তাইলে ইবার কেরমে কেরমে যুদ্বু এসে বাড়ির মদ্যে ঢুকে যেচে। পেলেন তো অনেকদিন থেকেই দেখছি। পাখির মতুন ঝাকে ঝুঁকে আসছে, যেচে। পেথম পেথম হাঁ করে আসমানের দিকে তাকিয়ে দেখতম। ত্যাকন আসতও অনেক কম। একটো-দুটো। গুড়গুড় করে আওয়াজ হতো, ম্যাঘের আওয়াজের মতুনই কিন্তুক ম্যাঘ তো লয়, আকাশে ম্যাঘের বংশ নাই, মাঘ ডাকার আওয়াজ আসবে কোতা থেকে! তাপর দেখতম, আসমানের এক কোণ দিয়ে পাখির মতো উড়ে এল পেলেন। রোদে ঝকঝক করছে, তাকিয়ে দেখতে গেলে চোখ ধাঁধিয়ে যেচে। পাখির মতুনই ড্যানা আছে বটে কিন্তুক সি ড্যানা থির, পেথম পেথম দেখে ভারি অবাক লেগেছিল। য্যাতো এগিয়ে আসছে, গুড়গুড় আওয়াজ ত্যাতোই বাড়ছে। দেখতে দেখতে মাথার ওপর দিয়ে কোনাকুনি আকাশ পেরিয়ে মিলিয়ে গেল। কখনো একটো, কখনো দুটো। দেখতে ওইটুকুনি লাগছে বটে, শুনেছি, আসলে ছোটখাটো একটো বাড়ির মতুন। কান-ফাটানো আওয়াজ করতে করতে মাথার একদম ওপর দিয়ে যাবার সোমায় দেখেছি, সত্যি অত ছোট তো লয়, বেশ বড়।
তা এই পেলেনও দেখছি অ্যাকন অ্যানেক আসছে আর য্যাখনত্যাখন আসছে। আজকাল আর খেয়ালও হয় না। একসাথে আট-দশটোও আসছে, অত খেয়াল করবে কে? দিনের মধ্যে কতোবার যি আসছে যেচে, কতরকম করে আসছে, একটোর পেছনে দুটো, পাশাপাশি চারটো, ছামনে তিনটো, পেছনে তিনটো, ডিগবাজি মারছে–নিজের মনে কাজ করছি, একবার একবার তাকিয়ে দেখছি, কি দেখছি তা-ও খেয়াল হচে না। অ্যাকন মনে হচে, তাই তো, যুদ্বুর গাড়িঘোড়ায় দ্যাশ যি ভরে গেল। আজ রাস্তায় য্যাতো গাড়ি দেখেছি, মনে হচে, তাইলে সারা দ্যাশে না জানি কতো গাড়ি এয়েছে আর তাদের সাথে কতো সায়েব, কতো গোরা সেপাই ই দ্যাশে এয়েছে! যুদ্ধ এখন নাই কিন্তুক দ্যাশ ভরে গেয়েছে যুক্ষুর সরঞ্জামে। আমরা গাঁয়েগঞ্জে অত দেখতে পেচি না, শহর-নগর তাইলে নিচ্চয় ভত্তি হয়ে গেয়েছে। হঠাৎ ভয়ে আমার বুক হিম হয়ে গেল। এত সাজ-সরঞ্জাম, এত আয়োজন তবু যুন্ধুর তো কিছুই নাই অ্যাকন। তাইলে য্যাকন যুদ্ধ দ্যাশে আসবে ত্যাকন কি হবে?
আমার খোঁকা দেখছি উত্তর-দুয়োরি ঘরের উসারায় বসে হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। গুড়গুড় আওয়াজ হচে দখিন-পশ্চিম কোণে। দেখতে দেখতে আট-দশটা পেলেন এগিয়ে এল। কতো ভঙ্গি করছে, দুটো এগিয়ে আসছে, আবার পিছিয়ে যেচে আর খালি ডিগবাজি দিচে, ইসব কি খেলা? খোঁকা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কি মনে হলো, ছেলেটোকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরলম।
সব যেন কেমন কেমন লাগছে। কবছর আসি নাই ঠিক, তা বলে কিছুই তো বদলায় নাই। বুন তিনটো বড় হয়ে গেয়েছে, তিনজনাই সোন্দরী একজনা যেন রাজরানী হবার লেগেই জন্মাইচে, তার রূপ দেখে ভয় লাগে। আর একজনার মাজা মাজা রঙ, টানা টানা চোখ, কোমর পয্যন্ত লম্বা চুল আর ছোটটোর দিকে তাকাইলে চোখ বেঁধে যায়–পাড়াগাঁয়ে এত রূপ–কি করে যে কি হবে! আজকাল আবার মেলিটারিরা সব গাঁয়ে ঢুকতে শুরু করেছে।
রাতটো ক্যানে যি এতো অসোয়াস্তিতে কাটল জানি না। নতুন মায়ের সাথে পিতিবার কতো কথা হয়, ইবার কথা খালি কেটে কেটে যেচে। বড় হয়েছে বলে কি না জানি না, বুনরাও যেন কি কথা বলবে খুঁজে পেচে না। মনে হলো, অনেকদিন পরে আসা হয়েছে তো, তাই এরকম হচে, দু-একদিন বাদে আবার সব আগের মতুন হয়ে যাবে। এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি, সকালে ঘুম ভেঙে উঠে দেখি, বেলা অনেকটাই হয়েছে। অন্য অন্য বার আমি বাড়ি এসে পৌঁছুলেই গাঁয়ের মেয়ে-পুরুষ অনেকেই বাড়িতে দেখা করতে আসে, কতো গপ্পো-গুজব করে। ইবার আর তেমন কেউ আসে নাই। তাই আমি ভাবলম, হাত-মুখ ধুয়ে আমি বরঞ্চ একবার পাড়াটো ঘুরে আসি। গাঁয়েরই মেয়ে তো আমি!
এইবার যাব, এইবার যাব করছি, এমন সোমায় খবর এল, মীরপাড়ার ওলি মামুর ভোরবেলা থেকে ভেদবমি অরম্ব হয়েছে। শুনে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। স্বপনেও ভাবি নাই, ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি আসব আর এই মহামারী রোগ ই-গাঁয়ে অরম্ব হয়ে যাবে। দু-বছর তিন বছর বাদে বাদে ই রোগদুটি ভালো কথায় বলে কলেরা আর বসন্ত–লোকে এমনি বলে পেট-নামা নামুনে আর মা-শেতলার দয়া–এই রোগটি আসবেই, কেউ ঠেকাইতে পারবে না। আর যি বছর আসবে গাঁ-কে গা একদম উজাড় হয়ে যাবে। গেল দু-তিন বছর ক্যানে জানি না ভুলে ছিল আর অ্যাকন অরম্ব হবি তো হ আমার বাপের বাড়ির গাঁয়েই শুরু হয়ে গেল। এই সকালবেলাতেই ওলি মামুর খবর প্যালম। সোমায় তো বেশি নেবে না, হয়তো বৈকালবেলাতেই শুনব ওলি মামু আর নাই। শুনে অবদি নিজের কথা ভাবছি না কিন্তুক ছেলেমেয়ে কারুর যেদি কিছু হয়, তাইলে কত্তার কাছে কি জবাব দেব? এই জায়গায় কত্তার কাছে কুনো মাপ নাই। কেন তুমি সাথে সাথে ফিরে এলে না? যা হবে আমার চোখের সামনে হবে। আর কুনো কথা সি শুনবে না। মাকে বললম, ও মা, আমার যি খুব খিদিবিদি লাগছে। এই কথা শোনবার পর থেকে আমি যি কিছুতেই থির থাকতে পারছি না। মায়ের বুদ্ধি যি কি ঠান্ডা, আমার কথা শুনে বললে, মা, ছেলেমেয়ে নিয়ে তুমি কালই বাড়ি ফিরে যাও। যার ধন তার কাছে যাও। এই কথা আমিও ভাবছি। দিন ভালো হলে আবার আসবে। তোমার ভাইকে বলছি, কালই দিয়ে আসুক তোমাদের।
চলে যাব শুনে বুনরা কাঁদতে লাগল। সারাবছর তারা বসে থাকে। কখনো বছরের পর বছর এন্তেজার করে থাকে কবে তাদের বুনপো-বুঝি আসবে। তাদের নিয়ে কি কি করবে তারা খুঁজে পায় না। আর ইবারে আজ এসে কাল তাদের যেতে হবে!
