কখনো কখনো মনে হয়, গাঁয়ের ভেতর ঘরের কোণে বসে আছি বলে কিছু বুঝছি না। শহরে হয়তো অনেক কিছুই হচে। কত্তা আগের মতুনই শহরে যায় বরঞ্চ এট্টু বেশিই যায়। ছোট দ্যাওর কোটে চাকরি করে। বিয়ে হয়েছে, একটি ছেলেও হয়েছে, তাদের নিয়ে শহরে বাসা করে থাকে। আমার ছোট ভাইটিও আর কলেজে যায় নাই। পড়াতে তার মন ছিল কিন্তুক তার আগে বাপের অভিশাপ কুড়নোর ইচ্ছা হয় নাই। সে-ও একটি বিয়ে করে ছোট একটি চাকরি জুটিয়ে শহরে বাসা ভাড়া করে থাকে। বাপজি মারা গেয়েছে আমার ছোট খোঁকাটি য্যাকন প্যাটে সে-ও তো ক-বছর হয়ে গেল। কিন্তুক একবার চাকরি আর সোংসারে ঢুকে পড়ে সে আর ল্যাখাপড়া করতে চাইলে না। দ্যাওর আর ভাইয়ের বাসা পাশাপাশি, বলতে গেলে একই বাড়ি। কত্তা শহরে গেলে এই দুই বাসাতেই যায়। বাড়ির সরু চাল, মুগ মুশুরি ডাল, ঘি এইসব দিয়ে আসে। শহরের খবর যা পাই, তার কাছ থেকেই পাই। কত্তা আজকাল পেরায়ই বলছে, যুদ্ধ লিকিনি পশ্চিমের দ্যাশগুনো থেকে আমাদের ইদিকে এগিয়ে আসছে।
তিলিপাড়ার আগুন বামুনপাড়ায় কেমন করে গেল দেখলে তোএইবার বুঝবে।
ছোট খোঁকাটি ত্যাকন দ্যাড়-দু বছরের হয়েছে, জম্মের পর কি অসুখ করেছিল, বাঁচার কথা ছিল না। নেহাত হেয়াত আছে তাই অ্যাকনো দুনিয়া দেখছে। বলতে গেলে অ্যাকন আর রোগ-বালাই কিছু নাই। বেশ মোটাসোটা হয়েছে, দু-হাতে দুই রুপোর বালা নিয়ে কাদাপানিতে খেলে বেড়ায়, শুদু বুকের ভেতর বিলুইয়ের মতুন ঘরর ঘরর আওয়াজটো আর গেল না।
ইয়ারই মদ্যে একদিন কত্তা বাড়ির ভেতরে এসে সেই আগের মতুন মা-বুনকে ডাকলে। গিন্নি এসে পাশে দাঁড়ালে বললে, বউদের কাপড় আনা হয়েছে, বছরে দু-জোড়া সবারই লাগে। মনে আছে, ছ-মাস আগে শাড়ি আনা হয়েছিল? এখন আর এক জোড়া করে সবারই লাগবে। তুমি সবাইকে যেমন যেমন দিয়ে দাও। কাছে এসে কাপড় দেখে গিন্নি বললে, ই কি কাপড় বাবা? এমন শাড়ি তো কখনো দেখি নাই। এ বাড়ির বউরা তো কুনোদিন এত মোটা শাড়ি পরে না। এ তুমি ফেরত দাওগা।
বাজারে আগুন মা, মিহি তাঁতের শাড়ি, চিরকাল যা তোমরা পরে এসেছ, সে আর বাজারে নাই। এ বড় বড় শহরে, কলকেতায় এখনো এখানে-ওখানে কিছু থাকতে পারে শহরগঞ্জে কোথাও তাঁতের মিহি শাড়ি আর নাই।
সে আবার কি বলছ, বাবা?
যুদ্ধের ফল এই বোধহয় শুরু হলো। ঘরে ঘরে সব তত বন্ধ। সুতো নাই, তাঁতিরা সব পেটে কাপড় বেঁধে বসে আছে। আজ সারাদিন বাজারে ঘুরে ঘুরে বহু কষ্টে এই মিলের শাড়ি কটি জোগাড় করেছি। বাজারে কাপড় মিলছে না, মিলছে না মানে মিলছেই না, এ কি কোনোদিন কেউ ভেবেছে? এই তত কাপড়, তার আবার কি চড়া দাম!
কাপড় দেখে আমাদের তো মাথায় হাত। চটের মতুন মোটা, মাড় কি দিয়েছে, জমিনে হাত দিলে হাত পিছলে যেচে, সুতো মিহি না মোটা বোঝাই যেচে না। একরঙা ম্যাড়মেড়ে সবুজ নাইলে খয়েরি পাড় আর কাপড়ের রঙ কি! শুনছি কোরা রঙ, ঘিয়েঘিয়ে, ধোপাবাড়িতে দিলে ধুয়ে শাদা করে দিতে পারবে। ই কাপড় ভিজলে যি কি ভার হবে, বোঝাই যেচে। জানি না, ই গরম দ্যাশে কেমন করে ই কাপড় পরব। ত্যাকন কি আর জানি, ই কাপড়ও আর দু-দিন বাদে জুটবে না। বোধায় ছ-মাসও যায় নাই, কত্তা এসে খবর বললে বাজারে কাপড় নাই। নাই তো নাই, কুনো কাপড়ই নাই, বিদ্যাশ থেকে কাপড় আনা হয় বন্ধ, নাহয় খুব কম। দিশি মিল-কারখানাগুলিনও কাজ করছে না। কুনো সুতো পায় না বলে গাঁয়ে গায়ে তাতিরাও সব তাঁত বন্ধ করে থুতনিতে হেঁটো দিয়ে বসে আছে।
উসবই কি যুদ্বুর লেগে? কবে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তিন বছর পেরিয়ে যেতে চলল। আর এতদিন বাদে পরনের কাপড় অমিল হবে?
কাপড় বেশ কিছুদিন থেকেই অমিল, কত্তা বললে, মেয়েদের কাপড় তবু এতদিন পাওয়া যাচ্ছিল, পুরুষদের জামা জোব্বা ফতুয়ার কাপড় অনেকদিন থেকেই টানাটানি। তা আমাদের এই গরম দেশে গরিব মানুষদের কজনই বা জামা পরে–ভদ্রলোকদেরও জামা-জুতো অতো না হলেও চলে যায়। কিন্তু মেয়েদের তো একটি শাড়িই সম্বল। যুদ্ধ কি, দেশের মানুষ এবার বুঝবে। এখন তো শুধু কাপড় অমিল মনে হচ্ছে মানুষ কি তবে ন্যাংটো থাকবে? একটিমাত্র জিনিশের অভাব হলে কি হয় দ্যাখো! বাঁচতে মানুষের বেশি কিছু লাগে না। তবু দু-একটি যা লাগে তার অভাব হলেই ভয়ানক কাণ্ড! কাপড় নাই, এর পর আর একটিই জিনিস যেমন ধরো ভাত নাই, তখন কি হবে?
যুদ্বুর কুনোকিছু তো এখনো ই-দ্যাশে হয় নাই। তাইলে হঠাৎ হঠাৎ এক একটো জিনিশ ক্যানে নাই হবে?
গাঁয়ের টিউবওয়েল থেকে পানি পাচ্ছ, প্রতিদিন, বাড়ির রাখালটা পানি নিয়ে আসছে, তাই তো? একদিন সে এসে বললে, পানি নাই কলে। তুমি কি জানতে, মাটির তলার যে পানি থেকে তুমি পানি পাচ্ছ, সেই পানি মাটির তলায় থাকবে যদি দূরের একটা নদীতে পানি থাকে। সেই নদীর পানি কবে শুকিয়ে গিয়েছে, তুমি জানোও না–কিন্তু একদিন দেখলে টিউবওয়েলে আর পানি নাই। এখনকার যুদ্ধই এইরকম, কিসের সাথে কিসের যোগ তুমি-আমি জানতেই পারি না। মাটি পাথর হচ্ছে, কেউ জানে না, তারপর দেখবে একদিন তামাম মাঠই পাথর চাষবাস সব শেষ!
ঐ হেঁয়ালি কিছুই বোঝলম না, কিন্তু বেশিদিন গেল না ছ-মাস না যেতেই শোনলম, চারিদিকে হাহাকার হচে, কাপড় নাই, মেয়েদের পরনে কিছুতেই কাপড় জুটছে না। কোথাকার মেয়েরা লিকিন কাপড়-বিহীন ন্যাংটো থাকছে। সে গাঁয়ে মেয়েরা দিনে তো কথাই নাই, রেতেও বাপ-ভাইয়ের ছামনে বেরুইতে পারছে না। বেশি কথা আর কি বলব–যা কুনোদিন ইসব দ্যাশে হয় নাই, এইবার তা-ও হতে লাগল। বরাবর দেখছি রেতে শোবার সোমায় কেউ দুয়োরে খিল দেয় না, বড়জোর ঠেসিয়ে রাখে। আমাদের বাড়ির কথা আলেদা। অন্য সব বাড়িতেই আমকাঠের দরজা, ত্যাড়াকা, একটো দিক হয়তো ভাঙা, হাঁসকল খুলে পড়ছে, খিল আছে কি নাই–দরজা তো লয়, যেন দরজার ছল। ও-তে আবার খিল দেবে কে? তার দরকারই বা কি?
