আমি একঠাঁই দাঁড়িয়ে দেখছি, এই ঘরে সুয্যির আলো আসে না। অ্যাকন দেখছি সারা ঘরে আলো। বছরের এই সোমায়টোই উত্তরের জানেলা দিয়ে সামান্য এট্টু রোদ ঘরের মেঝেয় এসে পড়ে, তাতেই যেন সারা ঘর আলো। আমি ত্যাকন এগিয়ে যেয়ে খুঁকিকে কোলে তুলে লেলম। আমাকে দেখে লাজুক হাসি হেসে খোঁকা বললে,দ্যাখো মা, বুড়ি আমাকে কেমন করে মারছে, উঠতেবলছে। চোখ ভরা পানি নিয়ে আমি তাকে একটি কথাও বলতে পারলম না।
দু-দিন কি তিন দিন পর,একুশ দিন পার হয়েছে ত্যাকন, তবে আটাশ দিন হয় নাই, সকাল থেকেই রুগির আবস্তা খুব খারাপ। সিদিন তাকে কুনো খাবার খাওয়ানো গেল না, ওষুধও খাওয়ানো গেল না। ডাকলে। সাড়া নাই, চোখও খুলছে না। সিদিন বাড়ির সব কাজকম্ম বন্ধ রইল। রাঁধা-বাড়ার কাজেও কেউ গেল না। দেখলম গিন্নিও এসে ছেলের শিয়রের কাছে ননদের পাশে বসল। আমি খোঁকার বালিশটোকে সরিয়ে তার মাথা কোলে নিয়ে বসলম।
আর আমি উঠব না। আর বুঝতে বাকি নাই সে আর থাকবে না। গত দু-দিন থেকেই সিকথা বুঝতে পারছি। চোখে আর পানি নাই যি কঁদি, চোখ যেন গলে গেয়েছে, কিছুই ভালো দেখতে পেচি না। না, আর পানি নাই, না, আর কাঁদব না। অ্যাকন যেদি কাঁদি, খোঁকা চলে গেলে কি করব? ত্যাকন যি চোখ ফেটে রক্ত ঝরবে গো! তাই লেগে দু-ফোটা পানি যেদি থাকে তো থাকুক।
বুঝতে পারছি আজ উ যাবে। সারা গাঁ-ও কি তাই জানে? তা নাইলে এত লোক আসছে কোথা থেকে? ঘর ভরে গেল, এগনে ভরে গেল। কিন্তুক সবাইকে দেখছি, কত্তাকে তো কোথাও দেখছি না। তবে কি সে বাড়িতেই নাই? কত্তামার দুই ছেলেকেও দেখছি, সে তাইলে কোথা গেল?
বেলা বাড়ছে, রোদ চড়ছে, ঘরের ভেতর গুমোট গরম, কে ঘরের মানুষদের সরতে বলে? খোঁকার যি অ্যাকন এট্টু বাতাস দরকার। দ্যাওরদের কেউ বোধায় বুঝতে পেরেছে, সে সবাইকে সরিয়ে দিলেকিন্তুক একজন সরছে তো আরও তিনজনা ঘরে ঢুকছে।
দোপরটো যি কেমন করে পেরুইলো তা বলতে পারব না। সিদিন দোপটোই আজরাইল হয়ে এয়েছিল। বুকের ওপর সেই যি বসল আর সরলে না। গোটা জেবন পেরিয়ে যেচে, তবু দোপরটা যেচে না। তবু এক সোমায় সুয্যি পচ্চিমে নামতে লাগল, রোদের ত্যাজ এট্টু মরে এল, আর মনে হতে লাগল দোপরটাও বুক থেকে নেমে যেচে। ত্যাকন আমার মনে শান্তি। খোঁকার তাইলে যাবার সোমায় আসছে। অ্যাকন আর অস্থির হতে নাই। সে শান্তিতে যাক। শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলম, অ্যামন মায়ায় ছেলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে যেন মওত-ও সেই চাউনি দেখতে পেচে। যে নিশ্বেস নিতে এত কষ্ট হচিল খোঁকার, সেই নিশ্বেসও যেন সহজ হয়ে এল। খুব আস্তে আস্তে ফিসফিস করে গিন্নি আমাকে বলছে, মেজ বউ, ছেলের মুখে একটু পানি দাও। কি যি হলো আমার, ক্যানে গো, যাদু কি চলে যেচে? বলে এমন চেঁচিয়ে ওঠলম যি ঘরসুদ্দ লোক চমকে উঠল। গিন্নি আমাকে বললে, চুপ চুপ, ও কি করছ–খোঁকার মুখে পানি দাও। এখন নয়, কাদার অনেক সোমায় পাবে।
আমি ত্যাকন বড় কাঁসার চামচে পানি ঢাললম, খোঁকার মুখ একটু হাঁ করিয়ে পানি দেলম। হ্যাঁ, সবটুকু পানি খেলে সে, আর এক চামচ ঢেলে ফের দিতে গেলম, ইবার কতক খেলে আর কতক কষ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল।
একদম শেষ সোমায়টো আমার কিছুতেই মনে পড়ছে না। কুনোদিন মনে থাকল না। খুব জোরে হিঙুরে উঠে একবার কি নিসে নিয়েছিল? কেউ যেন শুনতে না পায়, শুদু আমি শুনি এমনি করে কি বলেছিল, মা যাই? কিছুতেই মনে পড়ে না। আমার কোলে ছিল মাথা, শুদু দেখলম, কাত হয়ে কোল থেকে গড়িয়ে পড়ল। ঐ শেষ। খোঁকা চলে গেল! বেলা ত্যাখনো খানিকটা ছিল। সারা গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়ল বাড়িতে।
১৫. সারা জাহান খাঁ খাঁ–হায়রে শোধ তোলা
যিসব গাঁয়ে আমাদের আত্মীয়কুটুম জ্ঞাতিগুষ্টি থাকত, সেই রেতেই সিসব গাঁয়ে খবর দিতে লোক চলে গেল। গরমকালের দিনে লাশ বেশি সোমায় থাকবে না, য্যাতো তাড়াতাড়ি মাটি হয়ে যায় ত্যাতোই ভালো। যা গরম, মনে হচে কাল সকাল পয্যন্ত লাশ থাকে কি না সন্দ। কিন্তুক আত্মীয়কুটুম এসে না দেখলে তো মাটি দেওয়া যাবে না। তাতে খুব নিন্দে হবে। এত বড় একটো সব্বোনাশ হয়ে গেল, সেটো কিছু লয়। কিন্তুক খবর না পেলে, লাশের দাফনের সোমায় এসে হাজির হতে না পারলে নিয়ে কান পাতা যাবে না। দোপর পয্যন্ত লাশ রাখতেই হবে, তাতে লাশ গলুক পচুক, যা-ই হোক।
উত্তর-দুয়োরি ঘরেই রয়েছে খোঁকার লাশ একটো চাদরে ঢাকা। অ্যাকন আর ওখানে থেকে আমি কি করব? য্যাতোক্ষণ সে ছিল, আমি তো তার কাছেই ছেলম, কোথাও যাই নাই। অ্যাকন আর সে নাই–যে আছে সে তত লাশ। উ নিয়ে আর আমি কি করব?শরীল শুকিয়ে কঙ্কাল, সেই কঙ্কালটো চামড়া-ঢাকা পড়ে আছে। খানিক বাদে ঐ চামড়া ফুলে ঢোল হবে, রসানি গড়িয়ে পড়বে সারা শরীল থেকে, দুর্গন্ধ ছড়াবে। লাশ বলতে তো এই! সব লাশই ঐরকম, গলে-পচে হেজে থাকে কবরের ভেতর। কবর না দিলে ঘরেও তা-ই হবে। উয়ার সাথে আমার সোনার যাদু বড় খোঁকার কি সম্পক্ক? আর আমি দেখতে চাই না। তার সোনার মুত্তি আমার মনেই থাক।
তবে কেঁদেছেলম বৈকি। চোখের পানি তো কবেই শুকিয়েচে। কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে গেল কিন্তুক চোখে যি আর পানি নাই! সবাই কাঁদছিল, আমিও কাঁদছেলম। বাড়িতে কাল রেতে খাওয়া-দাওয়া হয় নাই, সব বন্ধ ছিল। ই বাড়ি উ বাড়ির বউ-ঝিরা এসে চিনি নাইলে গুড়ের। শরবত এক ঢোক করে সবাইকে খাইয়েছে। ঘরের ভেতর অতো লোক–কতো আর খাওয়াবে? মাঝরেতের পর লোক অ্যানেক কমে গেল। তবে গিন্নি ত্যাকন আর ঘরে নাই। ননদ-দ্যাওর-জায়েরা আছে। কাঁদন ত্যাকন আর নাই। হেরিকেনের কাঁচে এমন ধুমো জমেছে যি ঘরে আলো পেরায় নাই বললেই চলে। ত্যাকন আমার বুকের ভেতরটো পাষাণ। আমি সেই আলোয় দেখলম ছায়াবাজি। কতোবার খোঁকা এল গেল, কতো কি করলে, গলা জড়িয়ে ধরলে, তার মুখে আমি চুমো খ্যালম। দেয়ালে আমি সব দেখছি।
