বাড়িতে একটু আঁকজমক, একটু বড়লোকি ঠাট-ঠমক হলো বৈকি। ঘোড়াটো বদলানো হলো, যেটো ছিল সেটো বিক্রি করে লতুন ভালো জেতের বড় একটো ঘোড়া কেনা হলো। পালকিটো নতুন করে ছাওয়ানো, রঙ করা হলো। গরুর গাড়ির ছইটোকেও আবার রঙ করা হলো, নাঙল বোধায় আর একটা বাড়ল, হাতির মতুন আরও এক জোড়া মোষ এল বাড়িতে। ঘর-দুয়োর সব ল্যাপা-মোছা হলো, খামারের ঘাস লতা-পাতা পোষ্কার করা হলো। দলিজ ঘরটোকে সাফ-সুতোর করে নতুন করে সাজানো হলো। খামার থেকে দলিজে ওঠার সিঁড়িটো রাজমিস্ত্রি এনে পাকা করা হলো। দলিজ ঘরের মাটির দেয়ালের পেছন দিকটো যাতে পানির ছাঁটে লষ্ট না হয়, সেই লেগে নতুন করে আলকাতরা ল্যাপা হলো। তাপর এল অ্যানেকগুলিন কাঠের চেয়ার আর টেবিল। পাড়াগাঁয়ে উসব ত্যাকন কে দেখেছে? সারা গাঁ খুঁজলে একটো-দুটো দবজ শালকাঠের চেয়ার হয়তো মিলত, টেবিল আর কোথা? কিন্তু আমাদের দলিজটিকে চেয়ার টেবিলে সাজাতেই হলো কত্তাকে। এটি যি অ্যাকন কোট হবে। তাই নানা আসবাব আসছে–আপিসের কতোরকম জিনিশপত্তর কতোরকম কাগজখাতা। সবশ্যাষে এল একটি একনলা বন্দুক। এই জিনিশটি য্যাকন এল, একমাত্তর তখুনি দেখলম গিন্নি আপত্তি করলে। কেন। বাবা–মানুষ মারার এই অস্তরটি আনতে গেলে? কত্ত তার জবাবে বললে, মানুষ মারার জন্য নয়, মানুষের ধন-প্রাণ বাঁচানোর জন্যেই
এটি কেনা হলো মা। এখন থেকে তোমার ছেলের দায়িত্ব শুধু তোমার সংসারটিই নয়, বহু সংসারের দায়িত্বই এখন তার। তাছাড়া আরও কি একটো কথা কত্তা বলতে গিয়েও বললে না।
যা বললেম, একটু বেশি জাঁকজমক, একটু বড়লোকি হলে আর কি করা যাবে? ধনে-জনে ফলে-ফসলে ফেটে পড়ছে সোংসার। হবে-ই বা ক্যানে? দিনকে তো একবার দোপর হতেই হয়, চড়তে চড়তে সুয্যিকে একবার উঠতে হয় আসমানের মাথায়। এ-ই লিয়ম। ই সোংসারের অ্যাকন তা-ই।
১৭. কতো লোকের কতত বিচের, কতো বিধেন
কোট বসত রোববারে। যতোদূর মনে হচে রোববারেই কত্তার আদালত বসত। রোববার ছুটির দিন বটে, গাঁয়ের ইশকুলেও ছুটি হতো ঐদিনে শহর-গঞ্জের মতুনই। কিন্তুক ইশকুলটো বাদ দিলে গাঁয়ে আবার ছুটি কি! সেই লেগে মনে হচে দলিজে কোট বসত রোববার দিন। দলিধরের ভেতরে-বাইরের দুই উসারায়, নামোয় খামারে লোকজন গমগম গিসগিস করত। সাত গাঁয়ের লোক ঐদিন তাদের য্যাতে নালিশ-রিয়াদ নিয়ে আসত।
বাড়ির বউ-ঝিদের বাইরে আসার লিয়ম ছিল না। পুরুষদের কাজ আলেদা, মেয়েদের কাজ আলেদা। মেয়েরা দিনে-রেতে বাইরে যাবে, পায়খানা-পেশাবের বেগও ধরে রাখতে হবে। কেউ শুদুবে না তো বটেই, পুরুষরা বোধায় জানেও না যি মেয়েদের ঐসব দরকার আছে। রাত হলে চোরের মতুন বাড়ির আশপাশে, পুকুরঘাটের ধারে বউ-ঝিরা চলে যেত। কারুর ছামনে উ কথা তোলাও শরমের কথা। সারাদিন বাড়িতে থাকো, চোখে ঠুলি লাগিয়ে একই জায়গায় হাজার বার পাক মারো, গুষ্টির লেগে রাঁধে, ছেলেমেয়েকে দশবার বুকের দুধ খাওয়াও, গভূতভা থাকলে চোখ-কান বুজে বয়ে বেড়াও! মিয়ে-মোকাদিমদের বাড়িতে এই ছিল লিয়ম। তা বলে গরিব সাধারণ আবস্তার মোসলমানদের লেগে ইলিয়ম লয়, সিখানে ঘর-বার সমান। পদাপুশিদার বালাই নাই। সে যা-ই হোক, উয়ারই মদ্যে ই সোংসারটো একটু আলেদা ছিল আর আমি তো অনেক পুরনো বউ-মানুষ, আমি নাচদুয়োরের কাছে যেয়ে বাড়ির পুরনো পাঁচিলের ফঁক-ফোকর দিয়ে খামারের দিকে অ্যানেক সোমায় তাকিয়ে থাকতম।
আজও দেখছেলম, আশপাশের গাঁয়ের ভদ্দরলোকেরা সব এয়েছে ক্ষারে কাচা ধুতিজামা পরে। হিঁদু-মোসলমান বেশির ভাগেরই এই পোশাক। মোসলমানদের কেউ কেউ তহবন পরেও এয়েছে। গরিব মানুষদের ক্ষারও জোটে নাই–শস্তা সাজিমাটিতে ধোয়া জামাকাপড় পরে এয়েছে তারা। তবে নালিশ করার লেগে বাদী-ফরিয়াদি যারা এয়েছে তাদের পেরায় সবারই খালি গা। দলিজের ভেতর-উসারায়, যেখানে চেয়ার-টেবিল পাতা আছে, সেখানে কোট বসেছে। লোকের ভিড়ে কিছুই দেখা যায় না। কোটের আর সব মেম্বাররা সেখানে চেয়ারে বসে আছে, বিচের চলছে। কত্ত একদিন বলেছিল, ইখানে আর বিচের কি হবে? খুন-জখম ভায়ানক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ডাকাতি-রাহাজানির বিচের ইখানে হয় না। ওসব আমরা সদরে মহকুমায় পাঠিয়ে দিই। ছোটখাটো নালিশ ফরিয়াদ নিয়ে যাতে লোকে শুধু শুধু শহরে না যায়, হয়রানি না হয়, টাকাপয়সা খুইয়ে না আসে, এখানে শুধু সেইসবই বিচের করি। দু-পাঁচ টাকা জরিমানা করতে আর এক দিনের জেল দিতে পারি আমি একটু মিলিয়ে-মিটিয়ে দেওয়াই আমাদের কাজ, বুঝেছ? এলেকায় যাতে শান্তি থাকে।
তা নালিশ-ফরিয়াদের কথা শুনলে হাসিও লাগে বটে! কে কাকে কাঠ-পিঁপড়ের গত্তর ওপর ঠেসে ধরেছে, পিপড়ের কামড়ের বিষে বেচারার জ্বর এসে গেয়েছে, কে মসিদে হাত দিয়ে মিছে কথা বলে পাওনা টাকা দেয় নাই–কোন্ বুড়ি বুঝিন মা-কালীর থানে এক ঘণ্টা, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলে ভাত দেয় না বলে নালিশ করেছেতা মা-কালী বেবস্থা করে নাই বলে কোটে এয়েছে কেস্ করতে। এমনি সব নানা কথা নিয়ে মামলা। মাঠ থেকে ধানের আঁটি চুরি, মরাই থেকে এক-আধ মণ ধান বার করে নেওয়া, হোক মোটা ছেড়া শাড়ি, শুকুইতে দেওয়া ছিল, সেই শাড়িটো চুরি করা–এইসব লিকিনি নালিশ।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলম, লতুন ঘোড়াটো নিয়ে এল হাড়িপাড়ার সইস। ঘোড়ার হাঁটা দেখলে বিশ্বেস হয় না ঐ ঘোড়াই অমন টগবগ করে ছোটে। হটর হটর করে ঘোড়ার শুদু হাঁটা দেখলে ঘোড়াকে ঘোড়া বলেই মনে হয় না, মনে হয় অন্য কুনো জন্তু। ঘোড়াটোকে হাঁটিয়ে নিয়ে এল সইস। ইখানে আনলে ক্যানে? বোধায় সবাইকে একবার দেখাইতে চাইছে। হাঁ করে সব দেখছেও বটে। ঠিক বুঝতে পারছি না এত দূর থেকে, তবু মনে হচে চাষাভুষােদের মদ্যে থেকে দু-একজন ঘোড়ার বেশি কাছে এগিয়ে গেলে বাগদিপাড়ার দফাদার তাকে হাতে ধরে সরিয়ে দিচে। দফাদার এমনিতে ত্যানা পরে থাকে আর অ্যাকন তার সরকারি পোশাকের কি বাহার! নীল জামা, হাফ প্যান্ট–সি এমনি মোটা যি ইহজন্মে ছিড়তে পারবে না। সেই জামার ওপরে পেতলের ঝকঝকে তকমা আঁটা। বাউরিদের একজনা জমাদারও আছে। তারও ঐ পোশাক। এমনিতে গরিব মানুষ তারা—যেমন গরিব, তেমনি বেচারা, সাত চড়ে রা কাড়ে না, গায়ে আবার অসুরের মতুন বল–অ্যাকন এই পোশাক পরে তাদেরও যেন গরবে মাটিতে পা পড়ছে না।
