বড়লোকের জমি বাঁচানোর লেগে এরকম ঘুর কি একটোও হয় নাই?
তা কি আর না হয়েছে?
হ্যাঁ, লোকে অবিশ্যি বলতে পারে রাস্তা ছিল না, রাস্তা হয়েছে, লোকের চলাচলের সুবিধে হবে। এই পর্যন্ত। এত ঢোল পিটোবার কি আছে তা নিয়ে? লোকের চাষের জমি নিয়ে আবার সেই জমিরই দু-পাশের মাটি নিয়ে কুলি-মজুর লাগিয়ে রাস্তা তৈরি হয়েছে। উঁচু মাটির সরান, দু-পাশে তার লম্বা খালের মতো নালা, সেখানে চাষের কাজ কিছু হবে না। ক্ষতি তো মানুষের হয়েছেই। তবু বলা যায়, ক্ষতির চাইতে লাভই বেশি হয়েছে। তাই বলে ততো বাহাদুরির কিছু নাই। আমিও তাই বলি–বাহাদুরির কিছু নাই–কাজটা করার দরকার ছিল, আমি না করলে একদিন না একদিন আর কেউ করত। করতে হতোই একদিন, কপালগুণে আমার ওপরেই পড়ল দায়িত্ব। এ নিয়ে বুক ফুলিয়ে আমার বলার কিছু নাই। এমন করে কথা কত্তার মুখে কুনোদিন শুনি নাই। সে কথা বলেই যেচে।
আমি ভাবি অন্য কথা। একজন মানুষ দুনিয়ায় আর কদিন থাকে? কিন্তু মানুষ চিরকাল থাকবে। একজন একজন করে ধরলে কোনো মানুষই বেশি দিন দুনিয়ায় নাই তবু দুনিয়া ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত দুনিয়ায় মানুষ থাকবে। এই যে রাস্তা হলো, ধরো আমার অছিলাতেই হলো, আমার লোভলালসা যা-ই থাকুক, হলো তো রাস্তা, না কি? আমি দুদিন বাদে দুনিয়া ছেড়ে গেলেও এই রাস্তা থাকবে। কতোদিন থাকবে? আমি বলছি বহুকাল থাকবে, আর নষ্ট হবে না। রাস্তা হয়তো অন্যরকম হবে, পাকা হবে, কতো গাড়িঘোড়া চলবে, আমার তিনপুরুষ চারপুরুষ পরের মানুষেরা এই রাস্তা দিয়েই চলাচল করবে। কারুর মনে থাকবে না আমার নাম, আমাদের কারুর নাম। তবু রাস্তাটা থাকবে। এই মনে হলে মনে হয় আমিই চিরকাল থাকলাম।
কথাগুলি যা সে বললে সোজা কথাতেই বললে। সবকথা বুঝতে না পারলেও কিছু তো বোঝলম। যা বোঝলম তাতে আমার গা কিরকম করতে লাগল। কত্তা কেমন লোক? উকে কি আমি চিনি! উ যেদি সব সোমায়ে এমনি করে কথা বলত, তাইলে আমি হয়তো ওর সাথে ঘর করতে পারতাম না, খুব ভয় হতো। কিন্তুক তা লয়, ইরকম কথা সে আর কবার বলেছে?
১৮. পিথিমির পেজা আর কতো বাড়াব
এবারের সন্তানটি পেটে নিয়ে আমি খুব পেরেশান। কি আর বলব! নিজের ওপরেই নিজের রাগ হয়। কতো মনে হয় আর চাই না, আর বোঝা বইতে পারি না, কিন্তু জম্মের পরে তার শুদু মুখটি দেখা বাকি! কার কারসাজি জানি না, একবার যেই মুখটির ওপর চোখ পড়ল, একদিকে সারা দুনিয়া আর একদিকে ঐ নাড়িছেড়া সন্তান। কিন্তুক য্যাতত দিন জন্ম না হচে, পেটের ভারে সমদম, খালি মনে হয় আর দরকার নাই, আর কতো পেটে ধরতে হবে! নিস্তার কি কুনোদিন মিলবে না?
বাড়ির ছেলেমেয়েদের আর কতো হিশেব দোব! আমার দুটি আর একটি এল বলে। ল-বউ, ছোট বউয়ের একটি একটি খোঁকা হয়েছে। সেজ বউ দুটি খোঁকা রেখে চোখ বুজেছিল তবে বছর দুই আগে তার ছোটটি দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে চলে গেয়েছে। আট-ল বছরের হয়েছিল। একদিন দোপরবেলায় দুবার শুকনো বমি হলো, মুখ হয়ে গেল নীলবন্ন। তার মা নাই, লতুন মা কেবল ঘরে এয়েছে। সব কাজ বাদ দিয়ে সেই ছেলের সেবা গিন্নি একা করলে। আমার ননদকেও কাছে আসতে দিলে না। শাশুড়ি বুঝলে, এই মা-হারানো ছেলেটিকে তাকেই দেখতে হবে। অবশ্যি বেশি সোমায় লাগল না, দু-তিন দিনের মধ্যেই সে চলে গেল। এক-একজনার অমনি কপাল হয়, দুনিয়ায় আসে, কেউ তাকায় না, দেখে না, আদর-ভালোবাসাও তেমন জোটে না। তাপর হুট করে একদিন চলে যায়। চলে যাওয়াটোও তেমন কেউ খেয়াল করে না। ঐ ছেলেও অমনি কপাল করে এয়েছিল।
যাকগো, ত্যাকন আমি খুব পেরেশান, চলাফেরা করতে কষ্ট হয়। ভোগাবে মনে হচে পেটের এই সন্তানটি। এই সোমায় একদিন দোপরবেলায় হিঁদুপাড়ায় লাগল আগুন। এই এলেকায় আগুন লাগাটো যি কি বেপার তা মানুষে চিন্তা করতে পারবে না। শুকনোর সোমায়, ঝাড়া পনেরো দিন আসমান থেকে আগুন ঝরছে। দু-একটো বাদে সব বাড়িরই মাটির দেয়াল আর খড়ের চাল। খুব কম, একটি-দুটি বাড়ির চাল টিনের। তা মাটির বাড়ির বাহার কম হয় না, ই দ্যাশে এমন মাটি পাওয়া যায় যি তা দিয়ে ঘরের ভেতরের দেয়ালে চুনকামের কাজও হয়। আমাদেরই কটো ঘরের দেয়াল এমনি চুনকাম করা আছে। আর বাড়ির বাইরের দেয়ালগুনোয় মাটির মিহিন কাজ করে আলকাতরা লেপে এমন করা হয় যি শতেক বর্ষাতেও কিছু হয় না। কিন্তুক এত সৌন্দর্য হলে কি হবে, চাল যি সব খড়ের! কতো বাহার করে ছাঁচ কাটা! শালকাঠ, তালগাছের কড়ি, বাঁশ–এইসব দিয়ে চালের তলার কাঠামো এমন দবজ করে তৈরি যি বোশেখ জষ্টি আশিন কাত্তিকের ঝড়েও কিছু হবে না। কিন্তুক আগুনের কাছে সব জব্দ। আগুন লাগলেই মনে হয় সারা বাড়ি যেন ঠিক বারুদের গাদা। সিদিন দোপরে কোথা থেকে আগুন ধরল কে জানে? কামারশালা থেকে, না মোড়লবাড়ির চুলো থেকে, নাকি অন্য কুনো বাড়ি থেকে, নাকি আপনাআপনিই লাগল কেউ বলতে পারলে না। উত্তরপাড়ায় লাগল আর লহমার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এগুইতে লাগল দখিন-পুব দিকে। ই তল্লাটে গাঁয়ের রাস্তার দু-পাশে একটার পর একটা বাড়ি, চালে চালে লাগানো। ঠিক শহরের মতুন। খুব কাছে কাছে বাড়ি, দু-বাড়ির মাঝে একটোই পাঁচির কিংবা কুনো পাঁচিরই নাই। আগুন যি লাগল, ধুয়োইল, দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল তা কি কেউ দেখতে পেলে? দোপরবেলার আগুন কেউ দেখতে পায় না। শাদা ধুয়ো হয়তো একটু দেখতে পায় কিন্তুক দিনের আলোর সাথে আগুন এমন মিশে যায় যি কিছু বোঝা যায় না। তাই বলে আগুন লাগলে কাউরির জানতে বাকি থাকে না বরং আগুনের খবরই সবচাইতে তাড়াতাড়ি জানতে পারে লোকে। কি করে জানে, জানি না। হু হু করে একটো শব্দ ওঠে। সি শব্দও আবার তেমন শোনা যায় না। তবে হ্যাঁ, হঠাৎ করে চারদিক থেকে বাতাস ছুটে আসে, সি বাতাসের শন শন আওয়াজ পাওয়া যায়। তাপর দাঁড়িয়ে থাকলে গরম বাতাস এসে গায়ে লাগে, ছাই উড়ে বেড়ায় আর মাটি, বাঁশ, খড়, সোংসারের জানের জান সব জিনিশ পোড়ার গন্ধ পাওয়া যায়।
