সায়েব যিদিন আসবে সিদিন সারা গায়ে উচ্ছব। আধাবেলায় আসবে সে। সিদিন গাঁয়েব সব্বাই সকালবেলাতেই গা ধুয়ে যার যেমন ভালো জামাকাপড় আছে তাই পরে ঘরের-মাঠের কাজকম্ম বাদ দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল কখন সায়েব আসে। হিঁদুদের সব এয়োতিরা সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে চুল আঁচুড়ে নিজের নিজের বাড়ির দুয়োর গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকলে, মোসলমান বাড়ির বউ-ঝিরাও দেউড়ি দুয়োরের আড়ালে-আবডালে দাঁড়িয়ে রইলে সায়েব এলে দেখবে বলে। ঐসব দিকে সায়েবের গাড়ি হয়তো যাবেই না তবু সব দাঁড়িয়ে রইলে আর সারা’গাঁয়ের হিঁদু মোসলমান পুরুষমানুষদের পেরায় সবাই আমাদের দলিজের ছামনে খামারবাড়ির মাঠে এসে জমায়েত হলো।
ইশকুলেও সিদিন ছুটি দেওয়া হয়েছেল। মাস্টাররা সব ফরশা জামাকাপড় পরে এয়েছে। বোডের মেম্বর, আদালতের কেরানিবাবুরা, গাঁয়ের আর ভদ্দরলোকদের কেউ আসার বাকি নাই, সবাই হাজির। শুধু আমাদের বউ-ঝিদেরই একটুও বেরুনোর হুকুম নাই। এমনকি বেশি উঁকি-ঝুঁকি মারলেও গিন্নি রাগ করবে।
কেউ বললে না, তবু জানতে পারলম সায়েব কখন এল। সব যেন কেমন হয়ে গেল, পাখি ডাকতে ভুলে গেল, ছেলে কঁদতে ভুলে গেল, কি জানি, বাতাস দিতেও যেন ভুলে গেল। সব চুপচাপ। কি? সায়েব এয়েছে! আমি কত্তার ঘরে যেয়ে পরচালির দিকের দরজাটা খুলে দেখি খামার দলিজে লোকে লোকারণ্য। এক পাশে ধুলোয় ঢাকা একটো মোটরগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, লাল পাগড়ি পরা কটো সেপাইও রয়েছে ইদিক-ঊদিক আর দলিজে লোকজন সবাই দাঁড়িয়ে আছে। শুধু একজনা একটো চেয়ারে বসে আছে। লাল টকটকে এক সায়েব। সায়েবকে পোষ্কার দেখতে পেচি না বটে, কিন্তুক অতগুলো মানুষের মধ্যে ঐ একজনাকেই শুদু চোখে পড়ছে। কি তার গায়ের রঙ, কি তার পোশাক-আশাক। সায়েব থুতনিতে দু-হাত দিয়ে বসে আছে এইটুকুন শুদু দেখতে পেচি। কি যেন শুনছে। ত্যাকন দেখতে প্যালম খাটো ধুতি আর মোটা কাপড়ের পাঞ্জাবি পরা, গলায় উড়নি জড়ানো এক ভদ্দরলোক চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কি যেন একটো পড়ছে। লোকটোর চোখে চশমা, তবু পড়ার কাগজটো ধরে আছে মুখের ওপর আর কি জোরে জোরে যি পড়ছে সি কি বলব–মনে হচে যেন যাত্রা করছে। কথা কিছু কিছু শুনতে পেচি বটে। কিন্তু বুঝতে পারলম না কিছুই। কত্তার কাছে পরে শুনেছেলম, বুঝব কি, সি তো বাংলা কথা লয়, সায়েবদের নিজেদের কথা, ইঞ্জিরি।
তা বেশিক্ষণ হলো না ইসব। একটু বাদেই উঠে পড়ল সায়েব, গাড়িতে যেয়ে উঠল। গাড়ি ভো করে খামার থেকে বেরিয়ে গেল আর বললে কি লোকে পেত্যয় যাবে যি এক লহমার মদ্যে অত বড় খামার দলিজ একদম ফাঁকা। যি যেমন করে পারলে দৌডুইলে গাড়ির পেচু পেচু। কত্তাকেও দেখলম নিজের দলবল নিয়ে বেরিয়ে গেল। কত্তা কিন্তুক তেমন সাজগোজ করে নাই, বাড়ির বাইরে গেলে যেমন পোশাকে থাকে, তেমনিই। পরনের ধুতিটো তার বরাবরই এট্টু দামি, উড়ুনি অবশ্য একটো নিয়েছে আজ। এলেকার য্যাতো বড় বড় সব লোক আজ সঙ্গেই আছে। পাশের গাঁয়ের গোঁসাই আছে, এমন দিনেও কিন্তুক খালি গায়ে। একটো চাদর শুধু জড়ানো, কপালে চন্দনের ফোটা, তিলক কাটা। গাঁয়ের ভশ্চাজ্যি, পাঠক, পাল, খান, নন্দী–এরা তো আছেই। মিয়ে-মোকাদিম ইদিকে কম, তা-ও দু-তিনজনা এয়েছে আজকের দিনে।
রাস্তা চালু হয়ে যাবার পর আমি একদিন আবদার ধরলম রাস্তা দেখতে যাব। কত্তা কিন্তুক এরকম আবদারের মান রাখত। মোষের গাড়ি এল, ইস্টিশন পয্যন্ত যেয়ে আবার ফিরে আসা হবে। বউদের আর কেউ যেতে চায় না। কত্ত মাকে শুদুলে, গিন্নি যাবে কি না। এট্টু হেসে আমার শাশুড়ি বললে, রাস্তায় আমার আর দরকার নাই বাবা, রাস্তা ধরে এখন আর কোথাও যাবার নাই। যে কদিন আছি সব রাস্তা আমার এই বাড়িতে। তোমরা যাও।
পুবদিকের গাঁগুনো থেকে রাস্তা এসে গাঁয়ে ঢুকেছে বটে তবে সি রাস্তা কিন্তুক গাঁয়ের ভেতরে এসে মিলেছে গাঁয়েরই মাঝখানের পুরনো রাস্তায়। গাঁয়ের ভেতরে ই রাস্তা তো চেরকালই ব্যবহার হচে। তাই গাঁয়ের ভেতরে আর লতুন সড়কের কুনো কথা নাই। কিন্তুক গাঁ থেকে বেরিয়েই দেখলম লতুন রাস্তা বড্ড আঁকাবাকা। গোড়াতেই অত ব্যাঁকাব্যাঁকা ক্যানে শুদুলে কত্তা বললে, ধরো, মহারাজার দিঘির দক্ষিণ পাড় এই পাওয়া গেল, কারুর জমি আর মারা গেল না। রাস্তা এখান থেকেই যদি সোজা করি, প্রথমে এই বড় ভাগাড়টা যাবে, তখন গাঁয়ের মরা গরু-মোষ ফেলবে কোথা লোকে? তারপর যাবে গরু-মোষ চরার এই বিরাট পগার। তারপর যাবে ছেলে-ছোকরাদের এই পেল্লাই খেলার মাঠ। এতো বড় মাঠ আশেপাশের কোনো গাঁয়ে নাই, মহারাজার সম্পত্তি, ইস্কুলের জন্যে দেওয়া, ভাগ করলে তিনটে মাঠ হবে খেলার। এই মাঠ কি নষ্ট করা যায়। যাক না, রাস্তা একটু ঘুরে! গাঁয়ের লোকের এতো কি আর তাড়া।
সত্যিই এতো জায়গা ছেড়ে দেওয়ার লেগে রাস্তা অ্যানেক ঘুর হয়েছে, কুটুর কুটুর করে গাড়ি যেচে তো যেচেই। কেউ যেদি হেঁটে ইস্টিশনে যেতে চায়, তাইলে আদ্দেক সোমায়ে যেতে পারবে। লোকে কি আর শোনে? বর্ষাকালটা বাদ দিয়ে সারা খরানির সোমায়ে ভাগাড়ের ওপর দিয়ে, পগার দিয়ে, খেলার মাঠ ধরেই সবাই গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করত। শুদু কি তাই? নতুন সয়রানের অ্যানেক জায়গাতেই দেখলম যা-তা ঘুরুনি হয়েচে। ডাইনে ঘুরল তো ক-পা যেয়ে বাঁয়ে ঘুরল। তাপর আবার ডাইনে ঘুরল। কত্তা হেসে বললে, এসব বেশিরভাগই হয়েছে গরিবের জমি বাঁচানোর জন্যে।
