একজন কর্মচারী এসে দাঁড়াল। সেই একই লোক—যিনি আমাদের আপিস ঘরে বসিয়েছিলেন। আমরা উঠে পড়লাম। যখন ঘর থেকে বেরোচ্ছি, তখন মখমলের মতো গলাটা আরেকবার শোনা গেল।
আমার কাছে অন্যরকম রিপিটারও আছে। মিঃ মিটার; তবে তার আওয়াজ ঘড়ির মতো সুরেলা নয়।
আপনার বর্তমান কাহিনীর নায়ক তো ইনিই বলে মনে হচ্ছে, বললেন জটায়ু।
আমরা আলিপুর পার্ক থেকে ফিরছি। গাড়ির কাচ আবার তুলে দিতে হয়েছে, কারণ বৃষ্টি। জাজেস কোর্ট রোডে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টিটা নেমেছে।
ফেলুদা লালমোহনবাবুর কথার কোনও জবাব না দিয়ে জানালার বাইরে দৃশ্য দেখতে লাগল। লালমোহনবাবু একটানা বেশিক্ষণ কথা না-বলে থাকতে পারেন না। বললেন, জানি নায়ক না বলে ভিলেন বলা উচিত, কিন্তু আপনি যে বলেন ক্রাইমের ব্যাপারে সকলকেই সন্দেহ করা উচিত-যে-কেউ ভিলেন হতে পারে–তাই আর বললুম না। অবিশ্যি সন্দেহটাও যে ঠিক কী কারণে করা উচিত, সেটা এখনও আমার কাছে পরিষ্কার নয়। কবর খোঁড়াটা কি ক্রাইমের মধ্যে পড়ে?
ফেলুদা কোনও কথারই জবাব দিচ্ছে না দেখে লালমোহনবাবু এবার অসহিষ্ণু হয়ে বললেন-ও মশাই, আপনি যে দামে গেলেন বলে মনে হচ্ছে। তা হলে আমাদের কী দশা হবে ভেবে দেখুন!! একে তো ভদ্রলোকের হাবভাব দেখে হাড়গোড় নড়বড়ে হয়ে যাবার অবস্থা। তারপরে ওই অতগুলো ঘড়ির ঢং ঢেং, আর তার উপরে আবার আপনি গুম, বাইরে বৃষ্টি, রাস্তায় গাড্ড…
এতক্ষণে ফেলুদা মুখ খুলল।
আপনার অনুমান ভুল, মিঃ গাঙ্গুলী। আমি দমিনি মোটেই। জটিল গোলকধাঁধার মধ্যে পথ পেয়ে গেলে কি লোকে দমে? বরং উলটো।
পথ পেয়ে গেছেন?
পেয়েছি, তবে পথের শেষে কী আছে তা এখনও জানি না। পথ অত্যন্ত ঘোরালো। আরও বেশ কিছুটা এগোলে পরে শেষ দেখা যাবে।
আমরা বাড়ি ফেরার পরও টিপ টপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। লালমোহনবাবু বলে গেলেন কাল সকাল সকাল আসবেন।–এ কেসটীয় আমি ছাড়া আপনার গতি নেই, ফেলুবাবু! বাসট্রামে ঘোরাঘুরি করতে গেলে আপনার কত সময় লাগত ভাবুন দিকি!
আজ দুপুরে নিজামে বসে থাকতেই লক্ষ করেছিলাম, ফেলুদা তার খাতায় কী যেন হিজিবিজি কাটছে; রাত্রে খাবার পর ওর ঘরে এসে জানতে পারলাম সেটা কী ও যে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল তা নয়; এমনিতেই আমার ওর জন্য ভাবনা হচ্ছিল; মহাদেব চৌধুরীকে দেখে আর তার কথা শুনে অবধি দুশ্চিস্ত হচ্ছিল; ভদ্রলোকের মুখটা মনে করলেই কেমন জানি বুকটা কেঁপে উঠছিল। লালমোহনবাবু হিরো ভিলেন যা ইচ্ছে তাই বলুন না কেন, আমার কাছে উনি একটি ভূয়াবহ চরিত্র। বাইরেটা মখমল হলে কী হবে, ভিতরটা থর মরুভূমির কাঁটা-ঝোপের জঙ্গল।
অবিশ্যি ফেলুদাকে দেখে মনেই হল না যে তার কোনও দুশ্চিন্তা হচ্ছে। সে এখন সামনে খাতা খুলে বসে একমনে একটা নকশার দিকে দেখছে। আমি ঢুকতে এই দ্যাখ শাখাপ্রশাখা বলে খাতাটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। তাতে যে জিনিসটা আঁকা রয়েছে সেটা আমি তুলে দিচ্ছি–
ডান দিকটা কী রকম খালি-খালি লাগছে না? বলল ফেলুদা।
আমি বললাম, তা তো লাগবেই। শার্লট তো বিয়েই করেনি।
শার্লটকে নিয়ে সমস্যা নয়। সমস্যা ওই জন ব্যক্তিটিকে নিয়ে। ওই একটি শাখার বাকি অংশটা লুকিয়ে আছে। অবিশ্যি একটা জিনিস উলটা অবস্থায় দেখেছি; সেটা সোজা দেখলে পরে কিছুটা আলোকপাত হতে পারবে। অর্থাৎ কাল সকালে।
এটা ফেলুদার একটা মাকামারা হেঁয়ালি; আর যখন হেঁয়ালি করে বলছে, তখন হেঁয়ালি করবার জন্যই বলেছে।
————-
- টমাস গডউইন (১৭৮৮-১৮৫৮)
- ডেভিড গডউইন (১৮১৬-১৮৭৪)
- অ্যান্ড্রু গডউইন (১৮৪৭-১৮৮২)
- চার্লস গডউইন (১৮৮০-১৯২০)
- মার্কাস গডউইন (১৯১৪- )
- ক্রিস্টোফার গডউইন (? – )
- জন গডউইন
- ???
- শার্লট গডউইন (বিয়ে করেননি) (১৮১৯-১৮৮৬)
- মার্কাস গডউইন (১৯১৪- )
- চার্লস গডউইন (১৮৮০-১৯২০)
- অ্যান্ড্রু গডউইন (১৮৪৭-১৮৮২)
- ডেভিড গডউইন (১৮১৬-১৮৭৪)
————–
আমাদের কথার ফাঁকেই বৃষ্টিটা থেমে গিয়েছিল। ফেলুদাকে হঠাৎ ব্যস্তভাবে বিছানা থেকে উঠতে দেখে অবাক লাগল।
বললাম, বেরোবে নাকি?
ইয়েস স্যার।
সে কী? কোথায়?
ডিউটি আছে।
কীসের ডিউটি?
পাহারা।
তার হান্টিং বুট-জোড়া বার করে রেখেছে ফেলুদা সেটা এতক্ষণ দেখিনি। ওটা দেখলেই আমার গায়ে কাঁটা দেয়, কারণ ফেলুদার প্রত্যেকটা বিখ্যাত তদন্তের সঙ্গে ওটা জড়িয়ে আছে। মাঝরাত্তিরে গোরস্থানে চলতে ফিরতে হলে ওটা ছাড়া গতি নেই।
গোরস্থানে? ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলাম। আমি।
আর কোথায় বল!
এক যাবে?
চিন্তা নেই। সঙ্গী আছে। রিপিটার।
ফেলুদা আলমারি থেকে তার ৩২ কোল্টটা বার করে পকেটে পুরল। আমার ভাল লাগছে। না ব্যাপারটা মোটেই। বললাম, কিন্তু ওখানে কী ঘটনা ঘটবে বলে আশা করছ? কবর তো খোঁড়া হয়ে গেছে। ঘড়ি যদি পেয়ে থাকে। সে তো নিয়ে গেছে।
নেয়নি। যে বা যারা খুঁড়ছিল তারা মড়ার খুলি দেখেই ভয়ে পালিয়েছে। নইলে ওভাবে কোদাল ফেলে দিয়ে যায় না। হয় নিয়ে যাবে, না হয় লুকিয়ে রাখবে।
এ জিনিসটা আমার একেবারেই খেয়াল হয়নি।
১০. ফেলুদা ফিরেছে কখন জানি না
ফেলুদা ফিরেছে কখন জানি না। আমি যখন উঠে নীচে নেমেছি, তখন ওর ঘরের দরজা বন্ধ; তখন বেজেছে সেয়া সাতটা। বুঝলাম দু রাত না ঘুমিয়ে সকালে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে।
নটার সময় ও দরজা খুলল। ফিটফাট দাড়ি কামানো চেহারা, চোখে-মুখে কোনও ক্লাস্তির ছাপ নেই। বুড়ো আঙুল নেড়ে বুঝিয়ে দিল রাত্রে কিছু ঘটেনি।
