সেই যি শয্যে নিলে গিন্নি, আর উঠলে না। ডান দিকটো, শরীলের পেরায় আধেক, একবারেই অবশ। হাতও নড়ে না, পা-ও নড়ে না। এত চেষ্টা করে গিন্নি কথা বলতে। তা মুখের বাঁ দিকটো এক-আধটু নড়াচড়া করছে বটে কিন্তুক ডান দিকটো থির। মুখ দিয়ে শব্দ হচে কিন্তুক একটি কথাও বোঝা যেচে না।
খবর পেয়ে কত্তা এল, অন্য সব ভাইরা এল, ছোট দ্যাওরকে খবর দেওয়ার লেগে শহরে লোক গেল, গাঁয়ের ডাক্তারটোও তখুন-তখুনি এল। সে বললে, আবস্তা খারাপ। ই রোগের নাম সন্ন্যাস রোগ। ই রোগেই বাপজি মরেছিল। মাথার শিরে ছিড়ে যায়, মাথার ভেতরে শরীলের সব রক্ত জমা হয়ে দইয়ের মতুন থকথকে হয়ে যায় তারপর দু-একদিনের মদ্যে রুগি মারা যায়। চোখে অন্ধকার দেখলম। তাইলে আর আমাদের গিন্নির হেয়াৎ নাই? গিন্নি ব্যাগোরে ই সোংসার একদিনও চলবে না, কেউ চালাতে পারবে না। আমি বউ হয়ে এসে মাকে মা, শাশুড়িকে শাশুড়ি একসাথে পেয়েছেলম। একদিনের লেগে ভাবি নাই, আমার কুনো দায় আছে। বুঝেছেলম যি শুদু হুকুম শুনলেই হবে। অ্যাকন কে হুকুম দেবে, কার হুকুম শুনব? এই কাঠির মতুন ফরশা রোগা এতটুকুন মানুষ শুয়ে আছে, উ কুন ধাতুতে তৈরি তা কেউ না জানলেও আমি জানি। ঐ শুকনো পাথরে কতো পানি, কতো মায়া, কতো দয়া-আমি হুহু করে কেঁদে ফেললম। তাই শুনে কত্তা এমন করে আমার দিকে চাইলে যি, কাঁদন সাথে সাথে গিলে নিতে হলো। কত্তা বললে, কিছু হয় নাই, রোদে মাথা ঘুরে গিয়েছে, দুর্বল শরীর, তাই পড়ে গিয়েছে, দু-দিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
বড় খোঁকাকে দেখার লেগে যি ডাক্তার এয়েছিল শহর থেকে, সেই ডাক্তার আবার এল। রুগি দেখে ডাক্তার বললে, শিরা ছেড়ে নাই, তাইলে বাঁচত না। মাথার ভেতর শিরা দিয়ে রক্ত যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেয়েছে বলে রক্ত জমে গেয়েছে। তখন-তখুনি য্যাকন রুগি মারা যায় নাই, আর ভয় নাই, রুগি এখুনি মারা যাবে না। ওষুধ খেতে হবে, রুগিকে খুব যত্নের মদ্যে রাখতে হবে, খাবার পথ্য যা যা লিখে দেওয়া হবে ঠিক তাই তাই খাওয়াতে হবে। আশা দিয়ে ডাক্তার বললে অবশ ভাবটা আস্তে আস্তে কেটে যাবে–কথা হয়তো দু-চার দিনের মধ্যেই বলতে পারবে। এখুনি হাঁটতে পারবে না। তবে আস্তে আস্তে আবার হাঁটার ক্ষমতা ফিরে আসতেও পারে।
ডাক্তারের কাছ থেকে সব বুঝে নিয়ে কত্ত আমাদের বউ-ঝিদের সবাইকে ডাকলে–ভাশুর হয়েও সব ভাজ-বউদেরও ডাকলে–ডেকে বললে, মায়ের সামনেই বলছি–শাশুড়ি তার কথা শুনতে বা বুঝতে পারলে কিনা, জানি না একদিষ্টে তাকিয়ে ছিল দেখলম–তা কত্তা বললে, আমার কাছে দুনিয়া একদিকে আর আমার মা একদিকে কাজ সব ভাগ করে নাও, কে কি করবে। পায়খানা-পেশাব থেকে শুরু করে সব কাজই করতে হবে। আমার দিকে চেয়ে এই পেথম সবার ছামনে আমাকে বললে, এই কাজটা তুমি নিজের হাতে করবে। তাপর বুনের দিকে চেয়ে বললে, মহুদা সবারই কাজ দেখবে। মোট কথা, রুগির যদি এতটুকু অযত্ন হয়, মায়ের কাছ থেকে যদি কিছু জানি, তাহলে যে-ই হোক, তার কোনো খাতির নাই, এ বাড়িতে তার জায়গা হবে না।
আমরা সবাই জানি, কত্তার কথার একটুকুন ইদিক-উদিক হবে না। গিন্নির সেবা এগু, তা-বাদে অন্য কিছু। ঘরের আর আর জিনিস সরিয়ে ফেলা হলো। শুদু সিন্দুকটো থাকল, তার ওপর পোঙ্কার বিছেনা আর রুগির যা যা লাগে সব রাখা হলো। মাথার দিকে ওষুধ-পত্তর আর ফলমূল পথ্য এইসব। কত্তা মুটের মাথায় চাপিয়ে মায়ের লেগে কতো জিনিস যি আনলে! ডাবের পাহাড় হলো, বাজার ঘুরে ঘুরে বেদানা, নাশপাতি, খেজুর, কলা, আম, লিচু সব কিনেছে সে, কিছু বাদ নাই। এত আক্রা-মাগনের দিনে পয়সা পেচে কোথা— একদিন এই কথা শুদুলে কি রাগ কত্তা
তাতে তোমার কি দরকার? বাড়িতে কি ধান-চাল কিছুই নাই! এক শো বিঘে জমি আছে কিসের জন্যে? সব বেচে ভিখিরি হব–যাও।
ওরে বাপরে! আর একটি কথাও বলা নয়। উ মানুষের এমন রূপ কুনোদিন দেখি নাই। তা আমি কিছু বারণ করেছি? আমাকে অত কথা বলার দরকার আছে? গিন্নির সেবার লেগে আমাকে বলতে হবে ক্যানে? ঐ মানুষ আমার মায়ের বেশি, বাপের বেশি, ই সোংসারের মুদুনি। মুদুনি ভাঙলে কি আর ঘর থাকে? কত্তা যি বুনকেই সব দেখতে বলেছে তার কারণ আছে। আমি জানি, গিন্নি গেলে ননদই লতুন গিন্নি হবে। ঐ মায়েরই তো মেয়ে, ভাইদের সোংসারের হাল সে ঠিকই ধরতে পারবে। গিন্নির সেবা-যত্নের খবরদারি করা তারই কাজ বটে! তবে সেবা-শুশুষার সব কাজ আমাদের বউদেরই করতে হবে। বড় বউয়ের ছেলেপুলে হয় নাই, কাজকম্ম সবই করে বটে কিন্তু একটু আলগা আলগা, কুনো কিছুতেই তেমন আঁট নাই, নিজের ওপরেও যত্ন নাই, কোথাও তার কুনো বাঁধন পড়ে নাই, জেবনটা কুনো গতিকে কেটে গেলেই হবে, এমনি করে চলে সে। এইসব চারদিক ভেবে গিন্নির সব দায় আমাকেই নিতে হলো। বাড়ির আরও কাজ আছে, সিসব আর দু-বউ করুক। ছোটজনা তো শহরে আছে। আসবে হয়তো কাল-পরশু দু-দিন থেকে আবার চলে যাবে। ছোট দ্যাওরের আপিস কামাই করার উপয় নাই।
আমাদের অত সেবা বেরথা গেল না। কদিন বাদেই দেখা গেল গিন্নির জবান আবার ফিরে আসছে। পেথমদিকে একটি কথাও বোঝা যেছিল না, সব কথা জড়িয়ে-মড়িয়ে খালি একটো গোঙানির মতো আওয়াজ শোনা যেছিল। তাপর মুখের ব্যাকাভাব কাটতে লাগল, একটি-দুটি করে কথা পোষ্কার হতে হতে আবার তার কথা আগের মতুন হলো। অসুখ যেন হয় নাই, সব আগের মতুন আছে। গিন্নির মনে কুনো ভয়-ভীত্ নাই। আগের মতুনই কি করতে হবে, না হবে, বলে। একবারও কই অসুখের কথা বলে না, নিজের কষ্টের কথা বলে না। একবার কাকে যেন বললে, মওত যখন আসবে তখন আসবে, আমি বেস্ত হব কেন। কথাবার্তা য্যান বেশ সড়োগড়ো হলো ত্যাকন ককে একদিন বললে, কি জানি বাবা, মাথাটা কেমন করে ঘুরে উঠল, ফু দিয়ে পিদিম নিভিয়ে দিলে যেমন হয়, তেমনি দপ করে সুয্যিটা নিভে গেল। আর আমি কিছু জানি না।
