একটু বাদে বুঝতে পারলম মাটি আর শুকনো নাই, বিষ্টির চোটে মাটি আর ফটাস ফটাস করে উঠছে না, পটপট ঝমঝম করে ঘোননা আওয়াজ শুরু হয়েছে। তা ভালো, বিষ্টি হলে তো মাঠের ধানের ক্ষেতি নাই বরং ভালো। জমি কানায় কানায় ভরে থাকুক কি ভেসেই যাক তাতে কুনো ক্ষেতি নাই। ইসৰ কথা ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে গ্যালম।
ঘুম য্যাকন ভাঙল, ভোরের আলো ত্যাকন খালি ফুটেছে, পুবদিক বোধায় ফরশা হয়েছে, বিছেনায় শুয়ে শুয়েই শুনতে প্যালম একটানা বিষ্টি হয়ে যেচে। অ্যাকন আর ম্যাঘ ডাকাডাকি নাই, লপানি নাই, বাতাসের সোঁ সোঁ অওয়াজ কিম্বা ঝাপটানি কিছুই নাই। খালি অঝোর বিষ্টির ঝমঝম অওয়াজ। একবার উঠে উঁকি মেরে দেখলম, সারা আসমান আমানির মতুন ম্যাঘে ঢাকা, কোথাও একটু কম-বেশি নাই, ম্যাঘ বলে মনেও হচে না, মনে হচে আসমানের বুঝিন ঐ রঙ। ঘন কালো ম্যাঘে খুব বিষ্টি হয়, মনে হয়, ঐ ম্যাঘে বিষ্টি তো হবেই কিন্তুক এমন ঘোলা ম্যাঘের গোলা দিয়ে লেপা আকাশ থেকে এত বিষ্টি কি করে হচে? তা অবশ্যি লতুন কিছু লয়, চেরকালই দেখে আসছি, আষাঢ়-শেরাবনে ত্যাতো লয়, ভাদর মাসে আকাশ এমনি ভাব ধরলে খুব পানি ঢালে। কুনো কুনো বার ভাদর মাসে বাদল হয়, মাঠ-ঘাট ভেসে যায়, তেমন বাদল দু-তিন দিন কি তার বেশিও থাকে। ইবারেও বোধায় তাই। রাতদোপরে নেমেছে। কম বেশি নাই, বাতাসের ঝাপটানিতে বিষ্টি ছেড়া-খোঁড়া হচে না। নিশ্চয় এত বিষ্টিতে মাঠকে মাঠ ভেসে যেচে। আর খানিকক্ষণ এইরকম চললে ধানগাছ সব পানিতে তলিয়ে যাবে, সারা মাঠ হয়ে যাবে শাদা সমুদুর। তাতেই বা আর ভয় কি? কুনো কুনো বছর এমন হয়। ধান সব তলিয়ে যায়, ডগাটুকুনও দেখা যায় না মনে হয় সব ধান পচে যাবে। তা কিন্তুক হয় না। বাদলা কেটে ভাদর মাসের রোদ উঠলে দু-দিনেই পানি হড়হড় করে নেমে যায়। গরম ভাপ হয়ে পানি শুকিয়ে যায়, যেমনকার ধান তেমনি আবার জেগে ওঠে। উ নিয়ে ভাবার কিছু নাই।
আর শুয়ে থাকা যায় না, উঠেই যখন পড়লম কাজকম্ম দেখি গা। য্যাতো বাদল-বর্ষাই হোক, দিন তো বসে থাকবে না। একটু বাদেই ছেলেপিলেরা সব উঠে খেতে চাইবে, জা-রা উঠে কাঠ-কয়লা দিয়ে দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে নিজের নিজের কাজে মন দেবে, বাড়ির পুরুষরা বাইরে বেরিয়ে যাবে, বিষ্টি-বাদলা মানবে না। মুনিষ-মাহিন্দাররা বাড়ির এটো-ওটো কাজ করবে–হাঁস-মুরগিতে বাড়ি ঘিনঘিন করবে–দিন এমনি করে শুরু হবে, এমনি করেই শ্যাষ হবে। ইয়ার অন্যাথা নাই। আমি হেঁশেলের পাশে রাঁধা-বাড়ার চালাটোয় যেয়ে চুলো ধরাইতে গ্যালম। এই সোমায়টোয় জ্বালটের খুব অভাব–অত শুকনো কাঠ কোথা? ডালপালা কাঠিখোঁচা. আর খ্যাড় দিয়েই কাজ চালাতে হয়। গরু-মোষের খাবারে টান পড়ে, খ্যাড় পোড়াইলে মুনিষ-মাহিন্দাররা আবার রাগ করে। আবার কয়লাও গরমিল–এইসব কথা ভাবতে ভাবতে চুলোর কাছে যেয়ে দেখি ডালপালা সব ভিজে, চুলোয় রেতের আগুন শুদু যি নিভে গেয়েছে তা লয়, চুলোর ভেতরে পানি জমে গেয়েছে। কি করে জ্বালাই চুলো?
তা দিন পড়ে থাকে নাই। আগুন ঠিকই জোগাড় হলো, যাহোক রাঁধা-বাড়া হলো, দিনের কাজে সবই হলো। ভাবনা করার কিছু হয় নাই। কিন্তু তার পরে বিষ্টি যি একবারের তরে থামল না।
আজ পাঁচ দিন বাদল নেমেছে, একবার থামাথামি নাই। হয় বটে বিষ্টি, তাই বলে অত? দ্যাওরদের কাছে খবর পেয়েছি যি মাঠ ডুবে গেয়েছে পরশুদিনই। অত পানি কি মাঠ রাখতে পারে? সব ভরা, অত পানি নেমে যাবে কোথা? সারা মাঠে ধান আর দেখাই যেচে না, সব ডুবে গেয়েছে। আগে আগে হলে বলতম দু-দিন বাদে পানি নেমে গেলেই মাঠ আবার সবুজ হবে। তাই বলে টানা ছ-দিন যেদি ধান পানির তলায় থাকে তাইলে কি সেই ধান বাঁচবে? আজ পাঁচ দিন তো হয়েই গেল।
ইদিকে দিন গুজরান তো অসোম্ভাব হয়ে যেচে। কাল পয্যন্ত কুনোরকমে বাঁধাবাড়া হয়েছে। যেমন করে তোক ছেলেপুলে, বাড়ির পুরুষমানুষ, মুনিষ-মাহিন্দারদের মুখে ডাল-ভাত জোটানো গেয়েছে। আজ কি হবে? গিন্নি আঁদার ঘরে নিথর শুয়ে আছে, ননদ হয়তো আমারই মতুন তার পাশে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। কাকে কি শুদুব? কোথা কি আছে আমিই সব জানি! হেঁশেলে বড় পয়ায় চাল আছে, ডালও আছে য্যাথেষ্ট, টিনে মুড়িও আছে। চুলোটো যেদি জ্বালাতে পারি তাইলে চালে-ডালে এক পাতিল খেচুড়ি বেঁধে দিলে বাড়ির সবাই খেতে পারবে। কিন্তুক চুলো জ্বালাইতে কি পারব? এক ফোটা কেরাসিন নাই, কয়লাও নাই। কটো ভিজে ঘসি আর বাবলাগাছের ডালপালা পড়ে আছে। গুণে গুণে দ্যাখলম ট্যানাকাঠির বাসোয় মোটে তিনটো কাঠি পড়ে আছে। ডালপালা গুছিয়ে নিয়ে তৈরি হয়ে বসে একটো কাঠি বারুদের গায়ে টানলম। কিছুই হলো না। বারুদ ভিজে জবজব করচে। বাসোর গায়ে আর একবার কাঠিটো জোরে টানতেই খশ করে কাঠির মাথার বারুদটো খসে গেল। কি হবে? কি করে আগুন জ্বালাব? কে এট্টু আগুন দেবে? পরের কাঠিটো খুব জোরে টানতে গ্যালম, যাঃ, কাঠিটোই ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেল। আর মোটে একটি কাঠি আছে। এটিও যেদি না জ্বলে!
কোথাও আগুন নাই, সারা গাঁ ভিজে চবচব, কুনো বাড়িতে আগুন নাই, কারুরি চুলো জ্বলছে না। কারু ঘরে খাবার নাই। ভয়ে আমার হাত-পা প্যাটের ভেতর সেঁদিয়ে যেচে। এই যে, এই শ্যাষ কাঠিটোর বারুদও খসে গেল। ত্যাকন আমার কাঁদন এল। কোথা আমি আগুন পাই? মুনিষদের কাছে চকমকি পাথর আছে, হয়তো তারা কষ্ট করে আগুন জ্বালাইতে পারবে। কিন্তুক অ্যাকন তারা কোথা?
