এই সোমায় বেরাট একটো কাজ হতে যেচে শোনলম। সি কাজটো কত্তা যেদি করতে পারে, তাইলে এলেকার লোকে তাকে দু-হাত তুলে দোয়া-আশীৰ্বাদ করবে। সেই কবে থেকে টেরেন চালু হয়েছে। য্যাকন ইচ্ছা লোকে জেলা শহরে, মহকুমা শহরে যেতে পারে। দিনে দিনে যেতে পারে, আবার ফিরে আসতে পারে। কিন্তুক ই গাঁ থেকে এক কোশ দূরের ইস্টিশনে যাবার কুনো রাস্তা নাই। মাঠজুড়ে শুধু ধানের জমি। ধান আর ধান, আর কিছু নাই, গাছপালাও পেরায় কিছু নাই। সেইসব জমির আল ধরে, কখনো বা শুকনো ড্যাঙার ওপর দিয়ে সাপ-খোপ ভরা কাটা-জঙ্গল মাড়িয়ে তবে ইস্টিশনে যেয়ে টেরেন ধরতে হয়। বর্ষাকালে মানুষের কষ্টের অবধি থাকে না। ত্যাকন আল-রাস্তার কুনো চেন্নও থাকে না। কাদায় পানিতে নাকাল হয়ে কি কষ্টই না হয় মানুষের ইস্টিশনে পেঁৗছুইতে। গরু-মোষের গাড়িও ত্যাকন অচল হয়ে যায়। শোনলম, অ্যাকন লিকিনি ইউনিন বোড় থেকে সড়ক করে দেবে। কাচা সড়কই হচেবটে, কুনো একদিন হয়তো পাকা হবে। শুধু ই গাঁ থেকে ইস্টিশনে যাবার লেগেই এই এক কোশ সড়ক হচে না, তা যেদি হয়, তাইলে কত্তার দুর্নামের অন্ত থাকবে না। সড়ক হবে মোট পাঁচ কোশ। ইউনিনের সাতটো গাঁকেই ই রাস্তার সুবিধা দিতে হবে। পুবের গাঁগুনোর একটো থেকে ই রাস্তা বেরিয়ে আরও দু-তিনটো গাঁয়ের পাশ দিয়ে আমাদের গাঁয়ের একবারে ভেতরে এসে ঢুকবে। রাস্তা উদিকে চার কোশ, ইদিকে এক কোশ।
রাস্তা হবে, না রাস্তা হবে–যে শুনছে সেই খুশি! কত্তার নাম চারিদিকে ছড়িয়ে গেল। ত্যাকনো জানি না ইয়ার মদ্যে আবার এক বেপার আছে। কত্তা বলতেই বোঝলম। কত্তা একদিন বললে, রাস্তা তো হবে, কিন্তু জমি নষ্ট হবে অনেক। ডাঙা-ডোবা যা রাস্তার মধ্যে পড়বে তা বাদ দাও, চাষের জমি কতো নষ্ট হবে তা কি বুঝতে পারছ? এত জমি কে দেবে?
তাই তো বটে, কত্তা য্যাকন এই পাঁচ কোশ সয়রানের লেগে কতো ধানের জমি লাগবে, তার হিসেব দিলে, ত্যাকন আমার মাথা খারাপ হবার জোগাড়। যাদের জমি যাবে সরকার তাদের ক্ষেতি পুষিয়ে টাকাপয়সা কিছু দেবে। কত্তা বললে সরকারের কথা ছাড়ো। সারা দেশের কতো বিরাট বিরাট ব্যাপার নিয়ে সরকারের মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল। সরকারের কথা হলো, নিজের নিজের এলেকায় তোমাদের রাজা করে দিয়েছি, যা করবে নিজেরা টাকা-পয়সা জোগাড় করেই করবে। তা সরকার একদম কিছু দেবে না, তা নয়। যাদের যাদের জমি নেওয়া হবে, তাদের সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
এই শুরু হলো। রাতদিন লোক আসছে। বড়লোক ছোটলোক মানামানি নাই। কি? না, তার জমিটো বাদ দিয়ে রাস্তা এট্টু সরিয়ে করতে হবে। গরিব কুনো চাষি এসে বলছে, তার মোটে দু-বিঘে জমি, রাস্তাতে চলে যেচে দশ কাঠা, তাইলে সে কি করে বাঁচবে। এই জমিটুকু ছাড়া তার আর কিছু নাই–ঐ জমিটুকুনি থেকে যে ধান সি পায়, তাই দিয়ে ভাত-কাপড়, ত্যাল, নুন, ডাল, কেরাসিন সব জোগাড় করতে হয়। দশ কাঠা গেলে সে ছেলেমেয়ে নিয়ে উপোস করে মরবে। এইরকম কথা নিয়ে কতো গরিব চাষাভুষাে যি পেত্যেক দিন আসছে তার হিসেব নাই। উদিকে বড়লোক যারা তাদেরও আসার কামাই নাই। তাদেরও ঐ একই আবদার, তাদের জমি থেকে রাস্তা সরিয়ে নিতে হবে।
এই এদের নিয়েই বিপদ বেশি বুঝলে? গরিবদের তাড়িয়ে দিলেই হলো। যা, যা দিকিনি এখান থেকে, স্টেশনে যাবার রাস্তা হতে হবে, সে রাস্তা কি আসমান থেকে আসবে? রাস্তা হবে–গাট গ্যাট করে হেঁটে বাবুর মতো স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরবি, তার জন্য একটু স্বার্থত্যাগ করবি না? যা, ম্যাপ হয়ে গিয়েছে, সে আর কেউ বদলাতে পারবে না, ক্ষতিপূরণটা যাতে ঠিক হয় দেখব, যা। গরিব চাষিদের ইসব কথা বলে আটকাতে পারা যায়, বড় বড় জমিঅলাদের কি বলবে? এক কাঠা জমি গেলে গরিবের যতো না গায়ে লাগে, এদের লাগে তার দশগুণ। সব রাঘব বোয়াল আবার কি রকম গুণধর–জমি বাঁচাবার জন্যে পয়সা খরচ করতেও রাজি। পারলে গভমেন্টকেও ঘুষ দেয়।
আমি জানি, কত্তা পারত সিধে রাস্তা করতে। আর য্যাতোটো সম্ভব। গরিবের জমি বাঁচাবার লেগেই চেষ্টা করবে। শ্যাষ পয্যন্ত কি হলো জানি না। রাস্তা হতে সোমায় অ্যানেকটোই লাগল, চার-পাঁচ বছর পেরায়।
রাস্তা কত্তা কিছুতেই সিধে করতে পারবে না। অবশ্যি সি একা তো আর রাস্তা করে নাই, আরও সব মেম্বাররা ছিল, ম্যালা ওপরঅলা ছিল। তবু রাস্তা তো তার এলেকাতেই হচে, তার দায়িত্বই বেশি। কত্তা কখনো কখনো বলত, মুখটা ত্যাকন একটু খুশিতে ভরা, ওমুক খুব গরিব মানুষ–বেচারার মোটে দেড় বিঘে জমি, চাষবাসের শেষ দিনে গায়ের লোক ব্যাগারে তার জমিটুকু আবাদ করে দেয়। সেজন্যে সারা মরশুম সে নিজেই ব্যাগার খাটে। তার ঐটুকু জমির তিন কাঠা রাস্তায় চলে যাচ্ছিল, কি করব, কোনোরকমে জমিটুকু বাঁচিয়ে দিলাম বটে, রাস্তা কিন্তু ঐ জায়গাটায় তারাবাকা হয়ে গেল। দু-এক জায়গায় বড়লোকদের চাপেও ওরকম করতে হয়েছে। নাঃ, যেমন রাস্তা হবে মনে করেছিলাম, তেমন হবে না।
হবে হবে, হচে হচে করে রাস্তা হতে বেশ ক-বছর লেগে গেল। তাপর শোনলম, জেলার বড় সায়েব আসবে। বিদিশি বিটিশ শাদা সায়েব–সেই সায়েব এসে ফিতে কাটবে, তাপরে সবার লেগে রাস্তা খুলে দেবে। আমাদের জান ভয়ে কোণে কোণে লুকুইতে লাগল য্যাকন শোনলম সায়েব গাড়ি নিয়ে লতুন রাস্তা দিয়ে সোজা আমাদের বাড়িতেই আসবে, তাপর যিখানে ফিতে কাটার বেবস্থা হয়েছে সিখানে যেয়ে যা করবার করবে। সায়েবরা কেমন মানুষ, কি খায়, কি করে কিছুই জানি না। আমরা তো কুন্ ছার, কত্তারাই তার কুনো কথা বুঝতে পারবে না। একটা কথা তাকে বলতেও পারবে না। ইসব কথা কত্তাকে বলতে গেলম, তা সে রেগে ধমকে দিলে। এসব তোমাদের ভাবতে হবে না। বাড়ির কোনো খাবার সায়েব খাবে না। যেমন আসবে তেমনি সোজা গিয়ে চেয়ারে বসবে, কাগজপত্তরে সই করবে। খামারে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকবে। পাঁচ মিনিট, বড়জোর দশ মিনিট, তার বেশি সায়েব এখানে থাকবেই না। আমরা সদর থেকে দার্জিলিং-চা, বিলিতি বিস্কুট এইসব এনে রাখব, যদি কিছু খায় তখন দেখা যাবে।
