এইবার খবর আসতে লাগল খুব কাপড় চুরি হচে। লতুন কাপড় লয়, পুরনো কাপড়ই চুরি হচে। সোয়ামি-স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে শুয়ে আছে, ভাঙা দুয়োরটো ঠেসানো–সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখছে। বউটির পরনের একটি কাপড় কে নিয়ে গেয়েছে। দুটোর বেশি কাপড় ই দ্যাশে কারই বা থাকে? বড়লোকের বাড়ির বউ-ঝিদের দু-একটো তোলা-শাড়ি, বিয়ের বেনারসি কাপড় ইসব তোরঙ্গে ভোলা থাকে। সিসব লয়, ঐ গরিব বউ মানুষটিরই দুটি শাড়ির একটি, কিংবা একমাত্র শাড়িটি চোরে নিয়ে গেয়েছে। ভিজে কাপড় অ্যানেক-সোমায় বাইরে এগনেতেই দড়ি কিংবা তারে শুকোতে দেওয়া থাকে, এতকাল তা-ই থাকত। অ্যাকন আর তা কেউ করে না। ঘর থেকেই কাপড় চলে যেচে। এত দুঃখের মদ্যে বলতে হাসিও লাগে, একপাড়ার বউয়ের কাপড় ভিনপাড়ার বউয়ের পরনে লিকিন দেখা গেয়েছে। ই বেপারে হিঁদু-মোসলমান বাছাবাছি নাই। কাপড়ের টানাটানি সবারই। কাপড় লাগবে সবারই। বোঝাই যেচে, কাপড় যারা চুরি করছে তারা চোর লয় বরঞ্চ আসল চোরই অ্যাকন চুরি করা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তুক তা বললে হবে ক্যানে? আমাদের সেবোর মায়ের কাপড় অমুকের বউয়ের পরনে দেখা যেচে যি!
এমনি কথা বলে বাড়ির পুরুষ মরদটো যেচে সেই বাড়িতে। এক রঙের কাপড় হয় না? তোমার বউয়ের শাড়ির মতুন রঙ কি দুনিয়ায় আর একটোও নাই? কারুর কাপড়ে কি নাম লিখে দিয়েছে কোম্পানি?
আমাদের সেবোর মায়ের শাড়ির এককোণে পাকা জামের রঙ লেগেছিল। এই দ্যাখো সেই কষ।
ক্যানে, জামের কষ কি আমাদের বাড়ির গোঁদানির মায়ের শাড়িতে লাগতে পারে না?
এইসব কথা নিয়ে মরদে-মরদে, বউয়ে-বউয়ে সি কি তুলকালাম ঝগড়া, মারামারি!
এমনি য্যান আবস্তা, ত্যাকন একদিন শোনলম, ছায়রাতুনবিবির লাতিনি মেয়েটি এখনো বিয়ে হয় নাই, সোমত্ত মেয়ে সেই মেয়ে ন্যাংটো হয়ে ঘরে বসে আছে। ছায়রাতুন বুড়ি ক্যানে বেঁচে আছে কেউ বলতে পারবে না, সোয়ামি-পুত্তুর-ভাই-বেরাদর কেউ নাই তার। সব পুড়িয়ে খেয়েছে, শুদু ঐ লাতিনটো আছে। বোধায় ঐ লাতিনটোর লেগেই বেঁচে আছে। তাদের মতুন তাদের ভিটেটোও বেআব্রু। একটোই মাটির কুটুরি। ভিটেঘেরা মাটির দেয়াল এককালে ছিল, এখনো তার কিছু কিছু চেহ্নত আছে, এই পয্যন্ত। ঘরটোর দেয়ালও জায়গায় জায়গায় ভাঙা, দরজার বালাই নাই, একটো ছেড়া চট টাঙানো থাকে, চোরে সিটি নেয় নাই–ভাগ্যিস নেয় নাই। পায়খানা-পেশাব করতে ঐ চটটো পিদে লাতিনি বাইরে আসে। বুড়ি লিকিনি বলেছে, নিজের শাড়িটি লাতিনিকে দিয়ে সে ন্যাংটো হয়ে বাড়িতে কাজ করবে, ন্যাংটো হয়ে গাঁয়ের রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে। সে কি অ্যাকন আর মেয়েমানুষ যি লাজ-শরম থাকবে? উসব ধুয়ে-মুছে খেয়ে নিয়েছে সে। সে ন্যাংটোই ঘুরবে। বলেছে, দেখি গাঁয়ের লোকে কি করে! সিদিন রাতে খেতে বললে কত্তা এমন করে হাত নাড়লে যি আর একবার বলতে সাওস হলো না। গা-মাথা মোটা একটা কাপড় চাপা দিয়ে শুয়ে থাকলে।
২০. আবার অ্যানেকদিন বাদে বাপের বাড়ি
তা অ্যানেকদিন বাদেই বটে! আগের মতুন আর আনন্দ হয় না। বাপজি মারা গেয়েছে বছর চারেক হলো! অসুখের খবর লয়, আমি একেবারে মরার খবরই পেয়েছেলম। কষ্ট কিছু হয় নাই তার। মুখ দিয়ে রক্ত উঠেছিল। ই রোগের নাম লিকিনি সন্ন্যাস রোগ। ওষুধ-পানি আর করতে হয় নাই, ডাক্তারও ডাকতে হয় নাই। খানিকক্ষণের মধ্যেই সব শ্যাষ।
তা সোংসারের ইতর-বিশেষ আর কি হবে? বৈমাত্র ভাইটি বেশ জোয়ান হয়ে উঠেছে। তিন বুনের একটোরও অবশ্যি বিয়ে হয় নাই। জানি, উসব আবার কত্তাকেই করতে হবে। বাপজির তেমন বয়েস। হয় নাই, আরও অনেকদিন বাঁচার বয়েস ছিল। আত্মীয়-কুটুম সবাই এয়েছিল। খবর পেয়ে আমি তো অ্যালমই। এক দিন থেকে আবার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে গ্যালম। সোংসারে অসুবিধা তেমন কিছু নাই। বাপজি ভালোই রেখে-থুয়ে গেয়েছে। ভাই যেদি উড়িয়ে-পুড়িয়ে না দিয়ে এট্টু দেখেশুনে রাখে, তাইলে সোংসার ভালোই চলবে।
যাই হোক, চার বছর আমার বাপের বাড়ি আসা হয় নাই। অ্যাকনকার বড় খোঁকা আর আমার সাথে আসতে চায় না। বড় হয়ে গেয়েছে, নিজের পড়া নিয়ে বেস্ত। মেয়ে আর চার বছরের খোঁকাটি নিয়ে আমি ইবার বাপের বাড়ি যেচি। ইবার অন্য রকম ভালো লাগছে। আগে মোষের গাড়ি করে ধু ধু তেপান্তর মাঠের ভেতর দিয়ে যেতম। অ্যাকন লতুন সড়ক হয়েছে, সেই সড়ক ধরেই গাড়ি যেচে। সড়ক লতুন বটে, তবে কাচা তো, বর্ষাকালে একহাঁটু কাদা হয়েছিল। জায়গায় জায়গায় রাস্তা ভেঙে এমন এঁটেল কাদা হয়েছিল যি মোযই কাদায় ডুবে যেত। অ্যাকন এই চোত-বোশেখে সেই কাদা শুকিয়ে একহাঁটু করে ধুলো হয়েছে। কি ধুলোই না উড়ছে, নিশ্বেস নিতে পারছি না।
বাপের বাড়ি যেতে এক কোশ দ্যাড় কোশ যেয়ে এই সড়ক ছেড়ে আবার আগের মতুন মাঠে মাঠে যেতে হবে। বাদশাহি পাকা সড়ক দিয়ে যাওয়া যায় বটে তবে সি খুব ঘুরপথ। সিদিক দিয়ে কে যাবে, মাঠে মাঠে যাওয়াই ভালো। গাঁয়ে যেতে শেষ এক কোশ আবার পাওয়া যায় পুরনো একটো পাকা সড়ক। এই সড়ক ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। আমাদের গাঁয়ের ভেতর দিয়ে গেয়েছে, কতো দূর গেয়েছে জানি না। এই সড়কে গাড়ি উঠলেই আমার মনে হয়, এই তো চলে এলম বাড়ি! মনে ত্যাকন খুব আনন্দ হয়। বাড়ির বউ আর বাড়ির মেয়ে বলে কথা! তফাত কতো! পাকা সড়কে উঠে আনন্দ ইবারও হছিল, যেদিও আগের মতুন লয়। এট্টু বাদে সি খুশিটো-ও মাটি হয়ে গেল য্যান পেছনের গরুর গাড়িটো পাশ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সোমায় গাড়োয়ান চেঁচিয়ে আমাদের গাড়োয়ানকে বললে, মেলিটারি গাড়ি হলে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে মাঠে নেমে যেও কিন্তুক, নাইলে তোমার গাড়ি ভেঙেচুরে মেলিটারি গাড়ি বেরিয়ে যাবে। মরলে, না বাঁচলে, ফিরে চেয়ে দেখবে না। এই বলে নিজের গাড়ি সে তাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল।
