আমি গাড়োয়ান ছোঁড়াটোকে বললম, কি র্যা, কিছু বুঝলি? সে দাঁত বার করে হেসে বললে, শুনেছেলম বটে ইদিকে কোথা মেলিটারি ঘাঁটি করেছে। দিন নাই, রাত নাই, উয়াদের গাড়ি যেচে আসছে। বলতে বলতেই সে ঘাড় ঘুরিয়ে কি দেখে বললে, উই দ্যাখো, মেলিটারি গাড়ি আসছে।
এই রাস্তায় কুনোদিন তেমন গাড়ি-ঘোড়া দেখি নাই। বাস অবশ্যি চালু হয়েছে হালে। সকালে দোপরে সাঁঝবেলায় এই মাত্তর তিনটে বাস। রাস্তা সারাদিনই সুনসান থাকে। গাড়োয়ান ছোঁড়ার কথা শুনে আমি কি একটো বলতে গেলম, আর তখুনি সেই মেলিটারি গাড়িটো এসে পড়ল। ধুলোর মদ্যে ছিল বলে এতক্ষণ দেখতে পাই নাই, অ্যাকন দেখলম, একটো ছোেট গাড়ি। পরে নাম জেনেছেলম এই গাড়িগুলিনকে জিপগাড়ি বলে। খাকিরঙ একটু দূরে গেলেই আর দেখতে পাওয়া যায় না। দেখতে দেখতে গাড়িটো আমাদের গাড়ির কাছে এসেই বাঁশি দিলে। সি বাঁশির আওয়াজ যেন কেমন, গা-টো রি রি করে উঠল, হাঁড়ি চাচার আওয়াজ যেমন হয় তেমনি। বাঁশি একবার দিলে, দুবার দিলে–যেন তর সইছে না। ত্যাতোক্ষণে গাড়োয়ান ছোঁড়া ভয়ের চোটে মোষদুটোকে ডাকিয়ে হুড়মুড় করে গাড়ি নিয়ে মাঠের মদ্যে নেমে গেয়েছে। যেমন করে গেল আর একটু হলেই গাড়ি উল্টিয়ে যেত। উদিকে জিপগাড়ি রিরিরিরি করে বাঁশি দিতে দিতে আমাদের পেরিয়ে গেল। এক লহমার মদ্যে দেখলম, দুজনা না তিনজনা গোরা সোলজার বসে বসে হি হি করে হাসছে। মেয়েমানুষ দেখছে, তা আবার বেপদে পড়া মেয়েমানুষ, হাসবেই তো। বাঁদরের পোঁদের মতুন লাল মুখ, গোরো ধপধপে বসে আছে এক একটো যেন পৰ্বত!
গাঁ যেতে এই এক কোশ পথটো আর যেন ফুরুইতে চায় না। ঐ গাড়িগুনো একটার পর একটো আসছেই। সয়রান থেকে আমাদের মোষের গাড়ি মাঠে নামাইতে সোমায় পাওয়াও যেচে না। মোযদুটো ভয় পেয়ে ছুটে নামতে যেয়ে গাড়ি উল্টিয়ে যাওয়ায় মতুন হচে আর রিরি করে বাঁশি বাজাইতে বাজাইতে জিপগাড়ি বেরিয়ে যেচে। একটো পেরুইচে তো আর একটো আসছে–কারাল নাই। পেত্যেক গাড়িতে। একজন দুজনা করে সেই হুমদোমুখো গোরা সায়েব বসে আছে। কেউ হাসছে, কেউ হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে, কেউ আমাদের বেপদ দেখে ভারি মজা পেয়ে খারাপ অঙ্গভঙ্গি করছে। এইরকম করে কতো গাড়ি যি গেল, কতোবার যি মাঠে আমাদের গাড়ি নামাতে হলো তা আর হিশেব নাই। এই এক কোশ রাস্তা মনে হতে লাগল আর কুনোদিন শেষ হবে না। পেছু দিকে দূরে গাড়ি দেখলেই তরাস হতে লাগল–এই ছোঁড়া, গাড়ি নামা র্যা বলতে বলতে গাড়ি চলে আসছে বাঁশি বাজাইতে বাজাইতে। কাছে এসেও যি জোরে আসছিল তা একটুও কমাইছে না। বোঝাই যেচে, আমাদের গাড়ি রাস্তা থেকে সরাইতে না পারলে সব ভেঙেচুরে ওপর দিয়েই চলে যাবে, ছেলেমেয়ে নিয়ে আমরা মরে থাকলেও ওরা একবার ফিরে তাকাবে না। পরের গাড়িটো হয়তো আমাদের লাশের ওপর দিয়েই চালিয়ে দেবে। অ্যাকন দেখছি, শুধু গাড়োয়ানটোই লয়, দূরে গাড়ি দেখলেই আমার ছেলেমেয়েদুটিও ভয়ে নীল হয়ে যেচে। একটো পার হচে, নিশ্বেস ফেলছি, আবার একটো আসছে। সি যি কি বিভীষিকা হয়েছিল, কুনোদিন ভুলব না।
শ্যাষ পয্যন্ত গাঁয়ে ঢোকার বাগদিপাড়ার ঢালটো এলে জানে যেন পানি এল। মনে করি নাই যি ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়ি পৌছুইতে পারব। ছোট ভাইটি বাড়িতেই ছিল, তাকে ইসব কথা বলতেই বললে, অ, তোমরা জানো না বটে। তোমাদের উদিকে এখনো তো ইয়ারা যায় নাই, জানবে কি করে? ইদিকে খুব উপদ্রব হচে। তিন কোশ দূরে সয়রানের পাশেই উােের বেরাট ড্যাঙায় মেলিটারিরা অ্যারোডম করেছে। ছারখার করে দিলে এলেকা। গরু-ছাগল-মুরগি এন্তার খেয়ে ছয়লাপ করে দিচে। এই হুজুগে কতো ব্যাবসাই করছে গাঁয়ের লোকে, তা করুক। কিন্তুক শালারা জানে বাঁচতে দেবে বলে তো মনে হচে না। আজ তোমাদের গাড়ি ভেঙেচুরে দেয় নাই ভাগ্য ভালো। পিতিদিন রাস্তায় কতো বেদম যি উয়ারা ঘটাইচে, কি বলব! গরু-মোষের গাড়ি একটো-দুটো তো পত্যেকদিন ভাঙছেই, কত শেয়াল-কুকুর-ছাগলগরু-মোষ পেত্যেকদিন চাপা পড়ছে। শালাদের জানে দুখ-দরদ বলে কিছু নাই—ছামনে রাস্তায় কিছু যি দেখলি, এট্টু আস্তে চালা–তা লয়, একটুও কমাবে না। গাড়ি নিয়ে মানুষ সরতে পারলে ভালো, নাইলে সোজা এসে মেরে দেবে। তাইলে বলি শোনো, সিদিন মারলে একটো গাড়িকে, গাড়ি যেয়ে পড়ল রাস্তার পাশে গাবায়। একটো চাকা খুলে গড়িয়ে কুনদিকে চলে গেল, যি মুনিষটো চালাইছিল সে-ও ছিটকে কোথা যেয়ে পড়ল। ইদিকে ডাইনের হেলে গরুটো, যেটো গাড়ি টানছিল, তার একটা পা ভেঙে সি ত্যাকন গাবায় পড়ে আছে, তার গলায় লেগেছে গলান্দির দড়ির টুসি। জোয়াল উঠেছে আসমানে, কিছুতেই গলান্দির দড়িটো আমি আলগা করতে পারলম না–গরুটোর চোখের দিষ্টি কি রক্ত বেরিয়ে এল গো চোখ দিয়ে! হাতে ছুরিকাটারি কিছু নাই, দড়িটো কেটে দিতে পারলম না। গরুটো ছটফট করতে করতে নিস্তেজ হয়ে শ্যাষে মরে গেল। জ্ঞান হয়ে মুনিষটোর কি কঁদন!
কথা শুনে ছোট বুনটি বললে, খালি উ কথা লয়। উয়ারা লিকিনি অ্যাকন গাঁয়ে-ঘরে ঢুকছে, যা মনে হচে তা-ই টেনে নিয়ে চলে যেচে। সিদিন তোমাদের বললম না–গা ধোব বলে ঘাটে গেয়েছি, গা ধোয়া হয়ে গেয়েছে, গামছাটো নিংডুতে নিংডুতে উঠে আসছি—এমন সোমায় পেছু দিকে শিস দেবার আওয়াজ শুনে যেই ফিরে তাকিয়েছি, দেখি এই একজনা লালমুখো সায়েব পুকুরের ওপারে দাঁড়িয়ে একটো ছবি তোলার কালো বাসো আমার দিকে তাক করে আছে। তাই দেখে আমি ছুটেমুটে বাড়ি এসে মাকে সব বললম। শুনে ভাই বললে, কই আমি তো শুনি নাই, খবরদার আর ঘাটে যাবি না।
