তোমার সব ঠিক আছে তো এখন? সব কথা মনে করতে পারো তো?
হ্যাঁ, সব মনে আছে শুধু এই হাঁটাটা বন্ধ। কেউ ফিরিয়ে না দিলে পাশ ফিরতেও পারছি না। বিছেনাতেই পায়খানা-পেশাব করতে হচ্ছে, বাবা! শুধু এই জন্যেই মওত চাইছি। কেন কেউ এই কাজ করবে?
কথা শুনে চোখের পানি রাখতে পারলম না, ই কথা কেন বলছে গিন্নি। আমার কঁদন দেখে গিন্নি কত্তার দিকে চেয়ে বললে, মহুদাই এই কাজ করত। কিন্তু আমি জানি মহুদাকে এ কাজ করতে দেবে না মেজ বউ। তুমি ভেবো না বাবা।
সসাংসারের আর কুনো হ্যার-ফ্যার হলো না। সব আবার ঠিক আগের মতুন চলতে লাগল। শুদু একটো মানুষ দিন-রাত শুয়ে আছে, সব দেখছে, সব শুনছে। সে সবকিছুতেই আছে কিন্তুক কুনো কিছুতেই থাকতে পারছে না। সুরুজ ওঠার আগে তাকে বিছেনা থেকে উঠে বসিয়ে দিতে হয়, পাত্তর কেনা হয়েছে, তাতে পায়খানা-পেশাব করিয়ে দিতে হয়, মুখ ধুইয়ে দিতে হয়। তাপর সকালের বাঁধা খাবারটো খাইয়ে দিতে হয়। ডান হাতটো তো অবশ। এইরকম করে দিন অরম্ব করে সারাদিনে তাকে কতোবার উঠিয়ে-বসিয়ে দিতে হয়, গোসল করাতে হয়, ওষুধ খাওয়াতে হয়, একটো মানুষের সব কাজ করে দিতে হয়। গিন্নি কিছুই বলে না। দিনের পর দিন যায়। তবে এক-একদিন গিন্নির চোখে কি এট্টু রাগ দেখি? বিড়বিড় করে কিছু যেন বলছে বলে মনে হয়। আমি জানি, গিন্নি কারু ওপর রাগে নাই, রাগ তার নিজের ওপর। বিড়বিড় করে আল্লাকে শক্ত শক্ত কথা বলে, শিগগিরি-শিগগিরি মত চায়। একদিন লিকিনি কুন্ বউ পানি খাইয়ে হাতের গেলাশটো এট্টু বেরক্ত হয়ে ঠক করে মেঝের ওপর নামিয়ে রেখেছিল। গিন্নি কত্তাকে সাথে সাথে ডেকে পাঠিয়ে বললে, সত্যি বলছি বাবা, একটুও রাগ করে বলি নাই, দুনিয়ায় দিন যদি শেষ হয়েই থাকে। শেষ তো হবেই একদিন, সব মানুষেরই হবে–তা যদি দিন শেষ হয়েই থাকে, আর কিছুই করার না থাকে, তাহলে দুনিয়ায় থাকা কেন, আল্লা কেন তবে নেয় না? এর কোনো মানে পাই না। তোমাকে শুধু একটি কথা বলার জন্যেই ডেকেছি, যার মন হয় না, সে যেন কিছুতেই আমার কাজ না করে। সে যেই-ই হোক, আমি তাতে এতটুকুনি রাগ করব না।
কথা শুনে কত্তা সবই বুঝলে, ঘর থেকে উঠে বাইরে যেতে যেতে ভারি কঠিন গলায় বললে, যার মন হবে না, সে যেন না মায়ের ঘরে যায়। ও ঘরে ঢুকে কেউ এতটুকুন বেচাল করলে, তাকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বার করে দেব।
দিন যেতে লাগল আগের মতুনই। সেই সকাল থেকে চুলো জ্বলছে, সারাদিন যজ্ঞ হচে, মুনিষ-মাহিন্দার যেচে-আসছে, ভালোমন্দ খবর পেচি–কিছুই বাদ নাই। চুলো নিভছে সেই অ্যানেক রেতে। সারারাত আঙার থাকছে, ভোরে আবার সেই আঙার থেকেই চুলো জ্বালানো হচে। চেরকাল যা হবার তা-ই হচে। কিন্তু আমার কাছে সব লাগছে অন্যরকম। সব জায়গায় কথা–শুদু এক জায়গায় কথা নাই। উত্তর-দুয়োরি ঘরের দরজা সব সময়েই বন্ধ। রুগি ছাড়াও ঘরে কেউ না কেউ সব সোমায়েই আছে কিন্তুক সব চুপ। গিন্নি থিরকাঠি হয়ে শুয়ে আছে। গায়ের ফরশা রঙ ঘরের আবছা আলোয় যেন আরও ধপ ধপ করে। ঠিক আগের মতুনই শাদা থানের শাড়ি কপালের আধখানা ঢেকে আছে।
এই মানুষ কুনোদিন নামাজ কাজা করে নাই। আমাদের কারু ওপর কুনোদিন জোর-জবরদস্তি করে নাই, তবু সেই কতোকাল থেকে, বোধায় ই বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর থেকেই গিন্নি, ননদ আর আমি একসাথে পাশাপাশি বসে আসর, মাগরেব আর এশার নামাজ পড়তম। সেই নামাজে কি হতো তা তো আমাদের কারুরি জানার উপয় নাই তবে সোংসারের জ্বালার ওপর সি ছিল মলমের মতুন। গিন্নির পাশে বসলেই এই কথাটি মনে হতো। জবান আর জ্ঞানবুদ্ধি আবার ঠিক হয়ে যাবার পরে গিন্নি আবার নামাজ পড়ছে বিছেনায় শুয়ে শুয়েই। এক হাত তুলে দোয়া করা হয় কি না, জায়েজ আছে কি না, তাও একদিন কত্তাকে শুদিয়েছিল। কত্তা বলতে পারে নাই, শুদু বলেছিল, তুমি যেমন করে পড়বে তা-ই জায়েজ। গিন্নি অ্যাকন থির হয়ে শুয়ে শুয়েই নামাজ পড়ে, লষ্ট না হলে ওজুও করে না।
এমনি করে গিন্নি নিজের বিছেনায় শুয়ে থাকলে। কুনোদিন আর উঠলে না।
২২. আকাল আর যুদ্দুর দুনিয়ায় কেউ বাঁচবে না
কি ভায়ানক দিন এল! এমন খরানি বাপের জন্মে দেখেছি বলে মনে হয় না। আকাশের দিকে চাইলে চোখ পুড়ে যেচে, আসমানের নীল রঙ লাল হয়ে গেয়েছে। এক-একটো দিন যেন পাহাড়ের মতুন বুকে চেপে থাকছে–কিছুতেই পেরইতে পারা যেচে না। সাথে আছে আবার যুদ্ধ আর আকাল। গেরস্তর নিত্যদিনের যা যা লাগে, তা যি শুদু আক্ৰা তাই লয়, পাওয়াই যেচে না। পেঁদনের কাপড়ের কথা আর কি বলব, সি তো পাওয়াই যেচে না। কেরাসিন নাই। কয়লার চুলো অ্যানেকদিন থেকেই বাড়িতে আছে, খুব ধুমো আর রান্নায় গন্ধ হয় বলে ঘসি আর কাঠের জ্বালটই ই বাড়িতে বেশি চলে। গাছ কেটে কেটে শ্যাষ, অ্যাকন গাছই পাওয়া যেচে কম। কয়লাটো এতদিন পাওয়াও যেছিল, দামেও শস্তা ছিল বলে কয়লা আনা হছিল এদানিং বেশি। সেই কয়লাও অ্যাকন আর পাওয়া যেচে না। নুন নাই, ট্যানাকাঠি নাই, চিনি নাই। চিনির অভাবে তেমন অসুবিধা হতো না, কারণ ই দিকের লোকে গুড়ই খায় বেশি। কিনতেও পাওয়া যায়, গাঁয়ের সালে নিজের নিজের সোংসারের গুড় তৈরি হয়। ইবার কারুর বাড়িতে গুড় নাই, আমাদের বাড়িতেও নাই, অ্যাকন শুনছি মুদির দোকানেও নাই। যা এক-আধটু আছে গরিবের তা কিনে খাবার কুনো উপয় নাই, এমনি দাম! গাঁয়ের তিনটো মুদির দোকানের দুটো বন্ধ, কুনো জিনিশ আনতে পারছে না, দোকানে রাখতে পারছে
