বৈকালের মদ্যেই খবর পাওয়া গেল, মীরপাড়ায় আরও দু-তিনজনার পেট নেমেছে। রোগটি ওলাউটোই, আর কিছু নয়। মুন্সিপাড়াতেও একজনার শুরু হয়েছে। যে ইসব খবর আনতে গেয়েছিল সে আমার এক বুন। কথায় কথায় বলেছে, মাহামারীর খবর পেয়ে বড় বুবু ছেলেমেয়ে নিয়ে কালই আবার শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবে। তাই শুনে সি পাড়ার এক বাঁজা-বউ বলেছে, অ, ওলাউটোর কথা শুনে পালাইচে তোর বুন! ছেলেপিলে যেন আর লোকের নাই! যোম যেদি একবার চেনে, যেখানেই যাও, পেচু পেচু যেয়ে ধরবে।
ছি ছি, এমন কথা কেউ বলে! কথাটো শুনে কি দুঃখ যি হলো! জান আর জানে থাকছে না! দুনিয়ার সব্বারই বুকের ধন ভালো থাকুক, ছি ছি, ই কি কথা! আমার ছোট বুনটো ভারি রাগী, ভারি তেজি। সে বললে, একুনি সে মুন্সিপাড়ায় যাবে ঝগড়া করতে। বহু কষ্টে তাকে সামলালম।
তিমি-সাঁঝবেলাতেই খবর পাওয়া গেল, ওলি মামু আর নাই।
২১. গিন্নি বিছেনা নিলে, আর উঠলে না
বাড়ি ফিরে অ্যালম কিন্তুক এক দিন পরেই ক্যানে অ্যালম সি কথা কাউকেই বলতে চাই নাই। ননদ একবার শুদুইলে বটে, মেতর-বউ, দু-দিন থাকতে গেলে, কতদিন যাও নাই বাপের বাড়ি, তা একদিন বাদেই ফিরে এলে ক্যানে? ননদ শুদুইলে বটে কিন্তুক গিন্নি লয়। ঐ মানুষ কি সব বুঝতে পারত? আমি আর থাকতে না পেরে নিজে থেকেই বলে ফেললম সব কথা শুনে গিন্নি বললে, ভয় কি মেতরবউ, আল্লার দুনিয়ায় সব জায়গাই সোমান। তা বেশ করেছ, ছেলেমেয়ে নিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে এয়েছ। কত্তাও শুনে তেমন কিছু বললে না, খানিক চুপ করে থেকে শুদু বললে, ভয় পেয়ে কি কিছু হয়, সাবধান হওয়া দরকার।
ঠিক কথা। হিঁদুদের মা-শেতলা লিকিন যোবতী নারী, গাঁয়ে তার পুজো হয়। তাইলেও সি কি কথা শোনে! আর মোসলমানদের ওলাবুড়ি নিজের নোংরা কাপড়ের পুঁটুলিটো নিয়ে গুটগুট করে মাঠ-ঘাট পেরিয়ে হেঁটে আসবে, ঐ কুঁজো বুড়িকে এক লহমার লেগে কেউ থামাইতে পারবে না। আসতে অনেক সোমায় লাগতে পারে, মনে হবে বুড়ির পা বুঝি ভেঙে পড়ছে, এইবার বুড়ি মাঠের মদ্যে মরা শুকনো কাঁকড়ার খোলের মতুন পড়ে থাকবে। তা লয়, সে ঠিক এসে ঢুকবে গাঁয়ে। এবার এমন রোদ, এমন গরম, এক দিনও বিষ্টি হয় নাই, আমের বোলগুনো সব শুকিয়ে গেয়েছে, বড় বড়। পুকুরের পানি শুকিয়ে খালি কাদাপানি আছে। মারী-মড়ক এলে ওমনিই হয়।
একদিন বাদেই ডোমপাড়ায় দু-একজনার নামুনির খবর পাওয়া গেল, তাপর দু-দিন কি তিনদিন পেরোয় নাই, সারা গায়ে লাউটো ছড়িয়ে পড়ল। অ্যানেক রোগের মতুন ই রোগেরও চিকিচ্ছের কুনো বালাই নাই। তা সোমায় নেবে না, ভাবতে দেবে না, শোক করতেও দেবে না। এক বাড়িতে একজনা মরল, তার দাফন-কাফন হতে না হতে আর-একজনা মরল। পাশাপাশি বাপ আর ব্যাটার লাশ, নাইলে মা আর মেয়ে, নাহয় দু-বুন, দু-ভাই–এমন আবস্তা, দাফন-কাফন করবে কে? কবর খুঁড়বে কে? হিঁদুদের মড়া হলে পাঁচ কোশ দূরের শ্মশানে পোড়াইতে নিয়ে যাবে কে? সোমায় কি করে পাওয়া যাবে? ভাররেতে ভেদবমি অরম্ব হলো, দিনটোও গেল না, সাঁঝের আগেই শ্যাষ। পানির মতুন দাস্ত হচে, আর চাল ধোয়া শাদা পানির মতুন বমি হচে, একবার থামাথামি নাই। যাতে ভেদবমি হচে, রুগির ত্যাতো লাগছে পিয়াস, উঃ সি কি পিয়াস, দুনিয়ার পানি এক চুমুকে শ্যাষ করবে। এমনি করে করে দোপরের পর থেকেই নেতিয়ে পড়বে, জেরবার হয়ে যাবে, হাত-পায়ের আঙুলে খাল লাগবে। চিকিচ্ছে-মিকিচ্ছে বাদ দিয়ে ত্যাকন একটোই কাজ–মওত আসার আগে পয্যন্ত কি করে রুগিকে এট্টু আরাম দেওয়া যায়। একজনা পাখা করে, বাতাস দেয়, আর-একজন হাতের পায়ের আঙুল টেনে টেনে সোজা করে। শ্যাষকালে রুগির গাল বসে যায়, চোখ কোটরে ঢুকে যায়, রুগি চোখে দেখতে পায় না, তারপর সুয্যিও ডোবে রুগিও চোখ বোজে।
চার-পাঁচ দিনের মদ্যে বাগদিপাড়া, মুচিপাড়া, বাউরিপাড়া পেরিয়ে এসে বামুনপাড়া, আগুরিপাড়া, তিলিপাড়ায় ঢুকে পড়ল ওলাউটো। মোসলমান পাড়াতেও ঢুকলে, তবে এট্টু দেরিতে। সি যি কি হতে লাগল, উরি বাপরে! পেত্যেকদিন একটো-দুটো-তিনটো করে যেতে লাগল। তাইলে কি কেউ বাঁচবে না? আমি ক্যানে বাপের বাড়ি থেকে ছেলেমেয়ে নিয়ে পালিয়ে অ্যালম? বাঁজা-বউটির কথাই সত্যি, যোম পেচু পেচুই আসে, যাকে চেনে তাকে ধরে-বেঁদেই নিয়ে যায়। এই বেপদে কত্তার মাথা কিন্তুক একইরকম ঠান্ডা। সে বাড়ির ভেতরে এসে বললে, মা, কেউ যেন না-ফুটনো পানি খায় না। এ রোগ মাছিতে আনে, খাবারের ভেতর দিয়ে আসে। খাবারের ভেতর দিয়ে না গেলে কিছুতেই এ রোগ হবে না। না-ফুটনো পানি এক ফোঁটা কেউ খাবে না, বাড়ির বাইরে কেউ কিছু খাবে না, সব খাবার ঢাকা দিয়ে রাখো। বাসি আর ঠান্ডা খাবার সব ফেলে দাও।
কত্তা যা যা বললে গিন্নি ঠিক ঠিক তা-ই করলে। বাড়ির কারুর সাধ্যি হলো না যি তার একটি কথা অমান্যি করে। গাঁয়ের ভেতরে পাড়ায় পাড়ায় যেয়ে কত্তা এই কথা সবাইকে বললে বটে কিন্তুক কে শোনে কার কথা? আর শোনা কি সোজা কথা? কে অত জ্বালট জোগাড় করবে আর পানি ফুটোবে? এটুখানিক পানিতে আর কি হবে, টিউকলের পানি, পোস্কারই তো রয়েছে, ঐ খেলে আর কি হবে এই মনে করে লোকে পানি খেচে। আ-ঢাকা ঠান্ডা খাবার তো আখছার খেচে। খাবার কি শস্তা, ফেলে দেবে ক্যানে, খেয়ে ফেলছে। কিন্তুক ই বাড়িতে কত্তা এমুনি করলে যি উসব করার কুনো উপয় থাকল না।
