কতক্ষণ থেকে গালে হাত দিয়ে বসে আছি। কি যে ভাবছি আর কি যে দেখছি কে জানে? পানি হওয়া বটে? অ্যাকন মনে হচে এত বিষ্টি জেবনে দেখি নাই। পাঁচ দিন পাঁচ রাত-থির বিষ্টি হয়ে যেচে! আসমানের সেই এক আমানির মতুন রঙ–কম-বেশি নাই। একবার যেন কতো দূরে, অ্যানেক দূরে, গুড়গুড় করে আওয়াজ উঠল। বিষ্টি আর একটু ঘন হলো। বাড়ির পুব-উত্তর দিকের মাটির পাঁচিরের খ্যাড়ের ছাউনি পচে গলে গেয়েছে, এইবার মাটিই গলছে। দু-তিন হাত পাঁচির এর মদ্যেই গলে গেয়েছে। পাঁচিরের ওপর দিয়ে দেখতে পেচি খিড়কির পুকুরটো ভেসে চারদিক দিয়ে পানি উপচিয়ে পড়ছে। এইবার বাড়িতেও পানি ঢুকবে। ঐদিকে সবকটো পুকুর একটো পুকুর হয়ে গেয়েছে। পুকুরগুনোর সাথে মাঠ এক লাগোটা হয়ে গেয়েছে। সব একদম শাদা। বসে বসে দেখছি, বাড়িরই চারপাশের পাঁচির অ্যাকন গলে গলে পড়ছে, বাড়ি ইবার বে-আব্রু হয়ে পড়বে। তাপর হয়তো মাটির ঘরগুনো দুদ্দাড় করে পড়ে যাবে। ভয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল।
বিষ্টি এইবার আরও ঘন হয়ে এল। এখন চোখের দিষ্টি বেশি দূর যেচে না। পাঁচ হাত দূরের জিনিশটো যি কি তা ঠিক বোঝা যেচে না। বাড়িতে কতো জিনিশই তো ইদিক-উদিক ছড়ানো থাকে, খেয়ালও হয় না। অ্যাকন বসে বসে ভাবছি ওটো কি জিনিশ, ওটো একটো ঝুড়ি, ঐটো কি, একটা কালো ভাঙা হাঁড়ি, আতাগাছের তলায় ওটো কি তেঁতুলগাছের শক্ত গুঁড়িটো? এই করতে করতে যেখানে কিছুই নাই, সেখানেও অ্যানেক জিনিশ দেখতে প্যালম। সি সবই যেন পানি দিয়ে তৈরি। তৈরি হয়েই আবার ভেঙে বেচে। একবার যেন মনে হলো খিড়কি-পুকুরের কোণের বাড়ি থেকে পানি দিয়ে তৈরি একটো মেয়ে বেরিয়ে এল। পানির ভেতর দিয়ে ছপ ছপ করে হাঁটছে। আমাদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে। কিন্তুক সে বাড়ির ভেতরে ঢুকল কিনা বুঝতে পারলম না। খালি ঝমঝম করে পানি হচে, সেই আওয়াজই শুনতে প্যালম। একটু বাদে ফের দ্যাখলম কে যেন হেঁশেল থেকে বেরিয়ে যেচে। না, ইবার আর বেভ্রম লয়। অবশ্যি এত পানি হচে যি মনে হচে আমার চারদিকে শাদা চাদর টাঙানো, তার আড়ালে সব ঢাকা পড়েছে। তবু ঠিক দেখলম একটো মানুষ হেঁশেল থেকে বেরিয়ে এসে এগনেয় নামার আগে উসারার খুঁটির কাছে এসে দাঁড়াইলে। তাপর যেমন সে পা বাড়িয়েছে এনেয় নামবে বলে, আমি অমনি ঐ মাহা বিষ্টির মদ্যে ভিজে শুটিয়ে যেয়ে তাকে ধরলম।
হ্যাঁ, খিড়কির কোণের বাড়ির আলিই বটে। বিয়ে হয় নাই, এক বুড়ি দাদি ছাড়া এই দুনিয়ায় আর কেউ নাই তার। ভেজা জবজবে মোটা একটো চট বুক থেকে পা পয্যন্ত ডান হাত দিয়ে ধরে আছে। খেতে পায় না, তবু এত বড় বড় দুটো বুক ক্যানে যি তার, কি কাজে লাগবে আল্লা জানে! অমন করে চটটো হাত দিয়ে ধরে আছে। মেয়েমানুষের শরম বাঁচাইতে কিন্তুক তবু ঢাকা পড়ে নাই ঐ পব্বতের মতুন বুক। বাঁ হাতে মাটির শানকি-ভরা বাসি ভাত, তার আদ্দেক গলা। এক শানকি ভাত। হেঁশেলে ভাতের হাঁড়িতে গত রেতের পানি দেওয়া ভাত যা ছিল তা বোধায় সবটাই নিয়েছে শানকি ভরে।
আমরা দুজনা মুখোমুখি তাকিয়ে থাকলম। উঃ, মেয়ের দু-চোখের জমিন কি শাদা! ধলিবগের পালকের মতুন ধবধবে শাদা। বোঝাই যেচে চট দিয়ে শুদু শরীলের ছামনেটাই ঢেকেছে সে, ঘাড়-পিঠপাছা-কোমর উদোম। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলম। একটি কথা বলতে পারলম না। দুনিয়ায় অ্যাকন খালি সকাল হয়েছে। সারাদিন বাকি, অ্যানেক বাকি, অ্যানেক বাকি। বুকের ধুকপুকুনি কিছুতেই থামে না। কতক্ষণ বাদে আলি ফিসফিস করে বললে, তিনদিন তিনরাত কিছুই খাই নাই, দাদি ঘরেই আছে, বোধায় আজ মরতে পারে। আমি শুদু কোনোরকমে বললম, দাঁড়া। এই কথা বলে হেঁশেলে ঢুকে কি এক ভায়ানক রাগে একটো মাটির হাঁড়িতে থাবা থাবা চাল তুলে একদম ভত্তি করে উসারায় বেরিয়ে অ্যালম।
শানকি হাঁড়ির মুখে ঢাকা দে। চালটো ভেজাস না। যা–
কুনো কথা না বলে আলি পানিতে নামল। অ্যাকন আর চট দিয়ে কি হবে, মেয়েমানুষের গোটাটোই অ্যাকন উদোম! তা কি হবে, যে খুশি দেখুক। সে নেমে গেলে আমি পেছন থেকে বললম, তোদের চুলোয় আগুন আছে? থাকলে আমাদের একটু দিস। ক্যানে যে ইকথা বললম কে জানে। বলতে মন হলো তা-ই বললম।
তার পরদিন থেকে হাওয়া বইতে লাগল। এই কদিন একনাগাড়ে খালি বিষ্টি হয়েছে। একফোটা বাতাস ছিল না। আজ সকাল থেকে হাওয়া অরম্ব হলো। সকালবেলায় ভাবছি আজও যেদি অমনি করে করে বিষ্টি হয়, তাইলে দুনিয়া আর থাকবে না। ঘর-দুয়োর সব গলে মুছে যাবে। মিছে ভাবছি না, গতকাল বৈকালবেলায় মল্লিকদের একটো ঘর আমার চোখের ছামনেই ভেঙে পড়ল। আমাদের এই বাড়ি থেকে ঐ ঘরটো দেখা যেত না, বাড়ির পাঁচিরের আড়াল হতো। সকালবেলায় সেই সীমেনা-পাঁচির ভেঙে পড়েছে বলে মল্লিকদের গোটা বাড়ি দেখতে পাওয়া যেছিল। পড়ন্তবেলায় ঐ বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছি, এমন সোমায় উদের বড়ো ঘরটোর একটো দেয়াল হুড়মুড়িয়ে ভেঙে মাটিসই হয়ে গেল। সাথে সাথে সারা বাড়িটো এমন আনকা লাগল যেন আগে কুনোদিন বাড়িটোই দেখি নাই। ভাঙা ঘরের ভেতর থেকে একঘর আঁদার আর একটা খারাপ গন্দময়লা ভাপ এসে আমার নাকে লাগল আর মানুষ হঠাৎ ন্যাংটো হয়ে গেলে যেমন লাগে ঘরটোকেও তেমনি একদম ন্যাংটো মনে হলো। ঘরের ভেতর যা যা আছে সব দেখতে পাওয়া যেচে যি! যা মানুষ দেখায় না, লুকিয়ে রাখে, সি-সব দেখা যেচে! ভাঙা ফুটো পচা সব জিনিস। জানে ধরে উসব জিনিস ফেলে দিতে পারে নাই।
