মার্সেলেস বন্দরে জাহাজ ধরা আমাদের মধুগঞ্জের বাজার ঘাটে নৌকো ধরার মতো। সেখানে দুনিয়ার জাত-বেজাতের জাহাজ–এমন কী গ্রীক, মিশরী, তুর্কী পর্যন্ত-খেয়া নৌকোর মতো বসে থাকে এবং সেখানে দিব্যি দরদস্তুর করা যায়, কত দামে তোমাকে ভূমধ্যসাগরের খেয়া পার করে পোর্ট সঈদে নিয়ে যাবে–মধুগঞ্জের ঘাটে যেরকম দর কষাকষি করি। মার্সেলেসে ভারতবগামী বড় জাহাজ না পেলে পোর্ট সঈদে গিয়ে সেখানে থেকে আনায়াসে অন্য জাহাজ ধরা যায়–ঐ খাড়ি দিয়েই তো সব জাহাজকে বোম্বাই, কলম্ব যেতে হয়।
আমাদের কপাল ভালো না মন্দ বলতে পারব না; কোনো ভালো ব্যবস্থাই করতে পারলুম না। শেষটায় একটা মাল-জাহাজ জুটে গেল, সেটাই দেখলুম হিন্দুস্থান পৌঁছবে সক্কলের আগে, কারণ ছাড়বে ঘণ্টা তিনেক পরেই। তবে অসুবিধে এই যে, আমাদের নিজেদের জন্য কোনো কেবিন আর তাতে খালি নেই। আমাকে ঢুকতে হবে একটা পুরুষদের কেবিনে, আর মেবল্কে একটা মেয়েদের। একেবারে ভারতীয় ব্যবস্থা মানা জানান।
মেব্ল্ খুঁতখুঁত করেছিল।
আমি হেসে বলেছিলাম, যে দেশে যাচ্ছ সেখানে ঠিক এই ব্যবস্থা। বিলেতে স্মোকিং, নন-স্মোকিং। ওদেশে লেডিজ এবং জেন্টলমেন।
আমার মনে হয়েছিল, ভালোই হ’লতাড়াতাড়ির কী।
ছোট জাহাজের এক কোণে, নিভৃতে, গুটানো দড়াদড়ির মাঝখানে আমরা দুজনায় পাশাপাশি বসতুম। সমুদ্রের উদ্দাম হাওয়া মেবলের চুলনিয়ে হুলস্থূল বাধাত, কখনো খানিকটে, নোনা জলের সূক্ষ্ম কণা তার গালে চুমু খেয়ে যেত, কখনো বা সমুদ্রের চাঁদের জোরালো আলো এসে তার মুখ অদ্ভুত দীপ্তিতে উজ্জ্বল করে তুলত। রাত একটা, দুটো, তিনটে বেজে যেত। একে অন্যের অবিচ্ছিন্ন সঙ্গসুখ বর্জন করে কেউই আপন কেবিনে যেতে রাজি হতুম না। কী হবে কেবিনে গিয়ে। সেখানে তো শুধু ঘুমের অন্ধকারে ডুবে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি নেই। এখানে সমুদ্র আকাশ, আলো-অন্ধকার, চন্দ্র তারা তাদের কত অফুরন্ত সৌন্দর্য রাত্রির পর রাত্রি উছলে ঢেলে দিচ্ছে। কেউ দেখবার নেই। এই বিরাট সমুদ্রের ক ইঞ্চি জায়গা জুড়ে আছে কখানা জাহাজ? এবং সেই কটি জাহাজে সুষুপ্তিতে নিমগ্ন না হয়ে এ সৌন্দর্য পান করছে কটি নর-নারী? আমিও এ সৌন্দর্য এ রকমভাবে তার পরিপূর্ণরূপে, ক্রমবর্ধমান গতিতে আগে কখনো দেখিনি। এর পূর্বে যে একবার এসেছি গিয়েছি। তখন বেশির ভাগ সময় কেটেছে লাউঞ্জে তাস খেলে, বারে হুইস্কি খেয়ে কিম্বা কেবিনে নাক ডাকিয়ে। বার থেকে শেষ গ্লাস খেয়ে কেবিনে যাবার সময় ডেকে দাঁড়িয়ে হয়তো দু-পাঁচ মিনিটের জন্য টুরিস্টদের মতো ও, হই গ্রাও বলেছি। পাকা ইংরেজ পাঁচজনের সামনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকক্ষণ দরে দেখবার সাহস ধরে না-পাছে লোকে ভাবে লোকটা হয়তো কবি। ওয়াট? দ্যাট চ্যাপি পোয়েমস? গশ। ওয়া (ট) ফ (র)! মাই গিনেস্ (গুডনেস)! তার উপর আমি অব অল পার্স পুলিশের লোক?
আমরা জাহাজে উঠেছিলুম কৃষ্ণা এয়োদশীতে আর বোম্বাইয়ে নামি পূর্ণিমাতে।
এখানে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল, সোম, কিছু মনে কোরো না, সেটা যদি উল্লেখ করি। এর সঙ্গে আমার মূল বক্তব্যের কোনো যোগ নেই। তোমার মনে আছে। কিনা জানিনে, মধুগঞ্জে তোমার সঙ্গে পরিচয়ের দুদিন পরেই তুমি কথায় কথায় বলেছিলে, পরশু তো পূর্ণিমা সমস্ত রাত নৌকো বাওয়া যাবে। আমি তখন কিছু বলিনি। পরে দেখলুম, শুধু তুমি না, তোমাদের দেশের আর সবাইও চাঁদের বাড়া-কমা সম্বন্ধে সব সময়ই সচেতন। আমরা কেন অচেতন থাকি তার কারণ আমাদের দেশে বারো মাস যে কোনো রাত্রে বৃষ্টি, ঝড় হতে পারে, শীতকালে বরফ, আর কুয়াশা তো লেগেই আছে। চার শ পঁয়ষটি দিন ইচ্ছে করেই চার শ বললুম। ওখানে কে হিসেব রাখে চাঁদ রাতের বেলায় কখন যায়, কখন আসে, মাজাঘষা কাসার থালার মতো ঝকঝক করে, না নকনে কাটা নখের মতো আকাশ থেকে কেটে পড়ে গাছের ডগায় আটকে থাকে।
ভারতবর্ষে চাঁদকে না চিনে মফস্বলে কোন পুলিশ ঠিকঠিক কাজ করতে পারে? পূর্ণিমাতে চুরির এলাকায় মোতায়েন করলে আধা ডজন পুলিশ, অমাবস্যায় তিনটে! একমাত্র বর্ষাকালেই আগেভাগেই কিছু ঠিক করা যায় না। বিলেতে বারোমাস তাই।
কিন্তু আমি চাঁদকে সত্যি চিনতে শিখলুম জাহাজে, মেলের সঙ্গে। কৃষ্ণা এয়োদশীতে চাঁদ কখন ওঠেন, কতখানি কাত হয়ে ওঠেন আর শুকা সপ্তমতে চাঁদ কখন অস্ত যান, এদিকে কাত হয়ে না ওদিকে কাত হয়ে সে আমি ভালো করে জানলুম জাহাজে, ডেক চেয়ারে, মেবলের গাঁ ঘেঁষে। ক্লান্তিতে সে বেচারী ঘুমিয়ে পড়ত, তবু কেবিনে ঘুমতে যাবে না। আমি ডেক চেয়ারে ঘুমুতে পারিনি। তাতে কিন্তু আমার কোনো ক্ষোভ ছিল না।
.
১৭ই আগস্ট
ইয়োরোপীয়দের সঙ্গে প্রাচ্যের প্রথম পরিচয় হয় পোর্ট সঈদে।
পোর্ট সঈদের সঙ্গে গোটা মিশরের অতি অল্পই যোগসুত্র। তাই পোর্ট সঈদ দেখে মিশর সম্বন্ধে রায় প্রকাশ ভুল। ও-শহরটা জন্মেছে এবং বেঁচে আছে জাহাজ-যাত্রীদের কল্যাণে। এবং জাহাজে যে রকম বহু যাত্রী কাণ্ডজ্ঞানবর্জিত হয়ে নব নব উল্লাস উত্তেজনার সন্ধান করে, এখানেও ঠিক তাই। বরঞ্চ বলব বেশী। বরঞ্চ বলব, জাহাজে তুমি কী করলে না করলে তার সন্ধান তবু কেউ কেউ পেয়ে যেতে পারে, এখানে সে বালাই-ই নেই। এখানে তুমি ঘণ্টা পাঁচেক কী করে কাটালে, তার খবর জানবে কে? দেশৰমণ বড় ভাল জিনিস–তার একসসট পাইপ দিয়ে মেলা পাপ বেরিয়ে যায়।
