সাড়ে নটায় জটায়ু এলেন।
দেখুন তো কীরকম জিনিস।
জটায়ু তাঁর কথামতো তাঁর ঠাকুরদাদার ঘড়িটা নিয়ে এসেছেন। রুপোর ট্যাকঘড়ি, তার সঙ্গে ঝুলছে রুপোর চেন।
বাঃ, দিব্যি জিনিস, ঘড়িটা হাতে নিয়ে বলল ফেলুদা।কুককেলভির বেশ নাম ছিল এককালে।
কিন্তু সে জিনিস তো হল না—আক্ষেপের সুরে বললেন লালমোহনবাবু।এ তো কলকাতায় তৈরি ঘড়ি।
কিন্তু আপনি সত্যিই এটা আমাকে দিচ্ছেন?
উইথ মাই ব্লেসিংস অ্যান্ড বেস্ট কমপ্লিমেন্টস। আপনার চেয়ে সাড়ে তিন বছরের বড় আমি, সুতরাং আমার কাছ থেকে আশীর্বাদ নিতে আপনার আপত্তি নেই নিশ্চয়ই।
ফেলুদা ঘড়িটাকে রুমালে মুড়ে পকেটে রেখে টেলিফোনের দিকে এগোল। কিন্তু ডায়াল করার আগেই রাস্তার দিকের দরজার কড়টায় নাড়া পড়ল।
খুলে দেখি গিরীনবাবু। ইনি কাল হিন্ট দিলেও, সত্যি করে যে আসবেন, আর এত তাড়াতাড়ি আসবেন, সেটা ভাবিনি। কাজে বেরিয়েছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে পোশাক দেখে—কোট প্যান্ট, হাতে একটা ব্রিফকেস!
টেলিফোনে দশ মিনিট ডায়াল করেও লাইন পেলাম না। কিছু মনে করবেন না। ভদ্রলোকের হাবভাব চনমনে, নার্ভাস।
মনে করবার কিছু নেই। টেলিফোন তো না থাকারই সামিল। কী ব্যাপার বলুন।
ভদ্রলোক সোফায় না বসে একটা চেয়ারে বসলেন!! আমি আর জটায়ু তক্তপোষে, ফেলুদা (भ:।
কার কাছে যাওয়া উচিত ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললেন গিরীন বিশ্বাস, পুলিশের ওপর খুব ভরসা নেই, ফ্র্যাঙ্কলি বলছি। ঘটনাচক্রে আপনি যখন এসেই পড়লেন…
সমস্যাটা কী?
গিরীনবাবু গলা খাকরে নিলেন। তারপর বললেন, দাদার মাথায় গাছ পড়েনি।
আমরা তিনজনেই চুপ, ভদ্রলোকও কথাটা বলে চুপ।
তা হলে? প্রশ্ন করল ফেলুদা।
মাথায় বাড়ি মেরে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছিল তাকে।
ফেলুদা শান্তভাবে চারমিনারের প্যাকেটটা ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিলে তিনি প্রত্যাখ্যান করাতে সে নিজের জন্য একটা বার করে বলল, কিন্তু আপনার দাদা নিজে যে বললেন গাছ পড়েছিল।
তার কারণ দাদা মরে গেলেও তার নিজের ছেলের নাম প্ৰকাশ করবে না।
নিজের ছেলে?
প্রশান্ত। বড় ছেলে। ছোটটি বিলেতো।
কী করে প্রশান্ত?
কী না-করে সেইটে জিজ্ঞেস করুন। যত রকম গৰ্হিত কাজ হতে পারে। গত তিন-চার বছরে এই পরিবর্তন। দাদা দুই ভাইকে সমান ভাগ দিয়ে উইল করেছিল। বাউদি মারা গেছেন সেভেনটিতে। মাসখানেক আগে দাদা প্ৰশান্ত-র ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে তাকে শাসায়; বলে তাকে উইলচ্যুত করবে, সব টাকা সুশান্তকে দিয়ে দেবে।
প্রশান্ত আপনাদের বাড়িতেই থাকে তো?
থাকার অধিকার আছে, তার জন্য ঘর আছে আলাদা, তবে থাকে না। কোথায় থাকে বলা শক্ত। তার দল আছে। জঘন্যতম টাইপের গুণ্ডা সব। আমার বিশ্বাস সেদিন ও খুনই করে ফেলত, যদি না সাংঘাতিক ঝড়টা এসে পড়ত।
আপনার দাদা এ বিষয় কী বলেন?
দাদা বলছে সত্যই গাছ পড়েছিল। সে জেনে—শুনেও বিশ্বাস করতে চাইছে না যে তার ছেলে তার মাথার জখমের জন্য দায়ী। কিন্তু দাদা যাই বলুক না কেন—আমার নিজের ভাইপো হলেও বলছি—আপনি একটা কিছু বিহিত না করলে সে আবার খুনের চেষ্টা দেখবে।
নিরেনবাবু যদি নতুন উইল করেন তা হলে তো আর তার ছেলের তাকে খুন করে কোনও আর্থিক লাভ হবে না।
আর্থিক লাভটাই কি বড় কথা মিস্টার মিত্তির? সে তো খেপে গিয়েও খুন করতে পারে। প্রতিশোধের জন্য কি মানুষ খুন করে না?—আর দাদা উইল চেঞ্জ করবে না। তার মাথার ঠিক নেই। অপত্যস্নেহ যে কার্দুর যেতে পারে তা আপনি জানেন না মিস্টার মিত্তির। এ ক’দিন আমি বাড়িতেই ছিলাম, কিন্তু আজ আমাকে একটু কলকাতার বাইরে যেতে হচ্ছে দু-তিন দিনের জন্য, ব্যবসার কাজে। তাই আপনার কাছে এলাম। আপনি যদি ব্যাপারটা…
মিস্টার বিশ্বাস, ফেলুদা প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা ছাইটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিয়ে বলল, আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি। আমি আরেকটা তদন্তে জড়িয়ে পড়েছি। আপনার দাদার প্রোটেকশনের একটা ব্যবস্থা করা উচিত নিশ্চয়ই, কিন্তু এটাও ঠিক যে তিনি নিজেই যদি জোর গলায় বলেন যে তাঁর মাথায় গাছ পড়েছিল, তাঁকে কেউ হত্যা করার চেষ্টা করেনি—তা হলে পুলিশের বাবাও কিছু করতে পারবে না।
গিরীনবাবু অনেক’দিন-পরে-রোদ-ওঠা সকালের মেজাজটা বিগড়ে দিয়ে বিদায় নিলেন।
বিচিত্র ব্যাপার, বলে ফেলুদা সোফা ছেড়ে উঠে গিয়ে টেলিফোনে নম্বর ডায়াল করল।
হ্যালো, সুহৃদ? আমি ফেলু বলছি রে…
সুহৃদ সেনগুপ্ত ফেলুদার সঙ্গে কলেজে পড়ত এটা আমি জানি।
শোন—তোর বাড়িতে একটা প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনের শতবার্ষিকী সংখ্যা দেখেছিলাম—তোর দাদার কপি—যদ্দূর মনে হয় পঞ্চান্নতে বেরিয়েছিল—সেটা আছে এখনও?…বেশ, ওটা তুই বেরোবার সময় তোর চাকরের হাতে রেখে যাস, আমি দশটা-সাড়ে দশটা নাগাত গিয়ে নিয়ে আসব…
আমরা চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তিন জায়গায় যাবার আছে ফেলুদার—নরেনবাবু, বোর্ন অ্যান্ড শেপার্ড আর পার্ক স্ট্রিট গোরস্থান। নরেনবাবু শুনে একটু অবাক হলাম। ফেলুদাকে বলতে বলল, গিরীনবাবুকে মুখে যাই বলি না কেন, ওঁর কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারছি না। কাজেই একবার যাওয়া দরকার। তৃতীয় জায়গাটায় তোদের না গেলেও চলবে, তবে রাত্রের পাহারাটায় আজ ভাবছি তোদের নিয়ে যাব। গোরস্থানে মাঝরাত্তিরের অ্যাটমোসফিয়ারটা অনুভব না করা মানে একটা অসামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হওয়া।
