আত্মীয়কুটুম দোপরের আগেই এসে পৌঁছুল। লাশ লাওয়ানো থোয়ানো হলো। সবাই বললে, তেমন লিকিন খারাপ হয় নাই লাশ। সব বেবস্থা হয়ে গেলে আর একবার সবাইকে ডাকলে শ্যাষবারের মতুন মুখ দেখাবার লেগে। দেখলম বটে সবারি সাথে। খোঁকার মুখ আর কি আমার দেখবার দরকার আছে? উ মুখ যি আমি চোখ বুজে য্যাকন খুশি ত্যাকন দেখতে পারি। অ্যাকন ঐ নষ্ট হওয়া মুখ দেখে আমার কি হবে? তবু বললম, যাও বাপ, যেছে যাও, কিন্তুক মায়ের কাছ থেকে আর কোথা যাবে? যেখানেই থাকো মা ডাকলেই আসতে হবে।
দাফন করে সবাই ফিরে আসতে আসতে দোপর গড়িয়ে গেল। তাপর খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে দিনই পেরায় ফুরিয়ে এল। সবাই এসে বাড়ির ভেতরে উত্তরের ঘরের উসারায় বসেছে। আত্মীয়কুটুম এয়েছে, লতুন মা তার ছেলেমেয়ে সবাইকে এনেছে। নানার বাড়ি থেকে আমার ছোট ভাইটি, মামুরা, খালারা সব এয়েছে। কত্তারও যিখানে য্যাতো আত্মীয়গুষ্টি ছিল, কেউ বাদ যায় নাই, সবাই হাজির। আর এয়েছে আমার বাপজি। বাপজি বাড়ি ছেড়ে কোথাও বড় একটো যেত না, একটু অ্যাকলফেঁড়ে ঘরকুনোই ছিল মানুষটো। আমার বিয়ের পরে একবার কি হয়তো দু-বার মেয়ের বাড়ি এয়েছে তার বেশি হবে না। তবে ই বাড়িতে যা ঘটে গেল, তাতে কি বাপজি না এসে পারে? নাতিটিকে যি বড্ড ভালোবাসত! এই গত ক-বছর বাপের বাড়ি যেতে পারি নাই, তার এ ফি বছরই গেয়েছেলম। বড় খোঁকা সবারই জান কেড়ে নিত–অমন চুপচাপ রাশভারি নানাও তার খুব বশ হয়েছিল।
সেই আমার বাপজি এয়েছে, আমাকে অ্যাকনো একটা কথা বলে নাই, বলতে পারে নাই। উত্তর-দুয়োরি ঘরের পিড়ের পচ্চিমধারে চুপ করে বসে রয়েছে। কঁদতে তো পারে না মানুষটো, পব্বতের মতুন বসে আছে। শাদা গায়ের রঙ-মুখে চাপ দাড়ি, পরনে শাদা লুঙ্গি আর শাদা পিরেন।
কত্তা ত্যাকন ছিল না। কোথা থেকে এল বাড়ির ভেতরে। ই কদিন যি মানুষটোকে দেখে ভয় পেয়েছেলম, অ্যাকন দেখলম সে আবার সেই আগের মানুষ। শোক-তাপ যেন কিছুই নাই। বাড়ির উঠনে দাঁড়িয়ে সে একবার সবাইকে দেখলে। তাপর আস্তে আস্তে এগিয়ে এল বাপজির কাছে। বাপজি বটগাছের মতুন বসে আর কত্তা দাঁড়িয়েছে তার ছামনে।
সে ছিল আপনার যোগ্য নাতি, আপনি বলেছিলেন আপনার ছেলেকে আপনার কাছ থেকে পর করে দিচ্ছি বলে আমার ছেলেকেও বেশি দিন স্কুলে যেতে হবে না। আপনার নাতি আপনার কথার মান। রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আপনার কথাকে সে মিছে হতে দেয় নাই।
হায়, কি বললে, হায় কি বললে, ওগো হায় কি বললে–আসমান থেকে যেন বাজ পড়ল আর যে যিখানে ছিল সাথে সাথে পাথর হয়ে গেল। কত্তার মুখের দিকে আমি তাকিয়ে রয়েছি, তাকিয়ে রয়েছি, যেন যুগ কেটে গেল। তাপর গুড়গুড় করে একটো আওয়াজ উঠল, যেন মাটির তলা থেকে আসছে। আমি শুনছি, সেই আওয়াজ হুঁ হুঁ, হো হো, ও হো হো করে বাপজির বুকের ভেতরটা খান খান করে ভেঙে দিয়ে পেলয় বেগে বেরিয়ে আসছে। অতো বড় পব্বতের মতো মানুষটো উসারা থেকে গড়িয়ে উঠনের ওপর যেয়ে পড়ল।
১৬. সোংসার কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না
আমার বড় খোঁকা চলে গেল। দুনিয়াদারিতে আর আমার মন নাইনাই নাই নাই–তবু কি মওত এল? সোংসার কি ক্ষ্যামা দিলে? ছুটি কি প্যালম? বড় খোঁকা গেল তো পরের খোঁকাটি বড় খোঁকার জায়গায় চলে এল। কবে এল তা জানিও না। দেখতে দেখতে সে-ও বড় হয়ে গেল। মোটেই বড় খোঁকার মতুন লয়, গড়ন-পেটন একদম আলাদা। তারও খুব রূপ। কাঁচা সোনার মতুন গায়ের রঙ। এতদিন কিছুই খেয়াল করি নাই, একদিন হঠাৎ দেখি ওমা, ও-ও তো বারো-তেরো বছরের ছেলে হয়ে গেয়েছে। তাপর, মেয়েটি বাড়ির পেথম মেয়ে, সি-ও তিন-চার বছরের হয়ে গেল। মাজা-মাজা রঙ, আঁকা-আঁকা চোখমুখ, এইটুকুনি কপাল, মাথাভত্তি এলোমেলো কালো চুল–ওমা, আমার কি হবে মা গা থেকে যেন ননী গলচে! অ্যাকন এদের নিয়ে কি করব? পোড়া সোংসার কি জিনিস কে বলতে পারে বলো! শুদু কি তাই? সোংসার ইদিকে আপনা-আপনি বড় হচে। তা সোংসার বড় হবে কি ছোট হবে তাতে তো কারুর হাত নাই। ছেলেমেয়ে কম হোক, বেশি হোক, সবই আল্লার ইচ্ছায়। অ্যাকন যেমন নিজের ইচ্ছায়, তেমন লয়। আট-দশ-বারো-তেরোটা করে ছেলেময়ে হচে, কিছুই করার নাই। আল্লা দিচে তা কে কি করবে? খেতে না পেয়ে, রোগে ভুগে কুকুর-বেড়ালের ছানার মতুন এন্ডি-গেন্ডিগুনো মরে যেচে। ফল পাকার পরে যেমন কলাগাছ মরে, তেমনি করে এদুরি-পেদুরি ছেলেমেয়ে প্যাটে ধরতে ধরতে মা-গাছটো মরে যেচে। ছেলে হতে যেয়ে মরছে, কি অন্য অসুখে মরছে, কিছুই করার নাই–দুখ-দরদও কিছু নাই। পুরুষমানুষ আবার একটো বিয়ে করে আনছে আবার এক পাল জম্মাইচে। ই বাড়িতেও তাই হলো। সেজ বউয়ের দুটি খোঁকা, ঐ দুটি খোঁকাকে রেখে সে একদিন চোখ বুজলে। কি রোগ তার হয়েছিল তা কেউ বলতে পারলে না। চিকিচ্ছে আর কি হবে? গাঁয়ের ডাক্তার ওষুধ দিলে, টোটকা-মোটকা যে যেমন পারলে দিতে কসুর করলে না। ঝাড়ফুঁক পানিপড়া কিছুই বাদ পড়ল না। তা, সেজ বউ বেশি সোমায় নিলে না। কুনো কিছু গেরাহ্যি না করে সে সব ফেলে চলে গেল। খোঁকাদুটিকে অ্যাকন কে দেখে এই কথা বলে সেজ দ্যাওর ছ-মাস যেতে না যেতে আবার একটি কচি মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে আনলে। যে দুই দ্যাওরের বিয়ে বাকি ছিল এইবার তাদেরও বিয়ে হলো আর বিয়ের পর বেশিদিন যেতে না যেতে তাদেরও ছেলেপুলে আসতে শুরু হলো। সোংসারে কখনো কখনো একজন-দুজনা করে কমছে বটে কিন্তুক বাড়ছে অনেক বেশি। হাতে-পায়ে গলায়-মাথায় লেয়ালির দড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে জড়িয়ে যেচে।
