আগুন লাগার খবর ঠিকই জানতে পারলম। এগৃনেয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলম আগুন উত্তর থেকে দখিন দিকে যেচে, পট পট ধুমধাম আওয়াজ হচে। পেথম যি লোক দেখেছিল, সে চেঁচাতে যেয়েও চেঁচাতে পারে নাই। তাকে বোবায় ধরেছিল। আগুন পেথমে যি দেখে সে লিকিনি গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে পারে না। বুকে বিশমণি পাথর চাপানো আছে মনে হয়। অ্যাকন অবশ্যি অ্যানেক মানুষ, সারা গাঁয়ের মানুষ আগুন নেভাইতে লেগে গেয়েছে। সবাই চেঁচাইচে, হৈ-হুল্লা-চিকার কানে আসছে। কি আচ্চয্যি, এত পুড়ছে, সব পুড়ে যেচে তবু মানুষের চেঁচানি শুনেই ভয় অ্যানেকটো কম লাগছে। কিন্তুক য্যাকন আগুনটো লেগেছিল, যি পেথম দেখেছিল তার দম আটকে গেয়েছিল, শব্দ বার করতে পারে নাই। আগুন লাগলে মানুষের যেন কেয়ামতের ভয় লাগে!
সেইদিনই সাঁঝ-লাগার কোলে কোলে বামুনপাড়ায় পোড়া আঁতুড়ঘরের মদ্যে ভশ্চায্যি-গিন্নির একটি খোঁকা হলো আর মাঝ–রেতের পরে আমারও গভূভের সন্তানটির জরমো হলো। সি-ও একটি খোঁকা। মনে হয় ঐ মাহা লঙ্কাকাণ্ড না হলে ঐদিন ভশ্চায্যি-গিন্নির ছেলে হতো না। আমার ছেলেটিও ঐ রেতে দুনিয়ায় আসত না। পরের দিন সকালেই ভশ্চায্যি এল বাড়িতে।
প্রলয় হলো হে প্রলয় হলো। প্রলয়ের মধ্যে পুত্রলাভ, আমারও হলো, তোমারও হলো। আমি ঐ হতভাগার নাম রেখে দিয়েছি ‘ভণ্ডুল’–তাই বলে তুমি ওরকম রেখো না। একটা ভালো সোজাসুজি নাম রেখে দিয়ে ছেলের।
সে তো হলো–এদিকে গাঁয়ের যে সর্বনাশ হয়ে গেল ভটচাজ!
তার আর কি করা যাবে বলো? নিয়তি কেউ খণ্ডাতে পারে না। তবে কথা হচ্ছে তুমি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, আমি একজন মেম্বার। তোমার সময়েই এমন আগুন লেগে আদ্দেক গাঁ পুড়ে ছাই হয়ে গেল, তোমাকেই এখন লোকের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।
ঐ শুরু হলো। সত্যিই আদ্দেক গাঁ পুড়েছিল। ঘরের সব জিনিশ লষ্ট হয়েছিল তো বটেই, বেশিরভাগ বাড়ির খড়ের চাল পুড়ে এমন দশা হয়েছিল যি দেখলে চোখের পানি রাখা যেছিল না। খালি পোড়া কালো কালো দেয়ালগুনো দাঁড়িয়ে আছে। আঁদার রেতে সিদিকে গেলে গা ছমছম করে। ঠিক যেন সার সার ভূত দাঁড়িয়ে রয়েছেমুখে রা নাই, সি যি কি আবস্তা বলা যেচে না। ছেলেমেয়ে নিয়ে রেতে থাকে কোথা? অ্যানেক ভদ্দরলোক গেরস্থ কি করবে, উঠনে বিছেনা পেতে খোলা আসমানের তলায় থাকতে লাগল।
আর এইবার দেখলম কত্তাকে। সে দিনকে দিন মানলে না, রাতকে রাত মানলে না। আশেপাশের বিশটো গাঁয়ে ছুটে বেড়াতে লাগল। এক দণ্ড বাড়িতে থাকত না।
কোনো কথা নয়, মানুষকে একটু মাথা গোঁজার ঠাই করে দিতে হবে। তারপর অন্য কথা। গাড়ি গাড়ি নতুন বাঁশ লাগবে, কাঠ লাগবে, খড় লাগবে, দড়ি, পেরেক, গজাল মোট কথা হচ্ছে বাড়ি করতে যা যা লাগে সব জোগাড় করতে হবে। মানুষের জন্যে ভিখিরি সাজতে, ভিক্ষে করতে দোষ কি? নিজের জন্যে তো নয়, হীন হবার কিছু নাই।
কত্ত হাত জোড় করে গাঁয়ে গাঁয়ে যেয়ে আবস্তাপন্ন চাষি গেরস্তদের কাছে বাঁশ-খড়-কাঠ এইসব যাচেঙ্গা করতে লাগল। চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল–হ্যাঁ, একটো মানুষের মতুন মানুষ বটে! হিঁদু-মোসলমান বলে কথা নয়, একজন মানুষ। কতো সুনাম তার হতে লাগল। লতুন রাস্তা হবার পরেও তেমন হয় নাই।
অসাধ্য কিত্তি করলে মানুষটো! একা করে নাই বটে, সবাইকে সাথে নিয়েই করেছিল এই কাজ–ইউনিনের মান্যগণ্য কত্তারা সবাই ছিল। তবু সবাইকে একসাথেই বা করতে পারে কজনা? সারা গাঁ যেন ঘুমিয়ে ছিল, মিশমার হয়ে ছিল, কত্তার ডাকে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠল। কেউ বসে নাই, সবাই কাজে লেগে গেয়েছে, যাদের কুনো ক্ষেতি হয় নাই আগুনে, তারাও সবাই কাজে লাগল। নিজের নিজের কাজটুকু করে আবার ঐ সাজারের কাজে হাত লাগাল। দরকার হলে লতুন করে মাটির দেয়াল করে দিচে, বাঁশ কাটছে, কাঠ চিড়ছে, ঘরামিরা এসে চালা তুলছে, বাঁশ-কাঠের কাঠামো তৈরি করে দিচে, তাপর খড় দিয়ে ছাইয়ে দিয়ে তবে ছুটি। টাকাপয়সা যেখান থেকে যা জোগাড় হয়েছিল, কত্ত সেখান থেকে যাকে যা দেবার, যাকে না দিলেই নয়, তাকে তেমনি করে মজুরি দিচে।
সত্যিই অবাক বটে। আষাঢ়-শাওনের বর্ষা-বাদল আসার আগেই আমাদের এই পোড়া গাঁ আবার নতুন হয়ে গেল। আগের চেয়ে লতুন। দূর থেকে দেখা যেতে লাগল সব লতুন ঘরের চাল। খড়ের রঙ তো সোনার মতুন! পুরনো কালো হয়ে যাওয়া চালগুনোর বদলে এই নতুন। ছাওয়ানো চালগুনো দূর থেকে সোনার মতুনই ঝকঝক করতে লাগল।
সব কাজ হয়ে গেলে কত্তা একদিন ভঞায্যিকে বললে, ছেলের ভণ্ডুল নামটি বাদ দিয়ে আর একটি নাম দাও ভটচাজ। ভণ্ডুল কিছুই হয় নাই।
তা আর ভঞায্যি করে নাই। ছেলের নাম ভণ্ডুলই রইল। সোনার ছেলে, তবু সারা জেবন ভণ্ডুল নামই বয়ে বেড়াইলে।
১৯. কি দিন এল, সারা দুনিয়ায় আগুন লাগল
পিথিমিতে এলম কিন্তুক পিথিমির কিছুই দেখলম না। কবে একদিন মায়ের প্যাট থেকে পড়লম, দুনিয়াতে এসে চোখ দুটি মেললম, হয়তো দুবার জোরে চিষ্কার করে কেঁদেছেলম, ঐ পয্যন্তই। তাপর এত কাল পার করলম, কিছুই দেখলম না পিথিমির। সারা জেবনে বাড়ি থেকে তিন কোশ চার কোশের বেশি যেতে হয় নাই। কেউ নিয়ে যায় নাই। মাঠ-ঘাট, ঘরবাড়ি, আসমান-জমিন ওইটুকুনই যা দেখলম। কবর কেমন হবে জানি না তবে মনে হয়, কবরের থেকে একটু বড় এই সোংসার। কবরের জায়গাটো তবু নিজের নিজের, সসাংসারের সবটো নিজের লয়। সংসারে থেকে যা দেখা যায়–আসমান-জমিন–সি তো কবরের বাড়া! সোংসার করতে করতে জান জ্বলে গেলে এইরকম মনে হয়। গাধার খাটুনি খাটতে খাটতে মনে হয়, পিতিদিন রাজ্যের লোকের পিন্ডির বেবস্তা করতে করতে হিমশিম খেয়ে গেলে মনে হয়। শাশুড়ি-ননদের বাঁদিগিরি করতে করতে মনে হয়। তারা নিজেরা বাঁদি-চাকর না ভাবলেও মনে হয়। জা-রা য্যাকন গিদের করে বসে থাকে, টিটেমি করে, গরজ ঠাওরায়, ত্যাকন ইসব মনে হয়। ত্যাকন যেন নিজের ছেলেমেয়ে-সোয়ামি-সংসার সবই বিষ। তা বিষ খেতে খেতে এমন হয়েছে যি অ্যাকন এই বিষেও নেশা লাগে।
