কয়েকটা ছবি।
একটাতে তার বাবা ছাতা মাথায় বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। গালের দাড়ি বেয়ে টপটপ করে ঝরছে বৃষ্টির ধারা। হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, ভিজে গেছে। বাবা ধুতি পরতেন। সে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল কিন্তু বাবা একটা কথাও বললেন না।
আরেকটাতে দেখেছে, তার গলা কেটে কারা যেন ফেলে রেখেছে। তার পাশে চুল খুলে কাদছে অচেনা একটা মেয়ে। পাশ দিয়ে শেখ মুজিব যাচ্ছিলেন। তার পা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কী যেন বলতে লাগল সে। শেখ একবার চোখের ওপর হাত রেখে নাবিকের ভঙ্গিতে আকাশ দেখলেন, তারপর ধীরপায়ে চলে গেলেন কুয়াশার মধ্যে।
একটা স্বপ্ন–তার গাড়ির কাচ ভাঙ্গা। একেবারে খোলা। হু হু করে। বাতাস আসছে ঠেলে। কিছুতেই গাড়ি চালানো যাচ্ছে না।
আরো অনেক কিছু দেখেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।
হ্যাঁ, একটা মনে হয়েছে।
চিড়িয়াখানায় একটা রোগা সিংহ খুব ল্যাজ খাড়া করে খাঁচার মধ্যে এপাক ওপাক করছে। সিংহের চেহারাটা অবিকল কাজী সাহেবের মত। আর বাবর তাকে একটা মৰ্তমান কলা সাধছে খাবার জন্যে। কিন্তু সিংহ সেদিকে ভ্ৰক্ষেপ পর্যন্ত করছে না।
আরেকটা স্বপ্ন— বাবর ক্রমাগত এ-আকাশ ছেড়ে ও-আকাশে, আকাশের পর আকাশ উড়ে যাচ্ছে। আকাশটা মেঘহীন।
দয়া করে আপনাদের সিট বেল্টগুলো বেঁধে নিন।
কোমরে হাত দিয়ে বাবর দেখল সেই যে উঠার সময় বেঁধেছিল, আর খোলা হয়নি। সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলল সে। এক গ্লাশ পানি চেয়ে খেল।
নিচে ঢাকার আলো দেখা যাচ্ছে। ছেলেবেলার জোনাক জ্বলা বনের মত। মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?
যাবার সময় এয়ারপোর্টে গাড়িটা রেখে গিয়েছিল। এখন রাত দশটায় একেবারে একাকী দাঁড়িয়ে আছে। অবিকল আমার মত–ভাবল বাবর। গাড়িটার হাতলে সস্নেহে হাত রাখল সে।
তারপর ইচ্ছে করে জাহেদাদের কলেজের সমুখ দিয়ে দুএকটা জানালায় জ্বলা বাতির দিকে তাকাতে তাকাতে বাড়ি ফিরল বাবর।
বাড়ি ফিরে নিজেকে বড় ক্লান্ত, ব্যয়িত কিন্তু ক্ষুব্ধ মনে হলো বাবরের। চোখের ভেতরে জ্বলজ্বল করতে লাগল ফিরতি পথে দেখা জাহেদার হোস্টেলের জানালায় তীব্ৰ আলোর আয়তক্ষেত্রগুলো।
