গাঁ যিদিন পুড়ল সেইদিন রেতে আমার যে আর একটি খোঁকা হয়েছিল, সে তো মরেই যেছিল। বাঁচার কুনো আশা ছিল না। বর্ষার মরশুমটো টিকবে কি না তাই খুব সন্দ। সি-বার বর্ষাও হয়েছিল তেমনি। সারা দিন সারা রাত গদগদ করে আকাশ ঢালছে তো। ঢালছেই। তা ঢালুক চাষবাস সবই আসমানের মুখ চেয়ে! বর্ষায় পানি যেদি না হলো, ধান হয় রোয়াই হবে না, নাইলে মাঠের ধান মাঠেই শুকুবে। কিন্তুক সিবার হলো উল্টো। এতই বিষ্টি যি চাষের ফাঁক পাওয়া যেচে না, বীজতলা তলিয়ে যেচে, রোয়া ধান ভেসে যেচে। সারা মাঠ পানিতে তম তম করছে। এমন বাদলে কচি ছেলেটোকে বাঁচানো কঠিন হয়েছিল। তা শক্ত জান নিয়ে এয়েছিল ছেলে। বর্ষাকালও শেষ হলো, সে-ও বেশ ডাগর-ডোগর হয়ে উঠিল।
এই সোমায় কত্তা একদিন বললে, বাড়িতে যেসব কাগজ-টাগজ আসে সেসব কি চেয়ে কোনোদিন দ্যাখো, না, অক্ষর-টক্ষর সব ভুল মেরে বসে আছ! কত্তার ব্যাকা কথায় আমিও বাকা কথা বললম। সোংসারের বত্রিশ জনার পিন্ডি রাঁধতে রাঁধতে অক্ষর-ফক্ষর সব চুলোয় গেয়েছে।
সত্যিই তো, পড়তে একদিন শিখেছেলম, কিছুই অ্যাকন আর মনে নাই। কতো দিন কিছু লিখিও নাই, কিছু পড়িও নাই। হপ্তায় হপ্তায় বঙ্গবাসী কাগজটো আজও আসে, আরও কতো কিসব আসে। কত্তা দেখি আজকাল সবই পড়ে। লোকটোকে অ্যাকন আর চিনতে পারি না। খুব ভদ্দরলোক ভদ্দরলোক লাগে। কুনো সময় খালি-গা হয় না। ধুতির ওপর হাতাঅলা গেঞ্জি পরে, না-হয় একটো কুনো জামা পরে। চোখে চশমা লাগায়। কত্তা দূরে যেচে, আমি যেখানকার সেইখানেই আচি। কত্তর দিকে চেয়ে লরম করে বললম, সাংসারের কাজে এত বেস্ত থাকি, এক লহমার ফুরসৎ পাই না। দুনিয়ার খবর আর কি করে রাখব?
আবার যে সারা দুনিয়ায় যুদ্ধের আগুন লেগেছে। আর কিছু না হোক বঙ্গবাসী কাগজটা একটু কষ্টোমষ্টো করে দেখো।
দেখে কি করব? সোংসারের কয়েদখানায় সারা জেবনের মেয়াদে কয়েদ খাটচি-কুন্ দ্যাশে যুদ্ভু হচে, কে যুঘ্ন করছে, কত লোক মরছে, কতো লোক খোড়া হচে, কতো দ্যাশ, কতো ঘর-সসাংসার ছারেখারে যেচে, তা আর আমি কি জানব? আমি য্যাকন চোদ্দ বছরের মেয়ে, আমার বিয়ের সোমায়ে য্যাকন এমনি সারা দুনিয়া যুদ্ধ হয়েছিল–কই কিছুই তো বুঝতে পারি নাই। বেঁধেছি, বেড়েছি, খেয়েচি, ছেলেপুলে মানুষ করেছি, যুদ্ধ নিয়ে কুনোদিন ভাবি নাই। তা আবার অ্যাকন সারা দুনিয়ায় যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলছ, তা হলোই বা, নিজেরা তো কিছু ট্যার পাব না। তার চেয়ে জষ্টি মাসে গাঁয়ে যি আগুন লাগল, গোটা হিঁদু-পাড়াটো পুড়ে গেল, সি ধাক্কা জানে যেয়ে লেগেছে তোমার এই যুন্ধুর চেয়ে অনেক বেশি।
এবার বোধ হয় অত সহজ হবে না। যুদ্ধ আর আগের মতো নাই। কত্তা বললে, ঢাল-তরোয়াল নিয়ে সামনাসামনি মারামারি-কাটাকাটি হতো সেখানকার যুদ্ধ সেখানেই থাকত। যতো রক্তারক্তি হোক, ঐ জায়গার বাইরে আর যুদ্ধ নাই। ঢাল-তরোয়াল দিয়ে যুদ্ধ করে আর কত লোক মারা যায়? কিন্তু এখন যে যুদ্ধ হবে তা একদম আলাদা। লাখ লাখ লোক যুদ্ধে যাবে, যুদ্ধ করবে, মরবেও লাখে লাখে অথচ হয়তো শত্রুকে চিনবেও না, দেখবেও না। আবার যারা যুদ্ধে যায়ই তোমার আমার মতো খুব সাধারণ মানুষ, তাদেরকেও মরতে হবে লাখে লাখে। হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষের শহরে মানুষ নিশ্চিন্ত মনে ঘুমুচ্ছে তো, আঁধার আকাশ থেকে বোমা মেরে বাড়িঘর-দুয়োর দেবে মাটিতে মিশিয়ে। কতো লোক যে মরবে তার কেউ হিসাব করতে পারবে না। লাশই পাবে না। মা পাবে না ছেলের লাশ, ছেলে পাবে না বাপের লাশ। এক-একটা লাশ ছিড়ে-খুঁড়ে কোথা যে পড়বে তা কেউ জানতে পারবে না।
কতো দূরে যুদ্ধ হচে, আমরা ইয়ার কি বুঝব? উ নিয়ে তুমি অত মাথা ঘামাইছ ক্যানে? কই, সেই আগের যুদ্ধতে তো কিছুই বুঝতে পারা যায় নাই! ঐ বঙ্গবাসী কাগজ আর কি কি সব ছাইভস্ম বাড়িতে আসে, ওইগুননাই য্যাতো লষ্টের মূল।
কত্তা একটু হেসে বললে, দুনিয়া জুড়ে কতো বড় বড় ব্যাপার হচ্ছে, কোন্ এক গাঁয়ের এক কোণে আমরা সব ছা-পোষা মানুষ পড়ে আছি। ঠিকই, আমরা আর এসব কি বুঝব? তবে আগে সব জানালাদরজা বন্ধ ছিল। এখন একটা-দুটো কাগজ-টাগজ আসে, বাইরের দুনিয়ার হাওয়া খানিকটা বোঝা যায়। হাওয়া ভালো মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে আগুন যেখানেই লাগুক, সারা দুনিয়ায় ছড়াবে। দুনিয়াটা বেওয়ারিশ সম্পত্তি নয় মনে রেখো। এরও মনিব-চাকর আছে। যেমন এইদেশে ব্রিটিশ মনিব, আমরা চাকর।
দিন যেতে লাগল, বছর ঘুরে গেল, যুদ্বুর কিছু কিন্তু আমরা বুঝতে পারলম না। সব আগের মতুন–সোংসারের চাকা ঘুরছে তো ঘুরছে। বাড়ির লোক কেরমাগত বেড়েই যেচে, ছেলেপুলেগুলো বড় হচে, একটি-দুটি করে জায়েদের সন্তান হচে। ঠিক আগের মতুনই সকালে সুয্যি উঠছে, সাঁঝবেলায় ডুবছে। বঙ্গবাসী কাগজটো এলে, কত্তার পড়া হয়ে গেলে, গাঁয়ের আর যারা পড়তে নিয়ে যায়, তারা ফেরত দিয়ে গেলে, একবার একবার চোখের ছামনে নিয়ে বসে থাকি। বিটিশ আর জারমেনি এই দুটো নাম দেখি বটে, আর আর নামও দেখি, তবে মনে থাকে না। ঐ দুটি নাম খুব বেশি দেখি বলে মনে থাকে। এক-একটো খবর ভালো করে পড়তে যাই, বিদ্যে কম, অ্যানেক কথাই বানান করে করে পড়তে হয়, তা-বাদে অতো কষ্ট করে পড়েও কিছু বুঝতে পারি না। বুঝব কি করে? উড়োজাহাজ দিয়ে একটো-একটো বড় শহরে বোমা ফেলছে, কামান-বন্দুকের গুলি মারছে–আহা আহা, সব ভেঙে গুঁড়িয়ে যেচে, সমুদুরেও আগুন লাগছে। কি ক্ষেতিই না হচে, কতো লোকই না মরছে! ইসবের হিশেব যি থাকছে না তা লয় কিন্তু আমার মাথায় ঢুকছে না। একের পরে একটো শূন্য দিলে দশ হয়, দুটো দিলে একশো হয় আর তিনটো দিলে হাজার হয়। এই পয্যন্ত জানি আর হাজার হলে কতো হয় তা-ও একটু একটু বুঝতে পারি। কিন্তুক তারপরে য্যাতো শূন্যই দাও, তাতে কতো হয় তা আমি কুনোদিনই শিখতে পারব না। আর পারলেই বা কি? এক হাজার কতো তা-ই মাথায় ঢোকে না, এক লাখ হলে কতো হয় তা কি কুনোদিন বুঝতে পারব? আর কাগজে য্যাতো হিসেব সব শূন্য দিয়ে। এই লেগে কাগজ পড়তে গেলেই বুকের মদ্যে খালি খাঁ খাঁ করে। হায় হায়, তামাম দুনিয়ার সব্বোনাশ হচে!
