কিন্তুক যাই হোক আর তাই হোক, কত্তার খেয়াল সব দিকে। আগের মতুন অ্যাকন আর তাকে সবকিছু নিজেকে দেখতে হয় না, সোংসারের দায়দায়িত্ব এমন করে সে ভাগ করে দিয়েছে যে সব আপন মনেই ঠিকঠাক চলছে, পান থেকে চুন খসবার জো থাকছে না। সবাই নিজের নিজের কাজের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। সেজ দ্যাওর এট্টু আবরের মতুন, ঠিক গোঁয়ারগোবিন্দ লয়, তবে নিজের বুদ্ধিতে কিছু করার ক্ষ্যামতা তার নাই। সোজা মানুষ, কারুর সাথে লাগল তো মারামারি করে নিজে জখম হলো, কি আর কাউকে জখম করে ফেললে। চাষবাস, আবাদের দায়দায়িত্ব ছিল এই সেজ ভাইয়ের ঘাড়ে। মাঝে মাঝে এর তার সাথে গোলমাল-ফ্যাসাদ করে ফেললেও সবকিছু দেখা-শোনাটা সে ভালোই করত। তবে খুব বুদ্ধি ছিল ল-দ্যাওরের, সে দেখতে যেমন সুপুরুষ ছিল, বুদ্ধিসুদ্ধিও তেমনি ভালো ছিল আর কাজে-কম্মেও ছিল চালাক। জমির খবর, আবাদের খবর, ফসলের খবর তার চেয়ে ভালো ই গা তো ই গাঁ, আশপাশের চৌদ্দ গাঁয়ের কেউ ভালো জানত না। সেজকে বুদ্ধি পরামশ্য সব তার কাছেই নিতে হতো।
রাতদিন টেনে করে শহরে যেতে হতো বলে কত্তা ইস্টিশনের কাছে এক কোশ দূরে ছিল ইস্টিশন–দু-বিঘে জমি কিনে সিখানে একটো ভিটে আর বেরাট একটা মুদিখানার দোকান করা হলো। গঞ্জে একটো বাড়িও হলো, ব্যাবসার লেগে একটা দোকানও হলো। কত্তা এই কাজটো দেখার ভার দিলে ভাশুর আর ল-দ্যাওরের ওপর। নামেই থাকল বড় কত্তা, আসল দায়িত্ব ল-দ্যাওরকেই নিতে হলো। আমি যাকন বিয়ে হয়ে ই বাড়িতে আসি, এই মানুষটি ত্যাকন একেবারেই ছেলেমানুষ। আমার চেয়েও বয়েসে ক-বছরের ছোট তো! বড় খোঁকা য্যাতোদিন বেঁচে ছিল, সে ছিল এই দ্যাওরের চোখের মণি। সে চলে গেলে তার বুকে যি কেমন বেজেছিল তা আমি জানি। তারপর থেকে এমন করে সে ব্যাভার করত যেন সেই আমার বড় খোঁকা। অ্যাকন যি তার বিয়ে দেওয়া হয়েছে, অ্যাকনও সে তেমনিই আছে।
এই সিদিন ছোট দ্যাওরের-ও বিয়ে হয়ে গেল। উ আর কিছুতেই কলেজে ল্যাখাপড়া করলে না। কত্তা কতো বুজুইলে—সে খালি কাঁদতে লাগলে, বড় খোঁকাই চলে গেয়েছে, আর কিসের ল্যাখাপড়া! চাকরি-বাকরি একটো খুঁজে নিয়ে কত্তার পাশে দাঁড়ানো দরকার। তা বিয়ের আগেই চাকরি একটো পেলে সে। কত্তা আর আপত্তি করলে না। শহরে বাসা করে দিয়ে ছোট বউকে সেখানে পাঠিয়ে দিলে। আমাকে বললে, এই প্রথম গাঁ ছেড়ে শহরে বাড়ির একজন বসবাস করবে। তা করতে হবে না? চিরকাল কি সবাই কুয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকবে? দুনিয়াটাকে দেখে-শুনে নিতে হবে না?
সোংসার যাকে বলে ভরা-ভত্তি। চাষের জমি একশো বিঘের ওপর। চারজনা কাজের মুন্যি সারা বছর আছে। সোম্বছরের রাখাল আছে। একটো গোয়ালে গরু-ছাগলের জায়গা হয় না, আর একটো করতে হয়েছে। বাড়ি সব সোমায় গমগম করছে।
তবে যতো বড়ই হোক সোংসার, গিন্নি কিন্তুক সেই আমাদের শাশুড়ি। কত্তা সেই যি বলেছে, মা, সব হবে তোমার হুকুমে—সেই কথাটির নড়চড় হবার উপয় নাই। আমি জানি, এতটো বয়েস হয়ে গেল–অ্যাকনো যেদি গিন্নির কথার এতটুকুনি অগেরাজি করি, নতিজার অবদি থাকবে না। কত্তা ঠিক হাত ধরে বাড়ির বাইরে দিয়ে আসবে। ভিন্ ভিন্ গাঁ থেকে লতুন বউ-ঝিরা আসছে। তারাও ছেলেপুলের মা হয়ে যেচে, তবু তাদের কেউ যেদি গিন্নির ছামনে হাতের বালা ঘোরাইছে, একটু ঠোসক কি গরব দেখাইছে, কত্তা ঠিক তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবে।
আকন আমার মনে হয়, কত্তার সারা জেবনের কাজ যেন আগের থেকে বাঁধা। বেঁধেছে সে নিজেই, কারু কথা শুনে লয়। কারু কথা শোনার লোক সে লয়। বোধায় পেথমেই ঠিক করে নিয়েছিল, বাপ মরার পরে ভাইবুনদের কেউ যেন বুঝতে না পারে যি বাপ মরেছে, মা যেন না মনে করতে পারে যি, বাপ চলে যাবার পরে এতিম ছেলেমেয়েগুনো পানিতে ভেসে যাবে আর লোকের দয়ায় বেঁচে থাকবে। আরও একটা কথা কত্তা ভেবে রেখেছিল যি, সোংসার যতো খুশি বড় হোক, বরং য্যাতো বড় হবে ত্যাতোই ভালো–সবাই একসাথে থাকবে, লোকজনে আত্মীয়কুটুমে বাড়ি সব সোমায় গমগম করবে। কিন্তুক সে নিজে থাকবে দূরে, নিজে থাকবে একা। সত্যিই, কিছুতেই বাড়ির ভেতর আসত না। মা ডেকে পাঠাইলে আসত, খুব বড় বেপদ-আপদ, রোগ-শোক বা খুশির খবরে আসত, আবার খানিকক্ষণ বাদেই চলে যেত তার বাইরের ঘরে। বাইরের ঘরে, মানে বৈঠকখানা নয়, দলিজ তো আলাদা, বাড়িরই একটো ঘর এট্টু অ্যাকানে ছিল, কত্তা সেই ঘরে থাকত, শুত। এই ঘরেরই বাইরের দিকে একটো পরচালি ছিল, সেখানে চেয়ার পেতে বসে থাকত বেরাট খামারের দিকে মুখ করে। সি জায়গাটো খুব ঠান্ডা হেঁয়া, কুনো মানুষজন সিদিকে যেত না, বোধায় গরুছাগলও সিদিকে যেতে ভয় করত।
এত বড় সোংসারের কত্তা, বাড়ির ভেতরে এত লোক, এত কাচ্চা-বাচ্চার চাঁ ভা–কত্তা নিজেই এত বড় সোংসার গড়েছে, তবু সে নিজে থাকত দূরে। মানুষজন তেমন পছন্দ করত না। মজা-ফুত্তি করে অনেক মানুষের সাথে তাকে কুনোদিন গল্প-গুজব করতে দেখি নাই। তার ছামনে গেলেই, সে যে-ই হোক, তার পা কাঁপত, কথা আটকে যেত। পথেঘাটে, বাড়ির ছেলেই হোক আর পাড়ার ছেলেমেয়েই হোক, কত্তাকে দেখলেই ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত। কিন্তুক কত্তা ঘরের কিংবা বাইরের কুনো ছোট ছেলেমেয়েকে বকেছে বলে আজ পয্যন্ত মনে করতে পারি না। এমনিই রাশভারি মানুষ ছিল সে। ঐ যি ঘরে থাকত, সকালে দোপরে রেতে তার খাবার বয়ে নিয়ে যেতে হতো ঐ ঘরে। তার খাবার সামান্য, এই এতটুকু, কিন্তু সে যা বলে দিত তাই রাঁধতে হতো। এইসব লেগে মনে হতো কত্তার সবকিছুই আগে থেকে বাঁধা। সোংসারের সব বিলি-বেবস্থা করে দিয়ে, যার যেমন কাজ তাকে তেমন ভার দিয়ে কত্তা য্যাকন দেখলে আর কুনো গোলমাল হবে না, সোংসার ঠিকমতো চলবে, ত্যাকনই সোংসার থেকে দূরে গেল। মন দিলে সারা এলেকার মানুষের কাজে।
