মাটিতে বিছেনা পেতে একটু দূরে চাদর দিয়ে গা-মাথা ঢেকে কত্তা শুয়ে আছে ঠিক মরা মানুষের মতুন। আমি জানি একটি কথা বলবে না, ঐ মানুষ ঠিক যেন পাথরের মুত্তি। শুয়ে শুয়ে শুদু বাতাসের আওয়াজ শুনতে লাগলম। হু হু করে একটানা বয়ে যাওয়া বাতাস তো লয়, সি তো অ্যানেক শুনেছি–ই বাতাস যেন মদ খেয়ে এয়েছে, আসছে যেন আর একটা দুনিয়া থেকে। সিখানে আটকানো ছিল, অ্যাকন ছাড়া পেয়ে খালি আসছে, আসছে, আসার রাস্তার কুনো ঠিক-ঠিকানা নাই, মাঠ-ঘাট ভেঙে আসছেই। কতোরকম শব্দ যি হচে তার শ্যাষ নাই–বড় গাছের ডাল ভাঙার শব্দ, টিনের চালের কাঁ-কে করে কাঁদনের আওয়াজ–সব আছে। শুদু কুনো জ্যান্ত পেরানির আওয়াজ নাই।
য্যাতো রাত গড়িয়ে ভোরের দিকে যেচে, আওয়াজ-ও যেন ত্যাতোই বাড়ছে। তবে কি এইবার ঝড় অরম্ব হবে? এমন লাগছে ক্যানে? একবার কি উঠে বাইরে যেয়ে আকাশটো দেখব? চোখে ঘুম তো এক ফোটাও নাই। বাইরে যাব বলে বিছেনা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি, ঠিক যেন পাথরের মুক্তির মতুন কত্তা কথা কয়ে উঠল, বাইরে যেয়ো না। এই কথাকটি বলে পাথর যেমন পাথর ছিল তেমনিই পাথর হয়ে গেল। চুপ করে আবার শুয়ে পড়লম।
ভোরবেলা থেকে শুনতে প্যালম আর-এক রকম আওয়াজ। সি বাতাসের আওয়াজ লয়, ম্যাঘ ডাকার আওয়াজও লয়। কেমন এক হড়াম হড়াম দুরদুর হড়হড় আওয়াজ। অনেকক্ষণ ধরে এইরকম শুনছি আর ভাবছি ই কি ভূঁইকম্পের আওয়াজ, না আর কিছু? কাছে লয়, অ্যানেক দূর থেকে আসছে, একবার মনে হচে মাটির তলা থেকে, একবার মনে হচে আসমান থেকে। বাতাসই বোধায় তাকে ইদিক-ঊদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে যেচে। খানিকক্ষণ ধরে শুনতে শুনতে আমার মাথাটোও যেন বিগড়ে গেল–কার ঘর, কার বাড়ি, কে ছেলে, কে মেয়ে কিছুই বুঝতে পারছি না। এমন সোমায় পাথরের মুত্তি আর একবার কথা বলে উঠল, জোলের মাঠ থেকে পানি নেমে যাচ্ছে।
আঁদার আঁদার ঘরে চাদর-ঢাকা মানুষটো থির হয়ে শুয়ে আছে। মোটা চাদরের তলা থেকে কথা বলে উঠল এমন করে যি আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তা হবে, পানি নেমে যাবার আওয়াজই বটে। আমার মনে হতে লাগল, কুন্ দুনিয়া থেকে দানোরা এসে পানির রাজত্বে দাপিয়ে বেড়াইছে, হটর হটর করে হাঁটছে, ঢাক বাজানোর মতুন বুক চাপড়াইছে। আওয়াজ শুনি আর কেঁপে কেঁপে উঠি। ইদিকের এইসব তেপান্তরের মাঠ আর সেই সব মাঠভরা পানি। পানির সমুদুর, কুনোদিকে কূলকিনারা নাই। আসমানের সব পানি দুনিয়ায় ঢালা হয়ে গেয়েছে, অ্যাকন এত পানি নেমে কোথা যাবে? কোথা জায়গা হবে? বাতাসও বাড়ছে, পানিকে সি-ও থির থাকতে দেবে না, মাঠ থেকে চেঁছেপুছে ঠেলে নদীতে ফেলবে।
সাত দিন বাদে, আজ সকালে দেখলম সারা আকাশ ধোয়া তকতক করছে। মনে হচে কোথাও একটুকুনি ধুলো-বালি নাই। সাত দিনের কালো ময়লা আকাশ অ্যাকন নামোয় এসে দুনিয়াটোকেই কালো ময়লা চিটচিটে করে দিয়েছে। অ্যাকন এই দুনিয়া সাফ হবে কি করে? কোথাও একটুও শুকনো জায়গা নাই, সারা গায়ে একহাঁটু করে কাদা, ঘরদুয়োরের মাটি ভেজা, ঘরের মেঝে ভিজে স্যাতসেঁতে। ঠান্ডায়, জোর হাওয়ায় কাপুনি লেগে যেচে।
সকাল থেকে কাজকম্মে আছি–যখুনি একটু হাত খালি হয়, একটু একা হই, তখুনি শুনতে পাই হড় হড়, হুড় হুড় আওয়াজ। পানি নামছেই, নামছেই। আঁদার ভোররেতে য্যাতো ভয় লেগেছিল, অ্যাকন আর ওরকম লাগছে না। খালি মনে হচে, এই আওয়াজ আর সইতে পারছি না। পানির ভারে দুনিয়া হাঁসফাস করছে, নিশ্বেস নিতে পারছে না। মনে হচে আমিও নিখেস নিতে পারছি না। কবে আবার দুনিয়ার ভালো শ্বাস হবে, থির হবে পিথিমি, অ্যাকন কোথাও কুনো পাখি দেখছি না, কবে আবার পাখ-পাখালি ফিরে আসবে, এই ভায়ানক হাওয়াটো থামবে, অমন করে হাওয়া মাথাপাগলের মতুন করবে না?
বিষ্টিটো থেমেছে বটে, রোদও উঠেছে কিন্তুক হাওয়ার জোর থামল না। সব পানি না সরিয়ে সে থামবে না। গাঁয়ের পুবদিকের ঢালু দিয়ে পানি নেমে যেচে। ইদিকের মাঠ-ঘাট সব পুব-উত্তরে কাত। সিদিকে সব বড় বড় নদী আছে। বাতাস পানিকে তাড়িয়ে সিদিকেই নিয়ে যেচে।
তিন দিন পরে, দশ দিনের মাথায় এই কেয়ামত শ্যাষ হলো। বিষ্টি গেল, হাওয়া গেল, আসমান আবার নীলবন্ন হলো, সোনাবন্ন রোদ হলো–সব হলো! সেজ দ্যাওর, ল-দাওর যারা চাষবাস নিয়ে থাকে, তারা দুজনে একদিন বাড়ি এসে কপাল চাপড়ে বললে, মাঠে কিছু নাই, কিছু নাই, একটি দানা মিলবে না কারুর।
২৪. দুনিয়ায় আর থাকা লয়, গিন্নি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল
ল-দ্যাওর সব কথা বেশ ভালো করে বলতে পারে। দশ দিনের বাদলঝড়-হাওয়া থেমে গেলে মাঠ দেখে এসে সে বলেছিল, সারামাঠে একটি দানা ফলবে না, একটি ধানের শীষও টিকবে না। তার কথাই সত্যি হলো। আজ ননদকে সাক্ষী রেখে সে বললে, মাঠের সব পানি নেমে গেলে মাঠ দেখে বলেছেলম না যি, ইবার আর মাঠে আমন ধানের কোনো গন্ধ নাই, এক কাঠা ধানও কেউ পাবে না? বলি নাই? জমির কাছে গেলেই আমরা বুঝতে পারি, তাতে নিশেস আছে, না নাই! জমির অসুখ-বিসুখ আছে, নিশ্বেসের কম-বেশি আছে, মরতে মরতে মরে পাথর হয়ে যাওয়া আছে–জমি যে না চেনে, সে কি তা বুঝতে পারবে? তখুনি বুঝেছেলম আমরা, মাঠকে মাঠ একদম কালা ঠান্ডা। কালো কাদা বার করা জমি। তার ওপরে সরু সরু বগরোঁয়ার মতুন সব ধানের চারা যা আছে, দু-দিন বাদেই শুকিয়ে যাবে।
