দশ-পনেরো দিনের মদ্যে গাঁয়ের অনেক লোক মরল। হাড়িপাড়া বাগদিপাড়া মুচিপাড়ায় বেশি, ভালো হিঁদুপাড়াতেও অনেকে গেল। মোসমলানপাড়া থেকেও চার-পাঁচজনা দুনিয়ার মায়া কাটাইলে। দু-হপ্তা বাদে একদিন খবর পাওয়া গেল, হারামজাদি বুড়ি ওলাবিবি কাপড়ের পুঁটুলি নিয়ে ঠিক বুঝকিবেলায় পুব-দখিন কোনাকুনি মাঠ পাড়ি দিয়েছে। বঁটা মার, আবার কুন গাঁয়ে ঢুকে গাঁ উজাড় করবে কে জানে! এই কদিন মুসিবতের শেষ ছিল না–কেমন করে দিন যেছিল, কেমন করে রাঁদা-খাওয়া হছিল, সি আর কি বলব! ছেলেমেয়ে খেলা ভুলে গেয়েছিল, খাওয়া ভুলে গেয়েছিল, ঘুমননা ভুলে গেয়েছিল। আমরা মায়েরা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি–ইয়াদের মদ্যে কেউ কি যাবে, তার এ যেন আমি যাই–এইরকম বুকবুকুনি করে দিন গেয়েছে, রাত গেয়েছে। কুনোদিকে মন ছিল না।
বুড়ি মাগি গাঁ ছেড়ে গেলে অ্যাকন মানুষের খেয়াল হবে গাঁয়ের ই কি দশা হয়েছে! পেঁদনের কাপড় মিলছিল না তো অ্যানেকদিন থেকেই। বউ-ঝিরা আর কেউ কারুর বাড়িতে আসে না, বাড়িতেই থাকে। খুব দরকারেও পাড়ার রাস্তায় আসে না। পরনের কাপড়ের এমনি দশা যি আর আর বাড়িতে বেড়াইতে যাবে কি, একবার রাস্তায় বেরুবে কি–বাড়ির মদ্যে বাপ-ভাইদের ছামুতে বেরুতেই শরম লাগে। দিনের বেলাতেই কারুর গলা শোনা যায় না আর রাত লাগলে তো কথাই নাই। খেলাধুলোও বন্ধ, সাঁঝবেলাতেই নিঝুম রাত। কোথাও কুনো সাড়াশব্দ নাই। গাঁ যেন আঁদার কো-কাপ, কুনো বাড়িতে একটি আলো দেখা যায় না। কেরাসিন একদম গরমিল। মাথা খুঁড়লেও একটি ফোঁটা কেরাসিন পাবার উপয় নাই। গাঁয়ে দুটি মুদির দোকান আছে দুটিই বন্ধ। কি বেচবে তারা? দোকানে কিছুই নাই-নুন নাই, তেল নাই, চাল নাই, আস্তে আস্তে সব গরমিল হতে লেগেছে।
আমাদের বাড়িতে দুটো হেরিকেন ছিল। একটো-কে ঘিরে ছেলেমেয়েরা সবাই গোল হয়ে বসে শোরগোল করে পড়ত আর একটো কত্তার ঘরে দিয়ে আসা হতো। সেই হেরিকেন দুটো অ্যাকন কেরাসিন বিহনে জ্বালানো হচে না। ভাগ্য ভালো, দিঘির ঢালু ঘেসো পাড়টোতে রেড়িগাছ লাগানো হয়েছিল, খুব রেডি হয়েছে! সেই রেড়ি ঘানিতে ভাঙিয়ে রেড়ির তেল পাওয়া গেয়েছে অনেক। তাই দিয়ে পিদিম জ্বালানো হচে। একগাদা মাটির ছোট ছোট পিদিম কেনা হয়েছে। আর কেনা হয়েছে চারদিকে চারটো মোটা কাচ লাগানো লণ্ঠন। পিদিম জ্বালিয়ে ঐ লণ্ঠনের মদ্যে রেখে হেরিকেনের কাজ চালানো হচে। রেড়ির তেলে চুবনো ত্যানার পলতেয় পিদিমে আর কতোটুকুন আলো হবে? ঘরের এক কোণে কুনোমতে মিটমিট করে জ্বলে। লণ্ঠনের ভেতর রাখলে আলো একটু বেশি হয়, একটু বাতাসেই নেবে না। ঐ আলোতেই ছেলেমেয়েরা পড়া পড়ছে।
এমন করে আর কততকাল? একদিন রেতে কত্তাকে বললম।
যুদ্ধ কি এইবার একটু একটু বুঝতে পারছ তো? প্রথমে দেখলে মানুষের পরনের কাপড় নাই। এখন দেখছ একটি-একটি করে জিনিশ গরমিল হচ্ছে–নুন নাই, কেরোসিন নাই, চিনি নাই। তার মানে গাঁয়েগঞ্জে যা যা তৈরি হয় না, তৈরি করতে পারা যায় না, তাই তাই নাই। যা কিছু বাইরে থেকে আসত, তা আর এখন পাওয়া যাবে না। জমিতে চাষ-বাস করে চাল ডাল তেল এইসব পেয়েছি বলে ততো অভাব মালুম হচ্ছে না–সব জিনিস যদি নিজেদের না থাকত, যদি কিনে খেতে হতো তখুনি বুঝতে পারা যেত যুদ্ধতে কি হয়।
তাইলে শহরের মানুষদের আবস্তা কি?
তাদের তেল নুন চিনি কেরোসিন তো বটেই, চাল ডালও কিনে খেতে হয়। শহরের লোকদের খেতে হচ্ছে বিদেশ থেকে আনা মোটা চাল। আমরা গাঁয়ে ভালোই আছি।
আমি কত্তাকে সেই বাপের বাড়ি যাওয়ার গঞ্জনার কথা বললম।
আমি জানি, খবরের কাগজে পড়ি, মাঝে মাঝে শহরে যাই–দেশে এখন আর দেশের লোক নাই–বিদেশীতে দেশ ভরে গিয়েছে। গোরা সেপাইতে, বিদেশী গাড়িতে, উড়োজাহাজে, কামান-বন্দুক গোলাবারুদে, কোনো জায়গা আর বাদ নাই। শহরগঞ্জের পথঘাট, ট্রেন-বাস সব জায়গায় ওরা। ওদের যা লাগবে তাই জোগাতে হবে। ফলমূল, হাঁস-মুরগি গরু-ছাগল সব ওদের জুগিয়ে দিতে হবে। ট্রেনে বাসে ওদের পয়সা লাগবে না। সব ওদের দিতে হবে। মেয়েমানুষ পর্যন্ত বাদ নাই। না দিলে কেড়ে নেবে। ওরা যা খুশি তা-ই করবে, কোনো বিচার-আচার হবে না। যেখানে-সেখানে দেশের মানুষদের ওরা লাথি মারছে, ডান্ডা মারছে, মেরেও ফেলছে–কিছুই বিচার নাই। খুব খারাপ দিন আসছে। সারা দুনিয়ায় এই যুদ্ধ, পশ্চিম দুনিয়ায় এখন থমকে আছে, যুদ্ধ এখন পুবের দুনিয়ায়। কিছুই থাকবে না, সব মিশমার হয়ে যাবে। ফসলভরা একটা মাঠে পঙ্গপাল বসলে কি হয় দেখেছ? চার-পাঁচদিন পরে যখন দলটা চলে যায় তখন মাঠে শুকনো খটখটে শাদা মাটি ছাড়া আর কিছুই থাকে না। একটা ঘাসও আর দেখতে পাওয়া যায় না। এই যুদ্ধ শেষ হলে ঠিক তা-ই হবে, একটা ঘাসের ডগাও পড়ে থাকবে না সব বিরান মরুভূমি হয়ে যাবে।
এত ভেবে আর কি করব? যা হয় হবে। এবার আকাশের আবস্তাও খারাপ। ই কি খরানি! দু-মাস ধরে একটি ফোটা বিষ্টি নাই। কোথাও কুনো ঘেঁয়া নাই। সারা গাঁ উদোম খোলা পড়ে আছে। বড়-ছোট কুনো গাছে পাতা নাই, ভয়ে সব যেন কাঠি হয়ে গেয়েছে।
একদিন দোপরের খানিক আগে সব্বোনাশ হলো। উঠনে ধান মেলে দেওয়া ছিল, গিন্নি সেই ধান নাড়াতে যেয়ে হোঁচট খেয়ে, নাকি এমনি এমনি, পড়ে গেল। আমরা ছুটে তাকে তুলতে গ্যালম। হালকা মানুষ, বয়েস হয়েছে, শরীর শুকিয়ে গেয়েছে, তুলতে কষ্ট হলো না আমাদের। কিন্তুক গিন্নিকে হাঁটাতে যেয়ে দেখলম গিন্নি হাঁটতে পারছে না। খুব জোরে আঘাত লেগেছে কিম্বা কোথাও কিছু ভেঙেছে বলেও মনে হলো না। ইদিকে দেখছি গোটা ডান পা আর ডান হাত লাঠির মতুন সোজা হয়ে রয়েছে। গিন্নি কথাও কিছু বলছে না। ত্যাকন ভালো করে তাকিয়ে দেখি, মুখের চারদিকটো কেমন বেঁকে রয়েছে। এই দেখে আর কুনো কথা না বলে আমরা ধরাধরি করে গিন্নিকে নিয়ে উত্তর-দুয়োরি ঘরের মেঝেয় বিছেনা পেতে শুইয়ে দেলম।
