তা অ্যাকন মনে হয় বৈকি যি কত্তা আর একটি জিনিশ চাইত–সেই জিনিশটি হলো খ্যামতা। সংসারের খ্যামতা তো সে পেয়েই ছিল, তা নিয়ে কারু কুনো কথা ছিল না। তার সোংসারের বাইরেও খ্যামতা পাবার লেগে সে জেনে হোক না জেনে হোক, আমি ঠিক বুঝতে পারি, অ্যানেকদিন থেকে অ্যানেক চেষ্টাই করছিল। যি মানুষ কুনো কথা বলতেই চাইত না, আমি ইস্ত্রী বলে আমারও কুনো আলেদা খাতির ছিল না, সেই মানুষ মন-মেজাজ ভালো থাকলে আমাকেও দু-একটো না বলে পারত না। বাইরের কতো আল্কা লোক কবে থেকে বাড়িতে আসে, কি কাজে কত্তা পেরায় পেত্যেকদিন গাঁয়ের বাইরে যায় আবার সাঁঝবেলায় ফিরে আসে, বাড়িতে কতো কাগজ-বই আসে, দ্যাশের ভেতরে কতো কি হচে তা নিয়ে কন্তু আজকাল কথা দু-একটো বলে। ইসব কথায় ত্যাকন তেমন কিছু মনে হতো না। কিন্তুক একদিন রেতে কত্তা আমাকে যখন বললে সাতটো গাঁ নিয়ে যি ইউনিন, সেই ইউনিন নিয়ে সে নিব্বাচন করবে, ত্যাকন মুখ ফুটে বলেই ফেললম।
তোমার বুজিন অ্যাকন খুব খ্যামতার পেয়োজন? দ্যাশে কতো রকম হানাহানি হচে, তুমিই তো বললো, হিঁদু-মোসলমানে হানাহানি, বিটিশ তাড়ানোর লেগে হানাহানি–সব জায়গায় হানাহানি। গাঁ-ঘরও বাদ যেচে না। এই হানাহানিতে তুমিও ঢুকবে? খ্যামতার লেগে?
ক্ষমতার জন্যে কি লোকে ক্ষমতা চায় – আমার কথা শুনে কত্তা রাগলে না, ক্ষমতা চায় কিছু কাজ করার জন্যে। ক্ষমতা পেলেই তবে কিছু করা যায় নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া যায়। আবার দেশের কাজও করা যায়। ক্ষমতা না পেলে কিছুই করা যায় না। নিজেরও না, পরেরও না। শোনো! হানাহানি কিছু হবে না, আর যদি হয় তো হবে। ইউনিয়ন নির্বাচন আমাকে করতে হবে। ক্ষমতা পেলে নিজের জন্যে কিছু করব না, শুধু দেশের কাজই করব, এই কথাটি আমাকে বলতে হবে বটে তবে তা সত্যি নয়। দুটিই করতে হবেনিজের জন্যে কিছু করব, দেশের মানুষের জন্যেও কিছু করব। তোমাকে বলি, যদি একটা নিজের কাজ করি, দশটা সমাজের কাজ করব। কথার কথা বলছি না, যা বলছি তাই করব।
এই কত্তা লোকটিকে আমি য্যাতোদূর চিনি–আমার ছেলেমেয়ের বাপ, বাড়ির কত্ত বলে লয়–অন্য একটো লোক মনে করেই বলছি, এই লোকটিকে বিশ্বেস করা যায়। ওর যি কথা সেই কাজ। তা নাইলে কেউ বলতে পারে, খ্যামতা পেলে নিজের লেগেও কিছু করব, পরের লেগেও করব? এমন হিশেব করে কেউ বলতে পারে নিজের একটো করলে দ্যাশের দশটো কাজ করবে?
আমি জানি উ যেদি জানে মরেও যায়, তবু তা-ই করবে। উ কি কম কঠিন পাষাণ! সারা তল্লাটের লোককেও উ বোধায় বিশ্বেস করাতে পেরেছিল ই কথা। ইটি হিঁদুদের এলেকা, সাত গাঁয়ের মদ্যে মাত্তর একটি ছোট গাঁ মোসলমানদের, আর দুটি গাঁয়ে দু-চার ঘর আছে, বাকি সবই হিঁদু। কত্তার বিরুদ্দে নিব্বাচনে দাঁড়িয়েছিল সব বাঘা বাঘা হিঁদু। সব হেরে গেল তার কাছে। কতো কথাই না বললে তার লেগে! উ মোসলমান, ভিন্ জাত, উ হিঁদুদের মাথায় পা দিয়ে শাসন করবে। ই হিঁদুদের এলেকা, কতত বামুন-বদ্যি ইখানে বাস করে, কতো শিক্ষিত হিঁদু ই তল্লাটে রয়েছে, সব বাদ দিয়ে একটো মোসলমানকে ইউনিনের পেসিডেন করতে হবে ক্যানে? কতো কথাই না বললে! কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। হিঁদুরা, কত্তার শত্রুর হিঁদুদের কথা ঘাড়াইলে না। কত্তাই জিতলে। কত্তা জিতলে যি আনন্দ–ফুত্তি হতে লাগল তাতে ভালোই বোঝলম, কত্তা হিঁদু-মোসলমান সক্কলেরই নয়নমণি। তাপরেও মানুষের ভ্যাদ পাওয়া কি কঠিন দ্যাখো! কত্তামার সেই ছেলেদুটি, সেই দুটিকে তো কত্তাই নিজের হাতে মানুষ করেছে, তারা তার আপন ভাইদের বাড়া, কি না করেছে কত্তা তাদের লেগে আর তারাও কত্তাকে দাদা বলতে অজ্ঞান, আমাকেও বউদিদি বউদিদি করে এমন সসম্মান করে অথচ কত্তা একদিন ভোটের সোমায় কোন্ গাঁ থেকে অ্যানেক রেতে ফিরে এমন একটো কথা বললে যি আমার মুখের রা-কথা বন্ধ হয়ে গেল।
পাশের গাঁয়ের ভদ্দরলোকদের সাথে কথা বলতে বলতে অ্যানেকটো রাত হয়েছে। ফেরার সোমায় সঙ্গে যারা ছিল গাঁয়ের হিঁদু-মোসলমান দু-রকম মানুষই ছিল তারা সব নিজের নিজের বাড়ির দিকে গেলে হিঁদুপাড়া দিয়ে কত্ত একাই আসছিল। আদার তেঁতুলতলাটো পেরুতে যেতেই দেখতে পেলে কে একজনা জুবুথুবু হয়ে গায়ে চাদর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভয়-ডর বলে কুনোকিছু তো কত্তার কুনোদিন নাই। কে রে ওখানে বলে কত্তা তার কাছে যেতেই দেখতে পেলে কামারপাড়ার মদন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। এখানে তুই কি করছিস রে–বলতেই মদন তেমনি কাঁপতে কাঁপতেই কর পায়ের কাছে বসে পড়ল। চাদরের তলা থেকে বেরিয়ে পড়ল এই বড় পাঁটা কাটার এক চকচকে খাঁড়া। মদন, একি রে–আমি একথা বলতেই কালিপ্রসাদের নাম করে বললে, ছোড়দা আমাকে বললে আপনি যখন তেঁতুলতলা দিয়ে বাড়ি যাবেন, তখন চোখ বুঝে আপনার ঘাড়ে যেন একটা কোপ বসিয়ে দি।
তা কোপ বসাতে পারলি না তো? যা বাড়ি যা।
কি পাপ আমি করতে যাচ্ছিলাম, আমার যে নরকেও জায়গা হবে। মদন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
যা বাড়ি যা, শুধু শুধু কখনো খাঁড়া বার করিস না।
কত্তা জিতলে কিন্তুক বাড়িতে কুনো হৈ চৈ হলো না। একবার শুদু সে বাড়িতে মা, আর বুনের কাছে এল। মা বলে একবার শুদু দাঁড়াইলে, আর কিছু বললে না। গিন্নিও একটো কথাই বললে, বাবা, আমার সব আশা পুরেছে, আর কিছু চাই না।
