সকালে যি হাওয়া বইতে শুরু হয়েছিল, তার জোর কেরমে কেরূমে বাড়ছে দেখছি। কুদিকের হাওয়া কিছুই বোঝলম না। শুদু দেখলম, অমন সোজা-চাদর ঝুলননা বিষ্টি একদিকে হেলে রয়েছে। তাপর হঠাৎ এমন একটো বিষ্টির ছাঁট এসে আমার চোখে-মুখে লাগল যি আমি কাত হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লম, পরনের কাপড় সাথে সাথে ভিজে চুবচুবে হয়ে গেল। ই আবার কেমন বাতাস ভাবছি আর ত্যাকুনি আর একটো ঝাপট এসে লাগল। আগেরটোর চাইতে জোর বেশি এটোর।
এই অরম্ব হয়ে গেল! হাওয়া মাতালের মতুন করতে লাগল, কুনো ঠিক-ঠিকানা নাই, একবার ইদিক থেকে তো আর একবার উদিক থেকে। তাপর দেখি, উত্তর-দখিন-পুব-পচ্চিম হাওয়ার গতিক কিছুই ঠিক নাই। আর সি কি জোর আর শোঁ শোঁ আওয়াজ! গদগদিয়ে আজ টানা ছ-দিন ধরে যি বিষ্টি হচে, সেই বিষ্টি অ্যাকন ছিড়ে ছিড়ে যেচে, গায়ে এসে সুইয়ের মতুন বিধছে। কখনো দেখছি এলোমেলো হাওয়ার চোটে ধুমোর মতুন উড়ে যেচে। গত কদিন ধরে গাঁয়ের সব মাটির বাড়ি খালি বিষ্টিতে ভিজেছে, এইবার এই হাওয়ায় আর একটোও খাড়া থাকতে পারবে না, সব মাটিতে মিশে যাবে। মল্লিকদের ন্যাংটো বাড়িটো কাল একবার দেখেছি, এইবার গোটা গাঁ-টো ন্যাংটো হবে। খোলা আসমানের তলায় থাকবে সারা গাঁয়ের মানুষ, ছেলে-বুড়ো মেয়ে-পুরুষ সব। ত্যাকন মওত আসতে দেরি হলেই রাগ লাগবে!
আমি একা বসে আছি, আশেপাশে কেউ নাই, ছেলেপুলেদের চ্যাঁ-ভ্যাঁ নাই। বাড়িতে কেউ এখনো ওঠেই নাই। কদিন থেকে শুদু আমিই রাত থাকতে বিছেনা ছেড়ে উঠছি আর একা একা এখানে এসে বসে থাকছি, মনে হচে দুনিয়া শ্যাষ হবে। ত্যাকন মনে হতে লাগল আমার ই দুনিয়ায় আর কেউ নাই, এইবার দম বন্ধ হয়ে মরে যাব।
এই কদিন কেউ সুয্যির মুখ দেখতে পায় নাই, সকাল-দোপরবৈকাল কখন আসছে কখন যেচে কারুর বোঝার উপয় নাই। ছেলেপুলের মুখ শুকনো, কেউ একটি কথা বলছে না, যা জুটছে তা-ই খেচে, কুনো হুজ্জোতি নাই। বড়রা আর কি করবে? বুকের সাথে হেঁটো লাগিয়ে সব ঢিপ ঢিপ বসে আসমানের দিকে চেয়ে আছে।
দোপরের দিকে মনে হলো বিষ্টিটো কমে আসছে আর বাতাসটো বাড়ছে। বাতাসের য্যাতো জোর বাড়ছে তাতে সি মাথাপাগলের মতুন করছে। বিষ্টিকে তাড়িয়ে একবার ইদিকে নিয়ে যেচে, একবার উদিকে নিয়ে যেচে। এই করতে করতে শ্যাষে বিষ্টিটো একদম থামল, অ্যাকন খালি বাতাস। হোক বাতাস, বিষ্টিটো তো থামল! এই ছ-দিন ছ-রাত বোধায় একবারও থামে নাই। গাঁয়ের সব পুকুর ডোবা, নামো জায়গা পানিতে ভরা; রাস্তায় একহাঁটু করে পানি। আর একদিন অমনি বিষ্টি হলে এই শুকনো দ্যাশের লোক তো সব ডুবেই মরে যেত। যাক বাবা বিষ্টিটো তত থামল। বাতাস আর কতোক্ষণ থাকবে, সাঁঝ আসতে না আসতেই ওর জোর চলে যাবে। ননদ বললে, নোহ আলাইহি সাল্লামের সোমায় একবার পেরায় কেয়ামত হয়েছিল, জাহাজে যারা জায়গা পেয়েছিল শুদু তারাই বেঁচেছিল, ইবারের যা বেপার তাতে এই পৃথিবীর জাহাজে কেউ বাঁচবে না গো! দ্যাওররা বললে, বিশেষ যি দ্যাওর চাষবাস নিয়ে থাকে, আসমান-জমিনের খবর রাখে, সে বললে, এমন অসময়ে এত পানি কুনোদিন দেখি নাই। এদিকে সব মাটির বাড়ি, দুদ্দাড় পড়ছে, বৈকালের মধ্যে গাঁয়ের আদ্দেক বাড়ি পড়ে যাবে। এ তল্লাটের সব গাঁয়েই এরকম হবে। তা নিয়ে আমি ভাবছি না। ভাবছি, ধান তো সব তলিয়ে গিয়েছে। ফুলনো ধান, শীষ খালি আসতে লেগেছে, এই অবস্থায় ধান চার-পাঁচ দিন পানির তলায়! ও কি আর আছে? পচে-হেজে নষ্ট হয়ে গিয়েছে সব ধান। নতুন করে আর রোয়ারও কুনো কথা নাই। কি ভায়ানক মাগন যে লাগবে তাই ভাবছি।
বাতাসের জোর বাড়তেই লাগল। সাঁঝ লাগতে লাগতে শোনলম গাঁয়ের আরও অনেক বাড়ি পড়ে গেয়েছে। লোকের দুর্দশার শ্যাব। নাই, অ্যানেক বাড়িতে রাঁধা-খাওয়া বন্ধ। চাল-চুলো, কাঠ-খ্যাড়, আটা-চাল কিছুই নাই! আমাদের বাড়ির লোক সব বাড়িতেই রয়েছে। কত্তাও বাড়িতে, তা সে তো আর বাড়ির ভেতরে আসবে না, পরচালিতে লোহার চেয়ারে ঠেসান দিয়ে চুপ করে বসে আছে। তার কোট-কাছারি নাই, ভোটে হেরে গেয়েছে, হিঁদুপাড়ার গিরে দায়ের কাছে। কত্তার ঘাড়ের কোঁকড়ানো চুল অ্যাকন চাছা। কথা খুব কম বলে।
সাঁঝবেলায় আবার বাড়িতে কেউ নাই। সব নিজের নিজের জায়গায়। আমি আর ননদ বসে আছি। কুনোমতে একটো পিদিম জ্বালিয়ে গিন্নির ঘরে দিয়ে এয়েছি। বিছেনায় গিন্নি মরার মতুন পড়ে আছে। শ্বাস বইছে, না, বন্ধ হয়ে গেয়েছে বুঝতে পারা যায় না। কথা বলতে পারলেও গিন্নি আজকাল কথা একদম বলে না। আমরা ঘরের ভিজে উসারায় বসে বসে সাঁঝ নামতে দেখছি। চারপাশের সব গাছের মাথা যেন ছিড়ে পড়ছে। বাড়ির মিশমিশে কালো লম্বা তালগাছদুটো এমন করে দুলছে যেন আকাশপেমান দুই লম্বা ভূত মাথা ঝাকিয়ে। নাচছে। পুকুরপাড়ের তেঁতুলগাছের ডালপালার আঁদারের ভেতর থেকে কালো কি একটা ঝাঁক উড়ে আসছে দেখলম। কালো ফুটি ফুটি এক ঝাক পোকা। কাছে আসতে দেখি, ওমা পোকা নয়, এক ঝক বাদুড়। এত বাদুড় একসাথে কুনোদিন দেখি নাই। আমার গা ছমছম করে উঠল।
সেই রেতে দুই ছেলে নিয়ে আঁদার ঘরে শুয়ে আছি। কত্তার এতদিনের অব্যেস আলো থাকতে হবে, তবু আলো জ্বালাতে পারি নাই ঘরে। আঁদার ঘরে দুই ছেলের নিশ্বেসের আওয়াজ পাওয়া যেচে। বড়টো কাছে নাই, মেয়েটো বড় হয়েছে, সে ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে থাকে না, থাকে ননদের কাছে।
