ঘড়ির শব্দ থামতে এখন বাড়িটা থমথমে মনে হচ্ছে। পোল্লায় হাল ফ্যাশানের বাড়ি, পায়ের নীচে শ্বেতপাথরের মেঝেতে মুখ দেখা যায়।
একটা গলার স্বর বাড়ির ভিতর থেকে মাঝে মাঝে শুনতে পাচ্ছি; ফেলুদা বলল সেটাই নাকি মহাদেব চৌধুরীর গলা। মখমল কি না সেটা এখান থেকে বোঝা মুশকিল, তবে এই গলাটাই যে হঠাৎ সপ্তমে চড়ে আর মখমল রইল না সেটা বেশ বুঝতে পারলাম।
মহাদেব চৌধুরী কাকে যেন বেদম ধমক দিচ্ছেন। আমরা তিনজনে প্রায় দমবন্ধ করে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আড়ি পাতিছি। দ্বিতীয় ব্যক্তি গলা তুলছে না, তাই তার কথা বুঝছি না। কথা হচ্ছে ইংরিজিতে। চৌধুরীর গলায় হুমকানি শোনা গেল—
এসব ব্যাপারে। আমি অ্যাডভান্স দিই না-আপনি আত করে বললেন বলে দিলাম—আর এখন বলছেন, সে টাকা খরচ হয়ে গেছে? আপনার একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না। আর এই সামান্য কাজটা করতে এত টাকা কেন লাগবে সেটাও আমি বুঝছি না। যাই হাক, আমি দিচ্ছি। টাকা, কিন্তু দুদিনের মধ্যে আমি মাল চাই। আমি কোনও অসুবিধার কথা শুনতে চাই না, বুঝেছেন?
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ, তারপর একটা জুতোর শব্দ পেলাম: মনে হল সেটা সদর দরজার দিকে চলে গেল। এক মিনিটের মধ্যেই কর্মচারীটি আবার এল।—
আপলোগ আইয়ে।
মিঃ চৌধুরীর মাথার চুল থেকে জুতোর ডগা পর্যন্ত সত্যিই মখমলের মতো। ভদ্রলোক দিনে দুবার দাড়ি কামান নিশ্চয়ই, না হলে সন্ধ্যা ছাঁটায় পুরুষ মানুষের গাল এত মসৃণ হয় না। (পরে লালমোহনবাবু বলেছিলেন, মনে হচ্ছিল গালে মাছি বসলে পিছলে যাবে)। যে বিশাল বৈঠকখানা ঘরটাতে আমরা বসেছি সেটাও মিঃ চৌধুরীর মতোই পালিশ করা। আনাচে-কানাচে কোথাও এক কণা ধুলো বা একটাও পিপড়ে বা আরশোলা থাকতে পারে বলে মনে হয় না।
সোনার হাল্ডারে ধরা সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে ফেলুদার দিকে চেয়ে প্রশ্ন কললেন মিঃ চৌধুরী—
ওয়েল—ঘড়িটা এনেছেন সঙ্গে?
আমরা সকলেই অবাক; ফেলুদা তো বটেই।
ঘড়ি? কী ঘড়ি বলুন তো? প্রশ্ন করল ফেলুদা।
আপনি যে বললেন একটা ঘড়ির ব্যাপারে দেখা করতে আসছেন? আমি তো ভাবলাম আমার বিজ্ঞাপন পড়ে ফোন করছেন আমাকে।
মাপ করবেন মিস্টার চৌধুরী—আমি আপনার বিজ্ঞাপন পড়িনি। আমার একটা ব্যাপার একটু জানার দরকার হয়ে পড়েছে, সেটা সম্ভবত ঘড়ি সংক্রান্ত। শুনলাম। আপনি ঘড়ির বিষয় অনেক কিছু জানেন, তাই—
মখমলে ভাঁজ পড়েছে। ভদ্রলোক একটু যেন বিরক্তির সঙ্গেই নড়েচড়ে বসে বললেন—
আমার সময় বেশি নেই মিঃ মিটার। একটু পরেই কলকাতার বাইরে চলে যাব। আপনার কী জানার আছে সংক্ষেপে বলুন।
পেরিগ্যাল রিপিটার জিনিসটা কী সেটা জানতে চাইছিলাম।
মখমল হঠাৎ পাথর হয়ে গেল। সিগারেট হোল্ডার ঠোঁটের কাছে এসে থেমে গেছে। চোখের মণি পাথর, দৃষ্টি ফেলুদার দিকে, নিম্পলক।
আপনি কোথায় পেলেন নামটা?
উনবিংশ শতাব্দীর একটা ইংরেজি উপন্যাসে।
তার কাজের সুবিধের জন্য যে ফেলুদা অম্লানবদনে মিথ্যে কথা বলতে পারে সেটা আগেও দেখেছি। —রিপিটার যে ঘড়িও হতে পারে বন্দুকও হতে পারে সেটা অভিধানে দেখেছি, কিন্তু পেরিগ্যাল সম্বন্ধে কেউ কিছু বলতে পারল না।
মহাদেব চৌধুরী এখনও সেইভাবেই চেয়ে আছেন ফেলুদার দিকে। এর পরের প্রশ্নটাতে মখমলের সঙ্গে মেশানো একটা ধারালো ভাব দেখা দিল।
আপনি কি সব সময়ই কথার মানে জানতে অচেনা লোকের বাড়ি ধাওয়া করেন?
বিশেষ প্রয়োজন হলে করি বইকী।
আমি ভেবেছিলাম ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করবেন বিশেষ প্রয়োজনটা কী; কিন্তু তা না করে সেই একইভাবে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে থেকে যে কথাটা বললেন, তাতে আমার ডান পাশের টেবিলের উপরে ঘড়িটা যেভাবে টিকটিক করছে, আমার হৃৎপিণ্ডটাও ঠিক সেইভাবেই টিকটিক করতে আরম্ভ করে দিল।
আপনি তো গোয়েন্দা, তাই না?
ফেলুদার নার্ভের বলিহারি। জবাবটা দিতে বোধহয় পাঁচ সেকেন্ড দেরি হয়েছিল, কিন্তু এল তখন তারাও গলা মখমল।
আপনি খবর রাখেন দেখছি।
রাখতেই হয় মিস্টার মিটার। খবর সংগ্রহের জন্য লোক থাকে।
আমার প্রশ্নটা বোধহয় ভুলে গেছেন। হয়তো উত্তরটা আপনার জানা নেই। আর যদি জেনেও জবাব না দিতে চান তা হলে আমি উঠি। বৃথা আপনার সময় নষ্ট করতে চাই না।
সিট ডাউন, মিস্টার মিটার।
ফেলুদা উঠে পড়েছিল, তাই এই হুকুম। লালমোহনবাবুকে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর নিজের থেকে ওঠার অবস্থা নেই; ধরে উঠিয়ে দিতে হবে।
সিট ডাউন, প্লিজ।
ফেলুদা বসল।
রিপিটার মানে বন্দুকও হয়, বললেন মহাদেব চৌধুরী, তবে তার সঙ্গে পেরিগ্যাল যোগ দিলে সেটা হয় ঘড়ি। পকেট ওয়াচ। ফ্রানসিস পেরিগ্যাল। ইংলিশম্যান। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে পেরিগ্যালের মতো ঘড়ির কারিগর পৃথিবীতে কমই ছিল। দুশো বছর আগে ইংল্যান্ডেই সবচেয়ে ভাল ঘড়ি তৈরি হত, সুইটজারল্যান্ডে নয়।
আজকের দিনে একটা পেরিগ্যাল রিপিটারের দাম কত হতে পারে?
সে ঘড়ি কেনার সামর্থ্য তো আপনার নেই মিঃ মিটার।
তা জানি।
আমার আছে।
তাও জানি।
তা হলে দাম জেনে কী হবে?
কৌতুহল।
ব্যর্থ কৌতুহল।
মিঃ চৌধুরী সিগারেটে শেষ টান দিয়ে হাল্ডার থেকে সেটা খুলে পাশে কাচের অ্যাশট্রেতে ফেলে দিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
আপনি যা জানতে চেয়েছিলেন সেটা আপনার জানা হয়ে গেছে, বললেন মিঃ চৌধুরী।এবার আপনি আসুন। পেরিগ্যাল রিপিটার কলকাতায় যেটা আছে সেটা আমিই পাব, আপনি পাবেন না।–পেয়ারেলাল!
