জয় মা সন্তোষী, বললেন লালমোহনবাবু। তারপর মাঝপথে একবার বললেন, মশাই, সান অফ টারজনের মতো সান অফ সন্তোষী করা যায় না?–বুঝলাম পুলক ঘোষালের অফারটা নিয়ে ভদ্রলোক এখনও ভাবা শেষ করেননি।
নরেনবাবু যদিও শরীরের দিক দিয়ে অনেকটা সুস্থ-বললেন ব্যথা-ট্যথা প্রায় সেরে গেছে, কয়েক’দিনের মধ্যেই ব্যান্ডেজ খুলবেন-তবু ওঁর। চাহনিটা ভাল লাগল না। কেমন যেন শুকনো, বিষণ্ণ ভাব।
আপনাকে শুধু দু-একটা প্রশ্ন করার আছে বলল ফেলুদা, বেশি সময় নেব না।
ভদ্রলোক ফেলুদার দিকে একটা সন্দিগ্ধ দৃষ্টি দিয়ে বললেন, কিছু মনে করবেন না-আপনি কি কোনও তদন্ত চালাচ্ছেন? আপনি গোয়েন্দা জেনেই এ প্রশ্নটা করছি।
আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন, বলল ফেলুদা। সে ব্যাপারে প্রচুর সাহায্য হবে। যদি আপনি সত্য গোপন না করেন।
ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করলেন। অনেক সময় যন্ত্রণাবোধ করলে সেটাকে সহ্য করার চেষ্টায় মানুষে যেভাবে চোখ বন্ধ করে এও সেই রকম। মনে হল উনি আন্দাজ করেছেন যে ফেলুদার জেরাটা ওঁর পক্ষে কষ্টকর হবে। ফেলুদা বলল, আপনি হাসপাতালে জ্ঞান হবার পরমুহূর্তে উইল সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছিলেন।
নরেনবাবু সেইভাবেই চোখ বন্ধ করে রইলেন।
উইলের উল্লেখ কেন সে সম্বন্ধে একটু আলোকপাত করবেন কি?
এবার নরেন বিশ্বাস চোখ খুললেন। তার ঠোঁট নড়ল, কপিল, তারপর কথা বেরোল।
আমি আপনার কথার জবাব দিতে বাধ্য নই নিশ্চয়ই?
নিশ্চয়ই না।
তা হলে দেব না।
ফেলুদা কয়েক মুহূর্ত চুপ। আমরা সবাই চুপ। নরেনবাবু দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়েছেন!
বেশ আমি অন্য প্রশ্ন করছি, বলল ফেলুদা।
জবাব দেওয়া না-দেওয়ার অধিকার কিন্তু আমার।
একশোবার।
বলুন!
ভিক্টোরিয়া কে?
ভিক—টোরিয়া…?
এখানে বলে রাখি আমি একটা অন্যায় কাজ করে ফেলেছি। আপনার ব্যাগের ভিতরের কাগজপত্র আমি দেখেছি। তাতে একটি স্লিপ-এ–
ও হে! হে -ভদ্রলোক আমাদের বেশ চমকে দিয়ে হাসিতে ফেটে পড়লেন। –ও তো মান্ধাতার আমলের ব্যাপার! আমিও প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি তখনও চাকরিতে। এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কাজ করত। আমাদের আপিসে—নির্টন–জিমি নর্টন। বললে তার ঠাকুমার লেখা গুচ্ছের চিঠি রয়েছে তাদের বাড়িতে। সে চিঠি আমি চাখেই দেখিনি। এই ঠাকুমা নাকি মিউটিনির সময় বহরমপুরে ছিলেন—তখন পাঁচ-সাত বছর বয়স। চিঠিগুলো পরে লেখা, কিন্তু তাতে তার ছেলেবেলার অভিজ্ঞতার কথা আছে। আজকাল তো এসব নিয়ে বই-টই খুব বেরোচ্ছে, তাই নর্টনকে বলেছিলাম কিছু বিলিতি পাবলিশারের নাম দিয়ে দেব। সে নিজে এসব ব্যাপারে একেবারে আনাড়ি দাঁড়ান-কাগজটা বার করি।
নরেনবাবু বাঁ হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপরের দেরাজটা খুলে ব্যাগ থেকে তার স্ক্রিপটা বার করলেন।
এই যে-বোর্ন অ্যান্ড শেপার্ড। ওকে বলতে চেয়েছিলুম খোঁজ করে দেখতে পারে, ওখানে ওর ঠাকুরমার কোনও ছবি পাওয়া যায় কি না। আর এই যে সব পাবলিশারের নামের আদ্যক্ষর। এ কাগজ আর তাকে দেওয়া হয়নি, কারণ নর্টনের জনডিস হয়। দেড়মাস ট্ৰিটমেন্টে ছিল, তারপর চাকরি ছেড়ে দেয়।
ফেলুদা উঠে পড়ল। ঠিক আছে, মিস্টার বিশ্বাস-শুধু একটা ব্যাপারে। আক্ষেপ প্রকাশ না করে পারছি না।
কী ব্যাপার?
আপনি ভবিষ্যতে কোনও লাইব্রেরির কোনও বই বা পত্রিকা থেকে কিছু হিঁড়ে বা কেটে নেবেন না। এটা আমার অনুরোধ। আসি।
ঘর থেকে বুরোবার সময় ভদ্রলোক আর আমাদের মুখের দিকে চাইতে পারলেন না।
বেণীনন্দন স্ট্রিটের সুহৃদ সেনগুপ্তের চাকর একটা ঢাউস বই এনে ফেলুদাকে দিল। প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনের শতবার্ষিকী সংখ্যা। সেটা ফেলুদা সারা রাস্তা কেন যে এত মন দিয়ে দেখল, আর দেখতে দেখতে কেন যে বার তিনেক বোঝে ব্যাপারখানা বলল সেটা বুঝতে পারলাম না।
বোর্ন অ্যান্ড শেপার্ডে ঢুকে ফেলুদা দশ মিনিটের মধ্যে একটা বড় লাল খাম নিয়ে বেরিয়ে এল। দেখেই বোঝা যায় তার মধ্যে বড় সাইজের ফোটা রয়েছে।
কীসের ছবি আনলেন মশাই? জিজ্ঞেস করলেন লালমোহনবাবু।
মিউটিনি, বলল ফেলুদা। আমি আর লালমোহনবাবু মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। ফেলুদার কথার মানে ছবিগুলো নর্ট ফর দ্য পাবলিক।
গোরস্থানে আর আপনাদের ভেতরে টানব না; আমি শুধু দেখে আসি সব ঠিক আছে কি না।
আমরা গাড়িটা ঘুরিয়ে গোরস্থানের ঠিক সামনেই পার্ক করলাম। ফেলুদা যখন গেট দিয়ে ঢুকাল, তখন দেখলাম দারোয়ান বরমদেও বেশ একটা বড় রকমের সেলাম ঠুকল!
দশ মিনিটের মধ্যে ফেলুদা ফিরে এসে ওকে বলে গাড়িতে উঠল। ঠিক হল রাত সাড়ে দশটায় আমরা আবার এখানে ফিরে আসছি।
আমার মন বলছে আমরা নাটকের শেষ অঙ্কের দিকে এগিয়ে চলেছি।
১১. ফেলুদার সঙ্গে এতবার এত জায়গায় ঘুরেছি
ফেলুদার সঙ্গে এতবার এত জায়গায় ঘুরেছি। রহস্যের পিছনে পিছনে-সিকিম, লখনী, রাজস্থান, সিমলা, বেনারস-কেনিওখানেই অ্যাডভেঞ্চারে কমতি পড়েনি; কিন্তু এই কলকাতাতে বসেই এমন একটা রক্ত-হিমা-করা রহস্যের জালে জড়িয়ে পড়তে হবে এটা কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবিনি।
বিশেষ করে আজকের দিনটা, লালমোহনবাবু যেটার নাম দিয়েছিলেন ব্ল্যাক-লেটার ডেযদিও সেটাকে আবার পরে বদলিয়ে করলেন ব্লক-লেটার নাইট। আর পার্ক স্ট্রিট সেমেট্ৰিরি সম্বন্ধে বলেছিলেন, ছেলেবেলায় মেজো জ্যাঠা বুঝিয়েছিলেন। ওটাকে বলে গোরস্থান, কারণ ওখানে গোরাদের সমাধি আছে! এখন মনে হচ্ছে নামটা হওয়া উচিত গেরোস্থান। এমন গেরোয় এর আগে পড়িচি কখনও তপেশ? তোমার মনে পড়চে?
