আমাদের বড় ভাগ্নেটি, মা মরে গেলে কত্তা যাকে ই বাড়িতে এনেছিল, সে অ্যাকন খুব রূপের এক যোব। সে শহরে একটো চাকরি পেয়েছে। এই মেলেটারির চাকরি। জাপানি বোমার হুজুগের পরেই এই চাকরি। সে বললে, একটো আপিসে বেবস্থা আছে, বোমা ফেলার লেগে উড়োজাহাজ এলে অনেক আগেই লিকিনি জানতে পারা যাবে আর ত্যাকনই একটো হুইসিল না সাইরিন কি বাজিয়ে দেবে। সি অওয়াজ এত জোরে হবে যি সারা শহরের লোক জানতে পারবে আর সবাই সাবধান হয়ে যাবে। কি সাবধান? সারা শহরে গত্ত খুঁড়ে রেখে দিয়েছে এক-একটো খালের মতুন। সাইরিন বাজলেই যে যেখানে আছে, সেই খালের ভেতরে ঢুকবে, ছেলেমেয়ে-বউ-বিবি সব নিয়ে সেইখানে বসবে। বোমার উড়োজাহাজ চলে গেলে আবার অন্য রকম সাইরিন বাজলে সবাই উঠে আসবে। আরও একটা বেবস্থার কথা শোনলম। যেখানে-সেখানে বালির বস্তার দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। বোমা যেদি পড়েই তাইলে বোমার ভেতরে যিসব ভায়ানক জিনিস আছে, তা ঐ গত্তে ঢুকতে পারবে না, বালির দেয়ালও ভাঙতে পারবে না। ভাগ্নেটি এই চাকরি করছে, মাঝে মাঝে য্যাকন আসে, ত্যাকন এইসব কথাই শুনি তার কাছে। বেশ চাকরি করছে, মাইনে পেচে। বোমা ই পয্যন্ত পড়ে নাই।
২৩. নোহ নবীর সোমায়ের কেয়ামত কি আবার এল
হেঁশেল ঘরের উসারায় একটো খুঁটিতে হেলান দিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছি। পাঁচ দিন হলো বাদল নেমেছে। মাঠভরা ধান-ইবার লিকিনি খুব ফলন হয়েছে ধানের, বহুকাল এমন কেউ দেখে নাই। সবারই মনে আনন্দ। হবে না ক্যানে? ঐ এক ধান, ধান ছাড়া আর তত কিছুই নাই দ্যাশের মানুষের। আর কিছুই নয়, শুদু এই আমন ধান। সারা বছরের ঐ একটি ফসল-বর্ষায় রোয় আর পোষ-মাঘে কাটে। খাওয়া-পরা সবকিছুই ঐ ধানে। ই বছর খরানির কালে লোকের খুব ভয় হয়েছিল। আসমানের পানিই শুধু ভরসা, সেই পানি যেদি আষাঢ়-শেরাবনে না হয় তাইলে জমি আবাদ হবে না, বীজতলা শুকিয়ে যাবে আর ইয়ার মানে একটোই–মরণ। সারা বর্ষা পানির লেগে ত্যাকন হাহাকার–সেই কাত্তিক মাস পয্যন্ত। এই হলো খরানির। ভয়, আবার পানি বেশি হলেও ভয়! ধান ভেসে যাবে না তো? জমি তলিয়ে যাবে না তো? কম হলে চাষির মনে দুরদুরুনি শুকিয়ে যাবে না তো, জমি শুকিয়ে চরচরিয়ে ফেটে যাবে না তো? আর বেশি হলে ভয়, ভেসে যাবে না তো? এইরকম করে করে চলে।
ইবারের খরানির ভাব দেখে লোকে মনে করেছিল পানির অভাবে আবাদই হবে না, গেলবার পানির অভাবে চাষে জুৎ হয় নাই, লোকের খুব কষ্ট গেয়েছে, ইবারও যেদি ধান মরে যায়, তাইলে মানুষ আর কিছুতেই বাঁচতে পারবে না। উদিকে যুদ্ধর আগুন তো আছেই। কিন্তুক না, শ্যাষ পয্যন্ত আষাঢ় মাসের দিনকতক যেতেই ভালো বর্ষাই নেমেছিল। মানুষ খুব খুশি। পেটে ভাত নাই, পেঁদনে কাপড় নাই, ওলাউটোয় কত মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে তবু মানুষ আশায় বুক বেঁধে ইবার খুব ভালো করে চাষ করলে। ঐ দু-মাসে পানি বেশিও হয় নাই, কমও হয় নাই। দেখা যেচে ধানও খুব ভালো হয়েছে। আমাদের সেজ আর ল-কত্তা চাষবাস নিয়েই থাকে। আমর তো আর মাঠে যাই না, ওরাই এসে বুনের কাছে গপ্পো করে, ইবারের মতুন ধান বহুকাল হয় নাই। পাঁচ-ছটো মরাই পিতি বছর হয়, ইবার মনে হয় সাত-আটটো হবে। আমাদের অতো বড় খামারেও জায়গা হওয়া কঠিন–দেখো, পাড়ার ছেলেমেয়েরা এসে লুকোচুরি খেলবে। ওরা বলছে আর আমি যেন দেখতে পেচি ধানের মরাইগুলিন!
ভাদর মাসে খুব বিষ্টি হয়, মাঠে পানি লাগেও বটে, হয়ও খুব। তাই সিদিন মাঝরেতে ঝমঝমিয়ে ম্যাঘ নামলে ভেবেছেলম বোধায় কদিনের মেয়াদি বাদল নামল। তার বেশি আর কিছু ভাবি নাই। পাঁচদিন আগে, সবাই ত্যাকন ঘুমিয়ে, ঘরবাড়ি সব আঁধার কো-কাপ। অতো রেতে মানুষ আলো জ্বালবেই বা ক্যানে? তার ওপর কেরাসিন নাই, সরষের ত্যাল নাই, রেড়ির ত্যাল নাই অ্যানেকের। পিদিম জালাবেই বা কোথা থেকে? আবার আমাদের ঘরে অবশ্যি একটো আলো জ্বলত মিটমিট করে, কত্তা ঘর একদম আঁদার করতে দিত না। তা এমন দিন পড়েছে যি সি আলোও বন্ধ–সবাই ঘুমিয়েছে, আমিও মনে হয় মরণঘুমই ঘুমিয়েছেলম। ম্যাঘ লম্পানিতে আর গুডুম গুডুম ম্যাঘের ডাকে ঘুমটো ভাঙল, খুব ঘন ঘন বিজলি চমকাইছেল আর জানেলা দিয়ে ঘরবাড়ি গাছ পুকুর মাঠ সারা দিনদুনিয়া একবার একবার দেখতে পেচি আবার চোখ বুজছি কিন্তুক থাকতে পারছি না চোখ বুজে। ম্যাঘের ডাকে কানে তালা ধরে যেচে।
কত্তার ঘুম খুব পাতলা। আমি জানি, তার ঘুম ভেঙে গেয়েছে কিন্তুক সি কুনো কথা বললে না। বলবে না জানা কথা! বিজলি লল্পাইছে আর ঘরের ভেতরে ছেলেমেয়ের বিছেনা আবছা দেখতে পেচি–আরামে ঘুমুইছে তারা। বড় ছেলে শহরে পড়ে, মেয়েটোও ননদের সাথে থাকে, ই ঘরে শুদু আমার দুই খোঁকা। এর মদ্যে আরো একটি খোঁকা হয়েছে কিছুদিন আগে। উ কথা আর বলি নাই–কি আর বলব–য্যাতোদিন খ্যামতা আছে পেটে ধরব, যিদিন বন্ধ হবে, সিদিন হবে। তাই বলে কি যারা এয়েছে দুনিয়ায়, মায়ের কাছে তাদের অনাদর হবে? তা লয়। ঐ যে দুই ভাই নিচ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। সব একবার দেখে নিয়ে আমি আবার চোখ বোজম আর ঠিক তখুনি দড়বড়িয়ে পানি নামল। শুকনো মাটি য্যাতক্ষণ না ভেজে, ফট ফট করে মাটিতে বিষ্টি পড়ার আওয়াজ হয়। বড় বড় ফোটায় অ্যাকন তেমনি বিষ্টি হচে। চোখ বুজেই আছি কিন্তুক বিজলি চমকাইলেই চোখে আলো দেখতে পেচি, চোখ বুজে কুনো কাজ হচে না। আর বাজ পড়ার আওয়াজ তো আছেই।
